আজ ২৪ জানুয়ারি, মহান গণঅভ্যুত্থান দিবস। ১৯৬৯ সালের এই দিনে ঐতিহাসিক ১১ দফার ভিত্তিতে রচিত হয় মহান গণঅভ্যুত্থান। আত্মাহুতি দেন মতিউর ও রুস্তম। এর আগে ২০ জানুয়ারি ছাত্রদের মিছিলে গুলি হলে শহীদ হয়েছিলেন ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান। এ হত্যার প্রতিবাদেই ২৪ জানুয়ারি প্রদেশব্যাপী ডাকা হয়েছিল সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। বস্তুত, এই মহান গণঅভ্যুত্থানের বীজ রোপিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান নামক যে রাষ্ট্রটির গোড়াপত্তন হয়েছিল, তার প্রতি বাঙালির মোহমুক্তি ঘটে ১৯৪৮ সাল থেকেই। মহান ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতিসত্তাকে নতুনভাবে উজ্জীবিত করে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বাঙালির স্বার্থের পক্ষে আপসহীন যুক্তফ্রন্ট জয়ী হলেও সে রায় মানা হয়নি। ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ, প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে বাঙালি জাতিসত্তাকে বিকশিত করার পক্ষে নিরলস প্রচেষ্টা চালানো হয়। ১৯৬২ ও ১৯৬৪ সালের শিক্ষা আন্দোলন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালিকে আবারও ঐক্যবদ্ধ করে। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা ঘোষণা করেন। ছয় দফা দাবির ভিত্তিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ দেশব্যাপী প্রচার চালায় ও একে জনপ্রিয় করে তোলে। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ প্রমাণ করেছিল_ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও বাঙালি জাতি কত অসহায়। ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধুসহ অন্য নেতৃবৃন্দের নামে আইয়ুব শাহি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও ছয় দফাকে সামনে নিয়ে নিরন্তর আন্দোলনের সূচনা করে। পাশাপাশি মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর অনুসারীরা এবং পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও বিভিন্ন দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন অব্যাহত রাখে। ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি মতিউর রহমানের আত্মদানের মধ্য দিয়ে গোটা পূর্ব পাকিস্তান অগি্নগর্ভ হয়ে ওঠে। জনগণ রাজপথে নেমে আসে। এর পেছনে ছিল ছাত্রলীগ এবং এদেশের ছাত্রসমাজ। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আইয়ুব শাহি ক্ষমতা ত্যাগে বাধ্য হয়।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ দেশের ছাত্রসমাজ স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সুনির্দিষ্টভাবে কর্মপন্থা গ্রহণ করেছিল। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান দেশকে নিয়ে যায় স্বাধীনতার পথে এবং ছাত্রসমাজ থাকে এ আন্দোলনের সামনের সারিতে।
১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ১ নম্বর অভিযুক্ত হিসেবে ফাঁসির আদেশের ঝুঁকির মুখে। তাকে মুক্ত করে আনে ছাত্র-জনতা। মুক্ত বিজয়ী বীর শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে ছাত্রসমাজ, ডাকসু ও ছাত্রলীগ ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পশ্চিমাদের ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহা বাঙালিকে এক দফার আন্দোলনের পথে নিয়ে যায়। সাড়ে সাত কোটি মানুষের তখন একজনই নেতা_ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অবশেষে নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আসে আমাদের এই স্বাধীনতা। আমরা যদি ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই, স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, ৩ নভেম্বর জেল হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে সামরিক শাসকরা। ১৯৭৫-১৯৯০ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এ দেশের ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল অগ্রগামী সেনার মতো। সে কারণেই ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে স্বৈরশাসক এরশাদের পদত্যাগের দিনটিকে আমরা ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান দিবস হিসেবে পালন করি।
বর্তমান বিশ্বের রাজনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ধর্মের নামে যে জঙ্গিবাদী কার্যক্রম চলছে তা গোটা বিশ্বে শান্তিকামী মানুষকে এক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তদ্রূপ স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত শক্তিরা বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদী কার্যক্রমের মাধ্যমে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তাই আজকের ছাত্রসমাজের কর্তব্য জঙ্গিবাদ, মৌলবাদকে মোকাবেলা করে শিক্ষা, প্রগতি, শান্তি ও গণতন্ত্রের লড়াইকে অব্যাহতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কোনোক্রমেই যেন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া
ব্যাহত না হয়, যে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা সূচিত হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে; আগামী দিনগুলোয় তা জনগণকে অসাম্প্রদায়িক মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন এক সমাজ গড়ার প্রত্যয় হোক ছাত্রসমাজের অঙ্গীকার।
শফি আহমেদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ছাত্রলীগ (জাসদ সমর্থিত), নব্বইয়ের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের অন্যতম নেতা, বর্তমানে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা ।

