আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: ভারতে যেমন আছে প্রকট বৈষম্যের গল্প আছে সাম্প্রদায়িক নীতির গল্প ঠিক তেমনি এর বিপরীত গল্পও আছে ভারতে। আছে সমতার উদাহরণ আছে মানবিক সরকার ব্যবস্থার গল্পও। দূর্যোগে নিজ রাজ্যের নাগরিকদের রক্ষার্থে এমনই এক উদাহরণ হিসেবে সামনে এলো কেরালার বাম সরকার।
করোনার পরিস্থিতিকে সামাল দিতে কেরালার সকল নাগরিকদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিলো সরকার। নাগরিকদের রক্ষার্থে সংকটকালীন বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করে রাজ্য সরকার সকলের সামনে তুলে ধরেন, করোনা পরিস্থিতি এখন শুধু স্বাস্থ্য সমস্যাই না, সাথে অন্যান্য বিষয়গুলোকেও আমলে নিতে হবে।
আর এসব দিক মাথায় রেখেই কেরালার প্রতিটি নাগরিকদের জন্য এক মাস বিনামূল্যে খাবার জোগান দেবে পিনারাই বিজয়নের সরকার। কে কত আয় করে, সেই হিসেবনিকেশ করবে না সরকার। এক্ষেত্রে নাগরিকদের ভেতর কোন বৈষম্য মেনে রেশন ব্যবস্থা চালু করবে না সরকার। সবার জন্য সমান এবং একই ধরনের রেশন চালু থাকবে। এখানে প্রথম শ্রেণির নাগরিক বা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক এমন বাছবিচার করা হবে না।
ফলে করোনা নিয়ে উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতিতে কেরালার বাম সরকারের ঘোষণায় এটাও স্পষ্ট হয়েছে যে প্রয়োজনে সব স্তব্ধ হলে সাধারণ মানুষ সঙ্কটে পড়বেন না।
শুধু বিনামূল্যে রেশনই নয়, রাজ্য এবং রাজ্যবাসীর জন্য ফের একগুচ্ছ ইতিবাচক পদক্ষেপ ঘোষণা করেন তিনি। মূখ্যমন্ত্রী বিজয়ন ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেন। বিপুল পরিমাণ এই অর্থ যেমন স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় হবে, তেমনই ঋণ মকুবে সহায়তা করবে। সামাজিক কল্যাণ ভাতা, ভর্তুকিযুক্ত খাদ্যদ্রব্য, কর ছাড়, এরিয়ার ছাড়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাগ-ভাগ করে বরাদ্দ করা হয়েছে এই প্যাকেজে। সামাজিক সুরক্ষা বাবদ যেসব ভাতা এপ্রিল মাস থেকে দেয়ার কথা ছিল রাজ্য সরকারের, তা এই মাস থেকেই দেয়া হবে বলেও জানিয়েছেন।
দু’মাসের আগাম পেনশন দেয়া হবে। যারা কোনোরকম ভাতার আওতাভুক্তই নন, তাদের জন্যও হাজার টাকা করে বরাদ্দ করা হয়েছে। পাঁচশো কোটির একটি ‘হেল্থ প্যাকেজ’ও এদিন ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এপ্রিল মাস থেকে যে হাজার হোটেল চালু হওয়ার কথা ছিল, সেগুলোও এই মাস থেকেই খুলে যাবে। জরুরিভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। সেই সমস্ত হোটেলে খাবারের দামও ২৫ টাকা থেকে কমিয়ে ২০ টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। কোনোরকম জরিমানা ছাড়াই বিদ্যুৎ এবং পানির বিল একমাস পরও শোধ করতে পারবেন রাজ্যবাসী।
কোভিড-১৯ ভাইরাসের কবল থেকে রাজ্যের প্রতিটি মানুষকে বাঁচাতে যেমন কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বিজয়নের সরকার, তেমনই রাজ্যের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে এই শক্তিশালী উদ্যোগ। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই মহামারীর জেরে সাধারণ জীবনযাপন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। আমাদের রাজ্য বিশাল অঙ্কের এক ক্ষতির মুখে। অর্থনীতিকে যা দুর্বল করে দিচ্ছে। ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক পরিকাঠামোকে বাঁচিয়ে তুলতেই এই প্যাকেজের ঘোষণা।’ ভয়ঙ্কর এই বিপর্যয়ের সময়ে দাঁড়িয়ে দারিদ্রসীমার উপরে বা নিচে বলে কোনো ভেদরেখা টানতে চায়নি কেরালার বাম-গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট সরকার। বিজয়ন বলেন, ‘দারিদ্রসীমার উপরে থাকা পরিবারগুলোও ১০ কেজি করে খাদ্যশস্য পাবে। এর জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।’
কর্মসংস্থান সুনিশ্চিত করার যে প্রকল্প তার জন্য বরাদ্দ হয়েছে দু’হাজার কোটি। রাজ্যে কমপক্ষে ৫০ লক্ষ মানুষ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা খাতে ভাতা পেয়ে থাকেন। সেই ভাতাও দু’মাসের আগাম হিসাবে দেয়া হবে এমাসেই, জানান বিজয়ন। আর যে সমস্ত পরিবার কোনো ভাতার আওতায় নেই তাদের হাজার টাকা করে ভাতা দেয়া হবে, যার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১০০ কোটি। ‘অটো ট্যাক্সি ফিটনেস’, ‘এন্টারটেইনমেন্ট ট্যাক্স’-এ ছাড়ের কথাও ঘোষণা করেছেন বিজয়ন। রাজ্য বাজেটে ঘোষণা করা হয়েছিল, হাজারটি ভর্তুকি দেয়া খাবারের দোকান খোলা হবে এদিন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সেপ্টেম্বর থেকে এই দোকানগুলো চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এপ্রিল থেকেই এগুলো চালু করার। ২৫ টাকার পরিবর্তে ২০ টাকার মিল করা হয়েছে।’
কেরালায় বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ২৮ জন। এদিন কাসারগড়ের এক বাসিন্দার শরীরে এই ভাইরাসের সন্ধান মিলেছে। মূখ্যমন্ত্রী বিজয়ন জানান, ‘৩১ হাজার ১৭৩ জনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৩৭জন হাসপাতালে।’ করোনা ভাইরাস দেশের প্রতিটি রাজ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু কেরালা অন্যান্য ক্ষেত্রের মতোই একেবারে অগ্রগামী এবং ব্যতিক্রমী ভূমিকা নিয়েছে। রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থার পাশাপাশিই রাজ্যকে বিপর্যয় থেকে টেনে তুলতেও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিল পিনারাই বিজয়ন নেতৃত্বাধীন এলডিএফ সরকার।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বারবারই কেরালা মডেলকে সামনে এনে অন্য রাজ্যগুলোকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়, এবারো ফের দৃষ্টান্ত তৈরি করে দিল এই রাজ্য। সূত্র : বাংলা

