ঠিক ২০ বছর আগে আমি শেষ বারের মত এয়ারফোর্সের ইউনিফর্ম পড়েছিলাম। এই লেখাটি লেখার আগে, আমাকে বেশ কয়েকবার ভাবতে হয়েছে- আমি আসলেই এই কথাগুলো বলতে চাচ্ছি কিনা। আমি জানি অনেকেই আমার লেখা গুলো ঠিক পছন্দ না করলেও, অজ্ঞাত কারনে তা পড়ে থাকেন। এই দায়বদ্ধতা থেকেই এয়ারফোর্সের নীল ইউনিফর্মের পিছনের কিছু অজ্ঞাত কালো রঙের ছোঁয়া আর কিছু অভিশপ্ত ইতিহাসের গল্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ,২১ বছর বয়সী অল্প জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন তরুণকে একটি রাষ্ট্র কিভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছিল- তা তুলে ধরছি।
আমি আমার সামরিক বাহিনীতে প্রশিক্ষনের ইতিহাসে কোনদিন দৌড়ে ফেল করিনি, শুধু একবার ব্যতীত।শুধু একবার মাইল টেস্টে ফেল করেছিলাম, তাও ৩ মাইলের দৌড়- শেষ করতে হবে ২২ মিনিটে। আমি তখন থার্ড টার্মে- প্রথম দুইমাইল ইজিলি শেষ করে ফেলেছি, তৃতীয় মাইলের অর্ধেকটা শেষ করে ক্যাডেটস মেসের সামনে এসেই হঠাৎ করে মাসল পুল করল, আমি পরে গেলাম মাটিতে। আর উঠে দাঁড়াতে পারিনি, খুব সম্ভবত মুসাব্বির রেসকিউ করে আমাকে নিয়ে এসেছিল- তারপর বেইস হাসপাতালে চিকিৎসা।এরকম অসংখ্য স্মৃতি বিসর্জন দিয়ে কেন আমাকে চলে আসতে হলো ? আসলে, নিয়তি… আমি হয়তো বিমান বাহিনীতে নিজের কমিশন লাভের জন্য যোগদান করিনি, করেছিলাম অন্যদের কমিশন প্রাপ্তিতে সহায়তা করতে। এটাই নিয়তি, আমি জানতাম না যে সকল ক্যাডেট এক ভাবে মূল্যায়ন বা প্রশিক্ষন লাভ করেনা। আমি জানতাম না যে বাহিনী প্রধানের সন্তান অন্যদের থেকে আলাদাভাবে ট্রিটমেন্ট পায়। আমি জানতাম না তার উড্ডয়ন প্রশিক্ষক থেকে শুরু করে ব্যাটম্যান সব আলাদা ভাবে একাডেমীতে নিযুক্ত হয়েছিল একজনের জন্য- আমরা ছিলাম নৈমিত্ত মাত্র।
এয়ারফোর্স থেকে আমাকে আপসারন ছিল সম্পূর্ন পরিকল্পিত। এর পেছনের মানুষগুলো কি নিষ্ঠুর ভাবে তারা আমার সামনে অভিনয় করে গেছেন। এমনকি, আগেরদিন বিকেল বেলাও আমি মাইল টেস্ট দিয়ে পাস করে গেছি, গেমসে হ্যান্ডবল খেলতে নেমে ৪টি গোলও করে ফেলেছি। প্রেপ টাইম, ডিনার, ঘুম সব শেষ করে ব্রেকফার্স্ট টেবিল থেকে উঠিয়ে নিয়ে আমাকে জানানো হল- আমি নেই। কি আশ্চয্য, এর পরে দেড় ঘন্টার মধ্যে আমাকে একা বাসে ঊঠিয়ে দিয়ে বিমান বাহিনী তার দায়িত্ব শেষ করেছিল। তারা একবারও মনে করেনি, এই তরুনকে অবশ্যই তার অভিভাবকের হাতে তুলে দেয়া তাদের দায়িত্ব কারণ উপযুক্ত হলে কমিশন বা ব্যর্থ হলে প্রত্যাহার হলে অবশ্যই তার পরিবার জানবে । কেউ কিছু জানেনা, আমি রাতের বেলা যশোর থেকে পটুয়াখালীতে পৌছে গেলাম একা একা। এই গল্পগুলো আসলে মিলবে না কোনদিন, অথচ আমি যখন সেকেন্ড টার্মে তখন সেই সামরিক অভ্যর্থনায় নতুন ক্যাডেট যখন সম্পূর্ন মানসিক ভারসাম্য হারায়- তার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা হয়েছিল সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। এতদসত্বেও সে যখন আনফিট থেকে যায়, তখন তার অভিভাবকের উপস্থিতিতেই আমি সহ্য অন্যান্য এপয়নমেন্ট হোল্ডাররা তাকে বিদায় জানিয়েছিলাম। এমনকি যে ছেলেটি, স্বেচ্ছায় প্রশিক্ষণ থেকে অব্যহতির দীর্ঘ চেস্টা করেছিল –তাকেও তার অভিভাবকের সহায়তায় ও দায়িত্বে একাডেমি বিদায় জানিয়েছিল।আমার দুর্ভাগ্য, আমি উড্ডয়ন প্রশিক্ষক হিসাবে যাকে পেয়েছিলাম, তার মত দুর্বিনীত আচরণের প্রশিক্ষক ছিল একাডেমিতে বিরল- শাস্তি দিতে দক্ষতা ও খ্যাতি অর্জন করায় তাকে ওঝা হিসাবে ডাকত সবাই। একটা ছোট গল্প বলি, ইনিশিয়াল ফ্লাইং এর সলো প্রাকটিস চলছে- স্বাভাবিক ভাবেই আমি একটা চেক ভুলে গিয়েছিলাম। শাস্তি হিসাবে জুটলো পুরো চেকলিস্ট এক রাতের ভেতরে ১০ বার লিখে দেখানো। রাতের বেলায় ডিঊটি অফিসার সহ সবাইকে ফাকি দিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে সেই চেকলিস্ট আমি পরের দিন ৬ বার পর্যন্ত লিখে তার দ্বারস্থ হয়েছিলাম। বিনিময়ে সেদিনের ফ্লাইঙের হাত থেকে অব্যাহতি লাভ করেছিলাম টাইট ফ্লাইং শিডিউল এর সময় নস্ট করে। স্কোয়াড্রন কমান্ডারের কাছে, এই দক্ষ প্রশিক্ষকের হাত থেকে নিজেকে অব্যাহতির আবেদনও করতে হয়েছিল। এমন ঘটনাও আছে, ফ্লাইং শুরু হওয়ার আগে উনি আজগুবি সব প্রশ্ন করা শুরু করে দিলেন আমাকে প্যানিক করার জন্য। আমি হয়তো কিছু একটা ভুলে গেলাম, রানওয়েতে গিয়ে উনি বললেন- আই হ্যাভ দ্যা কন্ট্রোল। এয়ার ক্রাফট ঘুরিয়ে চলে আসলেন , মিশন বুকে এসে লিখে দিলেন DNCO- Student not prepared. এমন ঘটনাও আছে, ডুলো ফ্লাইং এ ল্যান্ড করে রেডি হচ্ছি সলোতে যাবার জন্য উনি রান ওয়েতে নামিয়ে দিলেন , বললেন ফ্রন্টরোল দিয়ে ফ্লাইং ট্রেনিং উইং এ আসতে। সেই উত্তপ্ত রান ওয়ে, ট্যাক্সি ওয়ে ফ্রন্ট রোল দিয়ে আসতে আসতে হাত ছিলে গেছে- হলিডেতে সহোদর বড় ভাই দেখা করতে এসে হাতের অবস্থা দেখে বেকুব।সবার পেশাগত দক্ষতা বা প্রশিক্ষণ গ্রহনের মান সমান নাও হতে পারে, তাই ২ এর ৩ না শুরু হয়ে ৯ নাম্বার প্রশিক্ষণ সূচীর সাথে আমি তাল মেলাতে পারিনি। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ইনিশিয়াল ফ্লাইং এর সলো করে, ১৫ ঘন্টার সিলেবাসে জেনারেল ফ্লাইং না করেই সরাসরি- ইন্সট্রুএমেন্টাল ফ্লাইং, তাও আবার কাভার্ড ককপিট ইন্সট্রাক্ট্রের আসনে।ভালো করতে পারিনি, কাভারড হয়ে গেলেই আমার মাথা ঘুরতে থাকতো আর বমি শুরু হত।একবার প্রগ্রেস চেক খেয়েও সেটাও উৎরে যাই। কিন্তু সেই সব দক্ষতা সম্পন্ন প্রশিক্ষক যারা নিয়ত আমাকে মিথ্যবাদি বালক প্রমানে নিজেদের উজাড় করে দিতেন, তাদের সেই প্রশিক্ষনে আমিও ধৈর্য হারাই- বীতশ্রদ্ধ হয়ে পরি ফ্লাইঙের প্রতি। এমনকি, আমার সর্বশেষ মিশন যা সাসপেনশন চেক নামে খ্যাত তার শুরুতে আমি আমার প্রশিক্ষককেও জানিয়ে ছিলাম, স্যার আই ডোন্ট ফিল লাইক টু ফ্লাই এনিমোর… আমাকে বলা হয়েছিল, আমার চয়েস দেয়ার জন্য। আমি জানিয়েছিলামও, কমিউনিকেশন এন্ড রাডার বিভাগের- অপেক্ষাও ছিলাম। আমার সাথে এতো সুন্দরভাবে অভিনয় করা হচ্ছিল যে, আমি ফাইনাল টার্মের মিড টার্ম পরীক্ষাও শেষ করেছিলাম। আর বাকি ছিল, ১৩৩ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা- তাহলেই বিএসসি ইন এরোনটিকস ডিগ্রী।গ্রাজুয়েশন প্যারেড এর প্রস্তুতি হিসাবে প্যারেড গ্রাউন্ডে একদিন রাস্ট্রপতি সালামের প্রাকটিসও করে ফেলেছিলাম। আমি কি বোকা ছিলাম… চিন্তা করুন একজন সামরিক ক্যাডেট বারবার শপে হেয়ারকাট নেয়ার পরে নাপিত যখন তার মাথা বানায় বা ঘাড় টিপে তখনো আমি বোঝার চেস্টা করিনি- কমিশন নামক সোনার হরিন পেতে চাইলে কিছুতেই এর লেজে পা দেয়া যাবেনা। অথচ, আমি গিয়েছিলাম তার আক্রোশ মেটানো এক ক্যাডেটের পক্ষে গিয়ে তার বিরূদ্ধে বিদ্রোহ করতে। আই ওয়াজ সো ফুল… ঠিক ৫ মাস আগে তার বিদায়ি রাতে আমাকে সরাসরি হুমকি দিয়ে গিয়েছিল, জামিল এভিথিং উইল গো টু ভেইন- ইউ উইল নেভার গেট কমিশন ফ্রম বাংলাদেশ এয়ার ফোর্স। অথচ, আমি বাল(!!!) হবে… বাহিনী প্রধানের ছেলের হুমকিকে পাত্তা দেইনি।
বিশ্বাস করুন, আমি এতোটাই বিমান বাহিনীর সততাকে বিশ্বাস করতাম যে, যশোর থেকে চলে আসার সময় এয়ারফোর্সের একসেট ইউনিফর্ম-পিটি ড্রেস-বুট- ফ্লাইং মডেল- পাঠ্যসূচীর প্রেসি ক্যাডেটস ট্রাংকে ভরে পটুয়াখালী নিয়ে এসেছিলাম। আমি চলে আসার পরে, খুব সম্ভবত মাস দেড়েক পরে একরাতে স্বপ্নে দেখলাম আমি একডেমিতে আবার ফেরত গেছি, সকাল বেলা পিটি গ্রাউণ্ড, কিউ এফ আই ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মেহেদি আমাকে দেখে বলছে, জামিল আর ইউ ব্যাক ? লেটস স্টার্ট ফ্লাইং… আমি মনে হয় পিটি-৬ এর স্টার্ট আপ চেক এখনো পারবো, সেই হ্যাস চেক- হ্যাসেলো চেক, টেক মি পাপা টু ফাক ইন হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া, বেস লেগে স্পীড কত থাকবে সব মনে আছে এই ২০ বছর পরেও। যেশোর… স্ট্রেঞ্জার ৫৪৫, রিকোয়েস্ট ট্যাক্সিং… টাইম চেক। আমি সেদিন সকালে কাউকে কিছু না বলেই এয়ারফোর্সের পিটি ড্রেস পরে নবাবপাড়ার আকন বাড়ির বাসা থেকে ডিসি কোর্ট, চৌরাস্তা, পুরাতন ফেরিঘাট, ফায়ার সার্ভিস, পিডিএসএ মাঠ হয়ে এক চক্করে পটুয়াখালী ঘুরে এসেছিলাম- দেখেছিলাম সেই এয়ারফোর্সের রানিং ভুলিনি। এরপরে সব ভুলতে শুরু করলাম, একে একে সব কিছু… আমি জেনে গেলাম এয়ারফোর্স ইজ এ ওয়ান ওয়ে টিকেট- একাডেমি আমাকে বাকি ১৩৩ নম্বরের পরীক্ষা দেয়ার বহিরাগত পরীক্ষার্থী হিসাবেও বিবেচনা করেনি। আমি সেই জাতীয় বিস্ববিদ্যালয়েয় বদান্যতায় ডিগ্রি প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে একটা গ্রাজুয়েশন সার্টিফিকেট নিলাম।আমি হয়তো ভুলেই গিয়েছিলাম সব কিছু, সেইসব অসম্ভব প্রতিভাবান কোর্স মেট, আমরা কেউ কাউকে চিনতাম না। অথচ, আমরা এক সাথে স্বপ্ন দেখতে চাইতাম- জাংগল সারভাইভাল ক্যাম্পে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম, ৯ মাইল রেসে এক/ দুই জন অসুস্থ হয়ে গেছে আমি তাদের কাউকে কাউকে বেল্টে ধরে বা তার হাতের রাইফেল নিজে ক্যারি করে দৌরাচ্ছি- পরীক্ষার আগেরদিন বমি করে অসুস্থ কেউ, আমি চুপিচাপি চিকিৎসা চালিয়ে ধামা চাপা দিচ্ছি- যাতে তার টার্ম মারা না যায়। যে ছিল আমাদের ২ কোর্স সিনিয়র ঘাপলা করে আমাদের সাথে চলে আসায় তাকে প্রানের স্যাঙ্গাৎ কোর্স মেট ভেবে তার জন্য বাহিনী প্রধানের ছেলের ঝামেলাকে নিজের কোলে টেনে এনেছি অথবা তার আন অথোরাইজড পানিশমেন্ট ক্যারি করতে গিয়ে জুনিয়র অসুস্থ হয়ে গেলে সেই কুস্মাণ্ডকে বাচানোর জন্য ওই সময়ে একাডেমীতে না থাকলেও তার অন্যায় কাজের দায় নিতে এপয়েনমেণ্ট র্যাঙ্ক হারিয়েছি। এয়ারফোর্স কাউকে উড্ডয়ন ব্যার্থতার জন্য প্রশিক্ষণ হতে বহিস্কার না করতে পারলেও আমার বরখাস্ত আদেশে লেখা ছিল ফ্লাইং এন্ড ডিসিপ্লিন। যে তথাকথিত ডিসিপ্লিন ভাঙ্গার দায়ে আমাকে দোষী করা হয়েছিল, তার দায় নিয়েছিলাম আমরা সকল কোর্স মেট এবং তার জন্য একাডেমিক পানিশমেণ্ট তার আগের টার্মেই আমরা দীর্ঘদিন পালন করেছিলাম – এবং তা শেষেও আমাদের অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল পানিশমেন্ট থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবেই। কি ছিল সেই পানিশমেন্ট শুনবেন ? আমাদের টানা ১ মাস ইউনিফর্ম পরে থাকতে হয়েছিল, প্রতি ঘন্টায় দিন-রাত নির্বিশেষে ক্যাডেটস মেস থেকে দৌড়ে গিয়ে গার্ড রুমে সাইন করা, দুপুরে লাঞ্চের পর এক্সট্রা ড্রিল, রাতের বেলা ডিনার শেষ করেও তাই- অব্যাহতি ছিলনা স্বাভাবিক কোন রুটিন শিডিউল থেকে। আমরা ২ মাস সাপ্তাহিক কোন ছুটি পাইনি, বেজ থেকে ছূটির দিনে শহরে যেতে পারতাম না, আরও কতকি… অথচ সব শেষ হয়ে গেল, ২০ বছর পরে এই বিষাক্ত স্মৃতিকে আমি মনে করতে চাইনি। আমি চলে আসার পরে আরও অনেক কিছু জানতে শিখলাম, যেমন সেই বিমান বাহিনী প্রধানের ছেলে যিনি এয়ারফোর্সের জিডি(পি) কোর্সে জয়েন করেছিলেন, তার জন্য যোগদানের নিয়মেও ঘাপলা তৈরি করা হয়েছিল। যেখানে বিমান বাহিনীতে যোগদানের পূর্বশর্ত ছিল এইচ এস সি বিজ্ঞানে অবশ্যই গণিত বিষয় থাকা এবং নূন্যতম ৬০% নম্বর প্রাপ্তি, সেখানে এই কুতুব পাকের গণিত পাঠ্য সূচিতেই ছিল না। যেখানে সকল বাহিনীর ক্যাডেট নির্বাচনের একমাত্র সোর্স আই এস এস বি উত্তীর্ন হওয়া, সেখানে এই কুতুব আই এস এস বির ধারে কাছে না গিয়েও সরাসরি কোর্সে যোগদান করেছিলেন। এমনকি তার কমিশন প্রাপ্তির পর সে যে স্কোয়াড্রনে পদায়ন লাভ করে ছিল সেখানে বিমান ঘটতির কারনে সিনিয়র জ্যাম থাকা স্বত্বেও তাকে সবাইকে ডিঙ্গিয়ে ফ্লাইং শেষ করিয়ে অপারেশনাল পাইলট বানানো হয়েছিল। যদিও তা টিকে থাকেনি ১ বছরের বেশি, পরবর্তীতে তদন্তের মাধ্যমে তাকেও বিমান বাহিনী অপসারণ করে। এবার আরেকটু নৈব্যার্ক্তিক ভাবে দেখি, কি হত আমি যদি এয়ারফোর্সে না যেতাম- জি আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিভাগের স্নাতক/ স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়ে ডিসি-এস পি হওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হতে পারতাম। এবার মুদ্রার অপর পীঠের গল্প বলি, আমার মত ২১ বছরের তরুনের সেই স্বপ্নটা ভাঙ্গতে শুরু করে সেদিন, যেদিন তার অসুস্থ মা তাকে অন্যান্য কাছের আত্মীয় পরিজনের অব্যাহত কাউন্সেলিং এর ফলে তাকেই দোষারোপ শুরু করে। সেদিন রাতে মায়ের পাশে শুয়ে, সেই ছেলেটি বলেছিল “ মা, আমি যদি এয়ারফোর্সে এক্সিডেন্ট করে মারা যেতাম তুমি কি খুশী হতে”। জবাবে মা কেঁদেছিল অঝোর নয়নে, আর কোন দিন সে তার সন্তানকে দোষ দেয়নি।তারপরও সে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে একটি আবেদন পাঠিয়ে ছিল মানবিক দিক বিবেচনা করে তার ছেলেটিকে আরেকবার সুযোগ দেয়ার- জবাবও এসেছিল প্রাপ্তি স্বীকার করে, ওই পর্যন্তই।
জীবন থেমে থাকেনি, থাকবেও না কোনদিন। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, যাদের বিশ্বাস বা দায়িত্বহীনতায় আমাকে ফিরে আসতে হয়েছিল তারা অন্ততঃ তাদের শাস্তি পাবেই। কেউ কেউ শাস্তি পেতে শুরু করেছে , বাকিরাও করবে এ বিশ্বাস আমার আছে। কারণ, মিলিটারি একাডেমির প্লাটুন কম্যান্ডার শিখিয়েছিল নাথিং গোউজ আন পেইড ইন দিস ওয়ার্ল্ড। আমি শুধু আমার দিক থেকে বলতে পারি, কারা আমার বিরুদ্ধে এডভার্স রিপোর্ট দিয়েছিল আমি তাদের চিনি। আমার সেই কোর্সমেটদের কেউ কেউ যাদেরকে বাধ্য করা হয়েছিল বা তারা স্বেচ্ছায় আমার বিরুদ্ধে লিখিত স্টেটমেন্ট দিয়েছিল- তাদের সবার পরিচয়ই আমি জানি। এই পৃথিবী একদিন তাদের অপকর্মের শাস্তি দেবেই।
আমি যখন এইচ এস সি পরীক্ষা শেষ করে প্রথম প্রাথমিক যাচাইয়ের জন্য নির্বাচনি কেন্দ্রে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম- কিছু বোঝার আগেই আমাকে মেডিক্যাল থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল, বলা হল নী-লক। মানে হাটু নাকি লেগে যায় সমান্তরাল ভাবে দুই পা পাশে লাগালে। আমি তখন র্যাংক ব্যাজ চিনিনা, কিছুটা জোর করেই মেডিক্যাল অফিসারের কাছে চলে গিয়েছিলাম তার নেম প্লেটে নাম দেখলাম আনিস। তাকে বিনীত ভাবে জানিয়েছিলাম, আমি কি করে আমার নী লক সারাতে পারি। সদয় সেই চিকিৎসক আমাকে ২ মিনিটের মধ্যে কিছু ব্যায়াম দেখিয়েছিলেন আর বলেছিলেন রানিং করতে। দুই বছর পরে আবার যখন আমি নির্বাচনি লাইনে দাড়াই তখন আমি তিন মাসের ব্যায়াম আর রানিং সহ লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম- কেউ আমাকে বাদ দিতে পারেনি। সেই অফিসারকে আবার পাই, চট্টগ্রাম সি এম এইচ এ , যখন কোম্পানি লাইনে আমরা অনেকেই মাম্পস এ আক্রান্ত হয়ে আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসার পরে বি এম এ তে ফিরে আসি তারপরও আমার কিছু জটিলতা থেকে যায়। আমাকে আবারো পাঠানো হয় সি এম এইচ এ তাকে দেখেই আমি পূর্ব পরিচয়ের বর্ননা দিলাম । উনি চিকিৎসা সহ আমাকে দিলেন অনেকের কাছে আরাধ্য ফাইভ ডেয এস আই কিউ, মানে স্টে ইন কোয়ার্টার। মানে জানতাম না, তাই পরের দিন ইউনিফর্ম ছাড়াই সিভস পরে বি এম এ’র ক্লাসে হাজির হই। প্লাটুন কম্যান্ডার, সিক চিট দেখে সরাসরি পাঠিয়ে দিলেন কোম্পানি লাইনে। মহা রাজকীয় অবস্থা, আমি রুমে বসে খাবার খাই- ঘুমাই, কোন পানিশমেন্ট ফল ইন নেই। তখন দেখলাম লুকিয়ে ভিন্ন চিত্র, ওভার ওয়েটের কারনে তৎকালীন এক ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেলের ছেলে আমার এক কোর্স সিনিয়র হলেও, তাকেও লাঞ্চের পর সিনিয়ররা ওজন কমানোর জন্য কম্বল প্যারেড করাচ্ছে- কোন ছাড় নেই। অথচ সম্পূর্ন ভিন্ন চিত্র আমাদের দেখতে হয়েছিল এয়ারফোর্সের একডেমিতে।সেই মেজর আনিসকে দেড় বছর পরে আবারো পাই যশোরে বেজ হসপিটালে। এবার উনি আমাকে ভুলেননি, আমকে দেখলেই ২ টি ই ডি বা এল ডি লিখে দিতেন ( এক্সকিউজ ডিউটি, লাইট ডিউটি, প্যারেড পিটি গেমস এক্সকিউজড ইত্যাদি)….. এরকম কত মজার কাহিনী। সব শেষ হয়ে গিয়েছিল এক রকম বজ্রনিনাদে।
ক্যাডেট লাইফে আমি,নওশাদ, জাকির, শামিম সব সময়ই প্রতিযোগিতা করতাম কে কতোটা ফিজিকালি টাফ তা প্রমান করার জন্য। একবার ১১ কিমির একটা ক্রস কান্ট্রি আমরা রমজানের মধ্যে রোজা রেখে ফিনিস করি দুর্দান্ত ভাবে- অথচ সেই বাহিনী প্রধানের ছেলে একজন সারাদিন রোজা রাখা ক্ষুধার্ত আমাকে নির্ধারিত সময়ে ডিনারের বদলে ৫ জগ পানি খেতে বাধ্য করেছিল। আমি সে ধরনের নির্মমতাও চেপে হজম করে গেছি, ক্যাডেট লাইফের শেষদিনে জুনিয়র সুযোগ পায় বিদায়ী সিনিয়রের সাথে যে কোন মজা করার এমনকি পশ্চাতদেশে লাথি মারার। অথচ এদের প্রতি পুরো একাডেমির ঘৃণা এতোটাই ছিল- এদের বিদায়ি দিনে এদের দিকে কেউ থুথুও দেয়নি।
এই দেশে সবই সম্ভব, আমাকে কেউ মোটিভেট করে হয়তো আরও ১০-১২ ঘন্টা বেসিক ফ্লাইং অন্য কোন প্রশিক্ষকের মাধ্যমে করালে, আমি হয়ত একজন ফ্লায়ার হিসাবে টিকে থাকতে পারতাম। কেউ চিন্তা করেনি, মফস্বল শহর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষ শেষ করা ছেলেটি ২ বছর পরে কই যাবে । কেউ মানবিক ভাবেও বিবেচনা করেনি, একজন সরকারী প্রথম শ্রেনীর কর্মকর্তা যিনি সদ্য অবসরে গিয়েছেন তার ছেলেটিকে বিনা নোটিশে বাড়ি পাঠালে তার মানসিক অবস্থা কি হতে পারে। এই রাস্ট্রের কাছে আমাদের আবেগ, পরিশ্রম, যোগ্যতার কোন মূল্য ছিল না। খুব সম্ভবতঃ এই দেশে কমিটমেণ্ট আর ডিগনিটির কোন মূল্য নেই।জুনিয়র আমানের কথা মনে পরে খুব, যে ছেলেটি কমিশন লাভ করার পরেই এয়ারফোর্স কে থুথু দিয়ে চলে এসেছিল। সেই ছেলেটি যে আমাকে নিয়ে ফ্লাইং ট্রেনিং উইং থেকে শেষ বারের মত বের হয়ে যাওয়া জীপের পেছনে কাঁদতে কাঁদতে ছুটেছিল।আমি এয়ারফোর্স থেকে চলে আসার সময় খুব করে খুজেছিলাম উইং কম্যান্ডার শাহ আজাদ আলিকে- খুব সম্ভবত তার হৃদয়ের মাঝে এই ছেলেটি তার স্কুল বয়সে হারানো পিতাকে খুঁজে ফিরতো।
মাই টুয়েন্টি লং ইয়ার্স টু লুক এহেড… চিয়ার্স!!!!
টুকু জামিল , সাবেক ফ্লাইট ক্যাডার, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ।

