ঢাকার বই মেলা এখন একটা ফ্যাশন উৎসবের নাম

Habib Babul বই পড়া সংক্রান্ত তোমার পোস্ট দেখলাম। মন্তব্যটা সর্বজনের উদ্দেশ্যে দিলাম।

বাবুল, তোমার দেখা পরিবর্তন অত্যন্ত সত্য। আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের অভ্যাসে পরিবর্তন ঘটিয়েছে অনেক। যেমন, একসময় রাস্তা দিয়ে কেউ একা একা কথা বলতে যাচ্ছে বা একপাশে দাঁড়িয়ে অনবরত বিভিন্ন অভিব্যাক্তিতে বিড়বিড় করছে, দেখলে আমরা ধরে নিতাম, নির্ঘাত মাথার গণ্ডগোল আছে । এখন এ দৃশ্য সর্বত্র দৃশ্যমান মোবাইল ফোনের বদৌলতে।

বিদেশের মতো বাংলাদেশে ট্রেনে, বাসে, স্টিমারে ভ্রমণ পথে মানুষ বই পড়তো। অনেক আগে India Today-তে কাজ করার সময়, লক্ষ্য করলাম ভারতে সাধারণ মানুষ যাত্রা পথে প্রচুর বই, ম্যাগাজিন ইত্যাদি পড়ে। যার অধিকাংশ হিন্দিতে। অন্য কোন কারণ নয়, হিন্দি ভাষী জন সংখ্যাধিক্যের দেশ বলে। India Today গ্রুপের একটি হিন্দি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘মনোরমা’ প্রকাশিত হোতো, যার প্রচুর কাটতি। সেই সাথে সেই সময়ের চটুল হিন্দি হিট ছবির লেখক গুলশান নন্দার গল্পের বইয়ের পাঠকও অনেক। বিশেষ যে দিকটি আমার নজরে পড়লো, তা হোল, এই ম্যাগাজিন এবং বইগুলি bold অক্ষরে ছাপা। স্বাভাবিক আগ্রহ থেকে সহকর্মীদের কাছে এর কারণ জানতে চেয়েছিলাম। উত্তর ছিল, ‘আমাদের প্রধান পাঠক হচ্ছে পথ চলতি মানুষেরা। যারা হয় বাসে, ট্রেনে কিম্বা জলপথে ভ্রমণকারী। চলন্ত অবস্থায় অথবা পর্যাপ্ত আলোর অভাবে পাঠকের জন্য সুবিধা করতে bold type-এর ব্যবহার।’ এ ব্যাপারটি আমি ঢাকায় অনেকের দৃষ্টি গোচরের বিফল চেষ্টা করেছিলাম।

মোবাইল প্রযুক্তি প্রবলভাবে সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় উন্নত বিশ্ব এবং তৃতীয় বিশ্ব পাঠক রুচি বদলে দেয়। আগে লন্ডনের পাতাল রেল, ট্রেন অনেকটা চলন্ত লাইব্রেরী মনে হোতো। দেখতাম, শুধু পত্রিকা নয়, অনেকে বই পড়ছে এবং পড়া শেষ হয়ে গেলে সেটি সিটে রেখে নেমে যাচ্ছে। আরেকজন সেটি নির্দ্বিধায় তুলে পড়ছে। আমি অনেক বই, ম্যাগাজিন সংগ্রহ করেছি এ ভাবে। এখন তেমন পরিমাণ পত্রিকা, বই ইত্যাদির পাঠক দেখিনা ট্রেনে বাসে। তবে বিলাতে এখনো অনেক পাঠক দেখি, যারা মাথা গুঁজে বই পড়ছে, মোবাইল পকেটে রেখে। এই অভ্যাস বাংলাদেশে একেবারেই নাই বললে চলে।

এবার আরও একটা ব্যাপার চোখে পরেছে। কলকাতা এবং ঢাকার পাঠক পার্থক্য। কলকাতার প্রখ্যাত বই পাড়া কলেজ স্ট্রীটে ক্রেতার ভিড়। যেখানে শুধু স্কুল কলেজের বই কিনতে নয়, অনেকে আসে অন্যান্য বই পুস্তক কিনতে। এর এক ভগ্নাংশ দেখেছি ঢাকার নীলক্ষেত বই পাড়ায়। যেটি পীড়া দিয়েছে, ঢাকায় পাঠাগারের শূন্যতা। আমাদের সময়ের পাঠাগারগুলো হারিয়ে গেছে ফ্লাট বাড়ীর নীচে। যেমন গুম হয়ে গেছে ঢাকার অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো। আদি ঢাকায় ঘুরে ঘুরে দেখলাম সুরীটোলার প্রাথমিক বিদ্যালয় বা ভাগলপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় যদি বা আছে, নাই বৈদ্যনাথ প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং আরও কিছু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সে সব স্থানে হয় তথাকথিত ইংলিশ মিডিয়াম ব্যবসায়িক বিদ্যালয়-কলেজ, অথবা আকাশ ছোঁয়া ফ্লাট বাড়ী। ( নতুন ঢাকায় এসবের, পাঠাগার- সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বালাই নাই )। প্রসঙ্গতঃ অনেক বড়ো বড়ো সমাজ সচেতন বক্তব্য প্রদানকারীদের মধ্যেও এতদ সম্পর্কে কোন বিকার নাই। এক বন্ধুর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আদি ঢাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লিস্ট সম্পর্কে। তিনি বিষয়ের গুরুত্ব অনুধাবন করা দূরের কথা, কাজটি করে দিতে বিনয়ের সাথে তার অক্ষমতা জানিয়ে দিয়েছেন। অথচ তার সম্পৃক্ততা রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেশার সাথে। হা হতস্মি !

ঢাকার বই মেলা এখন একটা ফ্যাশন উৎসবের নাম। অনেক পাঠক এখনো আছে ঠিকই, তবে ভিড় করে সেজেগুজে যারা বই কিনছে, টেলিভিশনের ক্যামেরায় হলুদ সাংবাদিকদের কাছে সাক্ষাৎকার দিচ্ছে, তারা সবাই সেই অর্থে পাঠক নয়। প্রমাণ পাওয়া যায়, প্রায় সব বাড়ীতে ঘর সাজানোর দেশী- বিদেশী উপকরণ যত দেখা যায়, বই পুস্তক ম্যাগাজিন ইত্যাদি দেখা যায় না সেখানে। সেসব বাড়ীর সন্তানেরা যতটা সময় দেয় অন লাইন শপিং করতে, ততটাই অনাগ্রহী বই পড়তে। অবশ্য নিম্ন মধ্যবিত্তের ঘরে এখনো কিছুটা বই প্রীতি রয়েছে বলেই বই মেলায় বিক্রি কিছুটা হলেও আছে। কিন্তু প্রকাশকদের জন্য খুব সুখকর নয় বিষয়টি। অথচ কলকাতার বই মেলার চিত্র বেশ ভিন্ন।

শেষ কথা, প্রযুক্তি এগবেই। মানুষের রুচির পরিবর্তন হবেই। এখানকার ( বিলাত ইউরোপ ) অবস্থা অনেক অগ্রসরমান। তারপরেও এখানে বই পুস্তকের দোকান কিম্বা পাবলিক পাঠাগারে পাঠকের ভিড় কমে যায় নাই। বরং এদের ভাষ্য, ছাপা বইয়ের- ম্যাগাজিনের কাটতি নাকি বাড়ছে আবার। আমরা অনুকরণপ্রিয় জাতি, তবে মন্দ ব্যাপারে, ভালোর নই। যা আগে ছিল, এখনো আছে।

সুজা মাহমুদ। লন্ডন প্রবাসী লেখক এবং সাংবাদিক

শুদ্ধস্বর/বি এস

 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.