কোভিড-১৯: সংকটে বিশ্ব অর্থনীতি

অ্যাডভোকেট আনসার খান :বিশ্বব্যবস্হা এখন দু’টি গুরুতর সংকটে জর্জরিত। এর একটা হলো চিকিৎসা সংকট এবং অন্যটা হলো অর্থনৈতিক সংকট।উভয় সংকটই কোভিড-১৯ মহামারী সৃষ্ট সংকট।কোভিড-১৯ দ্বারা সৃষ্টি অর্থনৈতিক ব্যাঘাত নজিরবিহীন বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়ে চলেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্হা,যেমনটা দ্বিতীয় শতাব্দীর অ্যান্টোনাইন প্লেগ রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছিলো। তবে যতক্ষণ না আমরা জানবো জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ কত দ্রুত এবং সম্পুর্ণভাবে শেষ হয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত অর্থনীতিবিদদের পক্ষে অর্থনৈতিক সংকটের পরিণতি সম্পর্কে পুরোপুরি ভবিষ্যৎবাণী করা অসম্ভব। কোভিড-১৯ মহামারী এক অভুতপুর্ব মানব সংকট সৃষ্টি করেছে।এই মহামারীজনিত স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য গৃহীত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো বিশ্বব্যাপী মারাত্মক অর্থনৈতিক মন্দার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।এই মুহুর্তে অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতা ও স্হায়িত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত করে কোনো উপসংহারে আসা না গেলেও এটা যে ভয়াবহ হতে পারে তা অনুমাণ করা যায়।আইএমএফ গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি প্রতিবেদনে দেখায়,আর্থিক ব্যবস্হা ইতোমধ্যে নাটকীয় প্রভাব অনুভব করছে এবং সংকটের আরও তীব্রতা বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকটের স্হায়িত্বকে প্রভাবিত করতে পারে।এটা যেমন জনস্বাস্থ্য, তেমনি অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্হিতিশীলতার চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।অর্থনৈতিক সংকট গভীরতর করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আমরা দেখছি,করোনাভাইরাসের প্রসারণ রোধ করার জন্য বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো লকডাউন ঘোষণা করে নিজ নিজ সীমান্ত বন্ধ করে দিয়ে স্হল,নৌ ও আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে স্বস্ব দেশাভ্যন্তরে গণজমায়েত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমুহ,কর্মক্ষেত্রগুলো,শিল্পসহ সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গোটা দেশের নগর-বন্দর,শহর ও বাজারগুলো,অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ইত্যাদি বন্ধ করে দিয়েছে এবং চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে মানুষকে ঘরে আবদ্ধ করে ফেলেছে বিধায় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও ক্রিয়াকলাপ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
এই লকডাউন যেটাকে আইএমএফ “গ্রেটলকডাউন”বলে অভিহিত করেছে,তার ফলে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক মানুষ তাদের চাকুরী ও কর্ম হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছে। এর ফলে কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই ২৬-মিলিয়ন মানুষ বেকার হয়ে বেকার ভাতার জন্য সরকারি দপ্তরে আবেদন করেছে।গত মার্চে এদেশটার কর্মহীন মানুষের গড় সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪.৪%,অন্যান্য বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে চীনে বেকারত্ব ৫.৯%,দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩.৮%, অস্ট্রেলিয়ায় ৫.২%, এবং জার্মানিতে ৫.০% হারে বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্হা (আইএলও) পুর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বজুড়ে পাচঁ থেকে পচিঁশ মিলিয়ন কর্মসংস্থান হারাবে-যার সাথে শ্রম আয়ের পরিমাণ ৮৬০-মিলিয়ন থেকে ৩.৪-ট্রিলিয়ন আমেরিকান ডলার হবে।আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে যে,করোনার প্রভাবগুলো ২০০৭-৮ সালের বিশ্ব আর্থিক সংকটের চেয়েও গভীর হতে পারে।”অনুমান দেখায় যে,পরিস্হিতি নির্বিশেষ, বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য ১৯৯০সালের পর প্রথমবারের মতো বৃদ্ধি পেতে পারে।এর ফলে কয়েকটা দেশ প্রায় তিন দশক আগের দারিদ্র্য স্তরে ফিরে যেতে পারে।” বিশ্বব্যাংক মনে করে অবস্হার অবনতি ঘটলে একমাত্র পুর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অন্জ্ঞলে দারিদ্র্য বাড়তে পারে এগারো কোটি মানুষের।
নাইরোবি ভিত্তিক দাতব্য সংস্হা অক্সফামের অভিমত, করোনাভাইরাস প্রভাবে প্রায় আধাবিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যতায় পর্যবসিত হতে পারে।সবচেয়ে মারাত্মক দৃশ্যে অক্সফাম বিশ্বাস করে যে,চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা বিশ্বব্যাপী ৪৩৪-মিলিয়ন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৯২২-মিলিয়নে উন্নীত হবে।প্রতিদিনের ৫.৫০-ডলারের নীচে জীবনযাত্রার সংখ্যা ৫৪৮-মিলিয়ন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে চার বিলিয়নে উন্নীত হবে। বিশ্ববাণিজ্য সংস্হা (ডাব্লিউ টি ও) পুর্বাভাস দিয়েছে যে,করোনা মহামারী দ্বারা সৃষ্ট মন্দা আর্থিক সংকটের তুলনায় বাণিজ্যে আরও মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। সংস্হার মতে,বিশ্ববাণিজ্য এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ডাব্লিউ টিও আরও জানায় বিশ্ববাণিজ্য ভলিউম চলতি বছরে ১২.৯% হতে ৩১.৯% পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।সংস্হা আরও জানায়,”উভয় পরিস্হিতিতেই বিশ্বের সমস্ত অন্জ্ঞল ২০২০ এবং ২০২১ সালের আমদানি-রফতানিতে দ্বি-সংখ্যার (ডাবল ডিজিট) হ্রাস পাবে।ব্যবসা বন্ধ,বেকারত্ব বৃদ্ধি, আয়ের ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক উদ্বেগ, আমদানি-রফতানির সংকট,শিল্পসহ ম্যানুফ্যাকচারিং উৎপাদনে ধ্বস,সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রিতে প্রচণ্ড আঘাত(সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রি আমেরিকা, চীনসহ অনেক উন্নত-অনুন্নত দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ ও কর্মসংস্থানের একটা অন্যতম প্রধান উৎস।)সার্ভিস খাতে দেশগুলোতে খুচরো বিক্রি তীব্র ভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিশ্লেষক আইএসএইচ,মার্কিতের মতে, পরিবহণ,রিয়েল এস্টেট, ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের ব্যবসায় বড় ধরণের আঘাত ইত্যাকার বিষয়সমুহে মারাত্মক আঘাত আসায় বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়েছে।ভাইরাসের কারণে সকল ধরণের উৎপাদন ক্রিয়াকলাপ স্হবির হয়ে পড়েছে। পণ্য ও উপকরণ সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়েছে উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারীগণ।ফলে উৎপাদক ও সরবরাহকারী- উভয় পক্ষই যেমন ক্ষতির মুখে পড়েছে, তেমনি এর ফলে বিশ্ববাণিজ্য হ্রাস পাওয়ার শংকা দেখা দিয়েছে এবং এটা সাধারণ মানুষকেও প্রভাবিত করছে।সর্বোপরি,পণ্যগুলোর চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় নির্মাতারা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে।ফলে আমেরিকা থেকে ইউরোপ ও এশিয়ার কারখানাগুলোতে গত এক মাসে আউটপুট কমে গেছে।তাই বাণিজ্যও কমে গেছে বড় আকারে।আইএমএফের ক্রিস্টালিনা জর্জিভা বলেন,উদীয়মান বাজারগুলো ইতোমধ্যে বিনিয়োগে প্রায় ১০০-বিলিয়ন ডলার ক্ষতি করেছে,যা ২০০৮ সালের বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকটের মূলধনের চেয়ে তিনগুণ বেশি। বিশ্বে জিডিপি ক্ষতি হবে ৯-ট্রিলিয়ন ডলার। এভাবে বিশ্ব আজ অর্থনৈতিক সংকটে নিপতিত হয়েছে করোনার প্রভাবে।

লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক,কলামিস্ট।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.