১৪ই ফেব্রুয়ারি, মতানৈক্যের কোনো সুযোগ নেই

১৪ই ফেব্রুয়ারি । বাংলাদেশের জন্য এমন একটি দিন যা নিয়ে কিছু লিখতে গেলেই কলম জড়তায় জড়িয়ে আসে। সেটা বিস্তারিত না বললে যেমন ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ তৈরি হবে। ঠিক উল্টোভাবে না লিখেও মনকে সায় দিতে পারছি না । কেন এমন হয় ? সেটাই বলার চেষ্টা করবো।

সবার জানা আছে সারা বিশ্বে ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন্স ডে হিসেবে পরিচিত । আবার বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দিনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ । ১৯৮৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি হিসেবে। যা কিনা ” স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস ” ।

প্রথমেই ভালোবাসার কথা দিয়েই শুরু করি। তৃতীয় শতাব্দীর একজন ইতালিয়ান পাদ্রী ও চিকৎসকের স্বরণে দিনটিকে অনেক খ্রিস্টান দেশে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে হিসেবে পালিত হতো। কালক্রমে সেটাই ভালোবাসা দিবস হিসেবে পালিত হতে শুরু করে। ভ্যালেন্টাইন্স ডে এর ইতিহাসে বিস্তারিত আর যাচ্ছি না । তবে প্রশ্ন থাকে বাংলাদেশে মূলত কবে থেকে এই দিবস উদযাপন শুরু হয় ?

অনেকের মতে ৮০ দশক থেকে এ দিনটি বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হয়ে উঠে। তার স্বাভাবিক কারণ হলো ফেব্রুয়ারিতে এই সময়েই শুরু হয় বসন্ত ঋতু। বসন্ত ফুল ফোটার সময় আর বসন্ত প্রেমের সময় বলে একটি কথা প্রচলিত আছে। ফুল আর প্রেম এগুলোর সমন্বয়েই ভ্যালেন্টাইন্স ডের একটা বন্ধন মনে মনে হলেও চলে আসে।

ভ্যালেন্টাইন্স ডে সত্যি সত্যি কবে থেকে বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হয়ে উঠে ? এটার একটি স্পষ্ট ব্যাখা আমার জানাটি বলছি। আমি প্রবাস জীবনে ৯৫/৯৬ সালের দিকে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি যায়যায়দিন সাপ্তাহিক পত্রিকাটি পোস্টের মাধ্যমে পেতাম। এটা পত্রিকার অফিসের সাথে আমার সরাসরি একটি চুক্তি ছিলো।  সেই সময়ের কারেন্সি ইউরো ছিলো না, অষ্ট্রিয়ায় ছিলো শিলিং । আমার স্পষ্ট মনে আছে বাংলাদেশের যায়যায়দিন পত্রিকার সাথে বাৎসরীক চুক্তি ছিলো ৩,৬০০ টাকার । অর্থাৎ বছরে ৪৮ টি, প্লাস ঈদ ও অন্যান্য বিশেষ সংখ্যা পাঠাবে। আমি প্রতি সপ্তাহে অধীর আগ্রহে চেয়ে থাকতাম পত্রিকাটির জন্য । এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন, কোনো সপ্তাহেই পত্রিকাটির মিসগাইড হতো না । মানে পত্রিকা অফিস থেকে যত্ন সহকারেই পোস্টগুলো পাঠানো হতো।

মনে পরে সেই সময়ে প্রবাসে, বিশেষ করে অষ্ট্রিয়ার লিন্জ শহরে কোনো বাংলা পত্রিকা দুরে থাক, এমনকি বাংলা বই পাবার কোনো সুযোগই ছিলো না । হঠাৎ হঠাৎ কেউ একজন যদি বাংলাদেশে যেতো ( তাও আবার ভিয়েনা থেকে ) অনুরোধ/আকুতি করে দু একটি বই পেতাম , তাও কালভেদ্র । কেননা বাঙ্গালীরা দেশ থেকে সেই সময়ে রান্না করা মাছ/মাংস এমনকি কাঁঠাল পর্যন্ত নিয়ে আসতো। বই আনায় আমি কারো তেমন কোনো আগ্রহ দেখিনি। জানিনা কেন ? তবে আমার যতবার দেশে যাওয়া হয়েছে, সাথে কেবলমাত্র বই এনেছি, এমনকি কাপড়/চোপড়ও তেমনটা নয়। সেই জন্যেই সম্ভবত আমার ঘরে বর্তমানে একটি ছোটখাটো চমৎকার লাইব্রেরি আছে, যেখানে আছে বাংলা বইয়ের সমারোহ।

কথায় কথায় ভিন্ন কথায় চলে গেলাম। মানুষের মনটিই বুঝি এমন হয়। স্মৃতির পাতা থেকে কিছু বলতে গেলেই নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া মুশকিল হয়। যাকগে, বাংলাদেশের এই ভ্যালেন্টাইন্স ডে নিয়ে যতটুকু মনে পরে, ৯২ সালে যায়যায়দিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক শফিক রেহেমান সাহেব ভ্যালেন্টাইন্স ডে নিয়ে প্রথম একটি বিশেষ সংখ্যা বের করেন, যার নাম সম্ভবত ছিলো ‘ ভালোবাসা দিবসের বিশেষ সংখ্যা ‘। যার কিনা প্রথম সংখ্যাই বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। পাঠকদের লেখা পত্র থেকেই পত্রিকাটি ভালোবাসা দিবস হিসেবে বিশেষ সংখ্যা বের করে । তারপর থেকে সংখ্যাটি প্রতি বছরই বেশ জনপ্রিয়তা পায় । পরবর্তীতে শফিক রেহমান সাহেব মা দিবস , বাবা দিবসেও বিশেষ যায়যায়দিন সংখ্যা বের করতেন এবং জনপ্রিয়তাও পেয়েছিলেন। যায়যায়দিন পত্রিকাটি দৈনিক পত্রিকায় রূপান্তরিত হবার পর থেকেই সব এলোমেলো হয়ে গেলো। আমার জানা মতে শফিক রেহমান সাহেব বিএনপি সরকারের নিকট হতে যায়যায়দিন পত্রিকার কার্যালয়ের রোডটির নাম ( যা কিনা তেজগাঁওয়ে কোথাও হবে) ভালোবাসা রোড বা লাভ রোড নামকরণ করিয়ে নিয়েছিলেন। বর্তমানে আছে কিনা জানিনা ।

জানি আমাদের দেশে ভালোবাসার প্রকাশ খুব স্বাভাবিক ব্যাপার মোটেও নয়। মানুষ স্বচ্ছন্দে ভালোবাসার কথা, প্রকাশ্যে তেমন বলতে পারে না । আমাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সাথে প্রকাশ্যে ভালোবাসা খুব একটা মাননসই নয়। তবে গত কয়েক দশক ধরে আমাদের দেশেও এই দিবসটি বিশেষ করে তরুণ সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বলেই শুনি। মফস্বল বা গ্রামে দিবসটি বর্তমানেও তেমন কোনো অর্থ বহন করে না । বিশ্বের রক্ষণশীল অনেক দেশে ভালোবাসা দিবস উদযাপনকে কেন্দ্র করে অনেক অঘটনও ঘটেছে, পত্র পত্রিকায় দেখেছি। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে এই দিবস পালন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা আছে। তবে গর্ব হয়, আমরা বাঙালিরা কত উঁচু মানের সংস্কৃতি ধারণ করি, আমাদের  সংস্কৃতি কতটা সহনশীল, তার প্রমাণ এই ভালোবাসা দিবস। আমাদের এখানে কিছু কিছু মহল থেকে পালনে বারণের কথা আসলেও, মারামারি কাঁটাকাটি হয়নি । বাঙালিরা সত্যি ভালোবাসার ধারক বাহক বটে। অন্তত আমার কাছে তাই মনে হয়।

লক্ষ্যণীয় যে, এই দিবসের কল্যাণেই আমরা অন্তত প্রকাশ্যে অনেককেই ভালোবাসার কথা  বলতে পারি। আমি নিজেও এই দিবসে লিখেছি , আসুন সবাই যেন খোলা মনে বলতে পারি ভালোবাসি। হতে পারে সেটা মা /বাবা/ ভাই/ বোন / সন্তান/ প্রিয়জন বা আরো অনেককেই। ভালোবাসা মানেই গোপন প্রেম নয়। ভালোবাসা তো হৃদয়ের বিষয় । আমরা মানুষেরা তো অনেককেই হৃদয়ে ভালোবাসা দিয়েই ধারণ করি। তাহলে বলতে অসুবিধে কোথায়? তবে হ্যাঁ এই দিবসটি পালনের মধ্য দিয়ে আমরা বাঙালিরা অনেকেই জড়তা কাঁটিয়ে উঠে বলতে শিখেছি , ‘ভালোবাসি’। সন্তান তার মা/বাবাকে বলতে শিখেছে, ভালোবাসি । ভাই বোনকে বলতে শিখেছে ভালোবাসি। প্রেমিক প্রেমিকাকে বলতে শিখেছে ভালোবাসি। সর্বোপরি দেশের জনমানুষ বলতে শিখেছে ” বাংলাদেশ তোমাকে ভালোবাসি ” । তাই বলছিলাম দিবসটি একেবারে ফেলনা কিছু নয়। আমাদের কিন্তু অনেক দিয়েছে বলতে হবে। এই দিবসকে ঘিরেই ভালোবাসার মানুষগুলো যে অনেক ক্যাটাগরির হতে পারে, সেটা আমরা কিছুটা হলেও শিখেছি।

কেন এই কথা বললাম ? আমার নিজের কথাই বলি, আমার এখন ভীষণ আফসোস হয়, আমার মা/বাবার গলা জড়িয়ে কখনোই বলতে পারিনি ” মা বা বাবা তোমাদের ভালোবাসি ” ! জানিনা আমার মতন বয়সের আপনারা কয়জন সত্যি মা/বাবাকে বলতে পেরেছেন ভালোবাসি । আজ আমার সত্যি আফসোস হয়, কেননা আমাদের সময় মা/বাবা/ভাই/বোন বা কাছের প্রিয়জনকে ভালোবাসি বলাটাই ছিলো একপ্রকার বেয়াদবি।

এখন আসি আমাদের ইতিহাসের বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ৮৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারির ” স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস” এর কথায় ।

আমি বেশি ইতিহাসে যাবো না। তারপরেও ছোট্ট করে বলি, এই দিনেই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে শুরু হয় ছাত্র আন্দলোন, ধীরে ধীরে অনেক জল গড়িয়ে যেটি গণআন্দোলনের রূপ পেয়েছিলো। জেনারেল এরশাদের বিতর্কিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেই সময়ের শিক্ষামন্ত্রী ড: মজিদ খান ১৯৮২ সালের ২৩ শে সেপ্টেম্বর একটি নতুন শিক্ষানীতির প্রস্তাব করেন । সেখানে প্রথম শ্রেণী থেকেই আরবি এবং দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। আর উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য মাপকাঠি করা হয় মেধা অথবা পঞ্চাশ শতাংশ ব্যয়ভার  বহনের কথা। মূলত এই নীতি ঘোষণার পর থেকেই আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা। ৮৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারিতে স্মারকলিপি দিতে শিক্ষার্থীরা মিছিল করে সচিবালয়ের দিকে যাবার সময় পুলিশ গুলি চালায় । এতে জাফর, জয়নাল, মোজাম্মেল, আইয়ুব ও দীপালি সাহা সহ নিহত হয় অন্তত ১০জন । মূলত ছাত্র সমাজের দাবি ছিলো একটি অবৈতনিক শিক্ষানীতি । কিন্তু মজিদ খানের নীতিতে ছিলো শিক্ষাকে বানিজ্যিকরণ, সাথে ছিলো ধর্মীয় প্রতিফলন।  তাই শুরু থেকেই ওই নীতির বিরোধীতা করে শিক্ষার্থীরা। সেখান থেকেই এরশাদ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সকল গণআন্দলোন, এরশাদ মজিদ খান শিক্ষানীতি স্থগিত করতে বাধ্য হয়, অতঃপর একদিন এরশাদের বিদায়।

আসুন ইতিহাসের এই দিনটিকে দেখি আমাদের দেশের অবস্থান থেকে। সত্যি বলতে এই একই দিনে বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডের ভ্যালেন্টাইন্স ডে আমাদের দেশেও সমান তালে চালু হবার কারণেই কি ? বা বি-রাজনৈতিক একটি দিবস একই দিনে হবার কারণেই কি ” স্বৈরাচারে প্রতিরোধ দিবস ” ম্লান হয়ে গেছে ?

এটা অনেকটা দাবার গুটির চালের মতন। হাতী/ঘোড়া চাল দিয়ে দেখা এবং অপেক্ষা করা, কোথায় গিয়ে ঠেকে ? সত্য হলো, প্ল্যান প্রগরাম করে এই দিবসকে আমাদের দেশে ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’কে ম্লান করার জন্য আনা হয়নি । এই দিবসটি সেই সময়ে না আসলেও আধুনিক এই টেকনোলজির যুগে কখনো না কখনো চলেই আসতো । আজকের দিনে নিউইয়র্কে বৃষ্টি হলে সেই শহরের বাঙালি প্রবাসীদের আগেই দেশের মানুষজন জেনে ফেলে ।

স্পষ্ট করেই বলা ভালো যে, আমাদের দেশের জন্মসূত্র  হলো রাজনীতি বা রাজনীতির কল্যাণেই এমন একটি যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশ । এই দেশ স্বাধীন হবার পরেও অনেক রাজনৈতিক ইতিহাস আছে এবং প্রতিনিয়তই রাজনৈতিক ইতিহাস গড়ছে। খেয়াল করলে দেখা যায়, এই দেশের প্রতিটি মানুষই রাজনৈতিক সচেতন বটে। তাছাড়া এই দেশটি গড়ার পিছনে যে বিদ্যা প্রতিষ্ঠানটির এত অবদান রয়েছে, যে প্রতিষ্ঠান থেকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এবং একটি জঘন্য শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দলোন প্রতিরোধে মাধ্যমে এমন একটি

দিবসের উৎপত্তি, এমন সেই প্রতিষ্ঠান থাকতে কখনোই এমন একটি দিবস ” স্বৈরাচারে প্রতিরোধ দিবস ” শেষ হবার নয়। এই দিবস যুগ যুগ ধরেই শিক্ষার্থীদের ইতিহাস শিক্ষা দিয়েই যাবে। এই দিবসটি শিক্ষার্থীরা স্বৈরাচারের অপকর্মের কারণে এবং তাদের নিজেদের আপন শিক্ষার্থীদের অকাল ও অনাকাঙিক্ষত চলে যাবার কারণেই কভু ভুলবে না এবং ভুলতে পারে না । ভুলতে পারে না তাদের সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে নিজেদের রক্তকে।

১৪ই ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন্স ডে ঠিক আছ, তবে আমাদের ইতিহাসের জন্য তারচেয়েও বড় এটি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস । এই দিনে এত বিতর্কের পরেও ভালোবাসা, ভালোলাগা, অনুভূতি সব প্রকাশ পাবে, ভালোবাসা দিবস পালিত হবে, হোক। তাতে আপত্তি থাকবে না কোনো । যাদের জন্য দিনটি অনুভূতি প্রকাশের কেবলি বাহানা মাত্র, সেই বাহানা থেকে বের হয়ে এসে,  সত্যিকারের ভালোবাসা একে অপরের মাঝে গড়ে উঠুক, গড়ে উঠুক ভালোবাসা এই মাটির জন্য, গড়ে উঠুক ভালোবাসা সেই সব তরতাজা অকাল মৃত প্রাণ, জাফর-জয়নাল-মোজাম্মেল-আইয়ুব-দীপালি সাহ সহ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দলোনের সকল নিবেদিত প্রাণের জন্য । ভালোবাসার প্রাণ এই বাংলা, সেই ভালোবাসার কল্যাণেই এই মাটির ইতিহাস কখনোই ভুলবার নয়। ভালোবাসা দিবসে তোমাদের সকলের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও লাল সালাম।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার 

সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.