দিনান্তে দেখা হলে- খাতুনে জান্নাত

কবি (খাতুনে জান্নাত) ও তার কবিতা সম্পর্কে: আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী/খাতুনে জান্নাতের ‘ দিনান্তে দেখা হলে’ কাব্যগ্রন্থ প্রসঙ্গে/ নুরুজ্জামান মনি

কবি (খাতুনে জান্নাত) ও তার কবিতা সম্পর্কে: আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী

কবিতা নিরন্তর খোলস বদলায়।সাহিত্যের আর সব শাখার চাইতে ভাবে, ভাষায় অলংকরণে, প্রকরণে কবিতার সাজসজ্জা নিরন্তর পরিবির্তিত হয়।কবিতায় আজ যা আধুনিক কালই তা গতানুগতিক। উত্তর আধুনিকতা তার গত আধুনিকতার সীমানা দ্রুত পেরোয়। তারপরও আধুনিকতার পালাবদল শেষ হয় না।

বাংলা কবিতায় একসময় ছিলো রবীন্দ্রনাথের অখন্ড প্রতাপ। ত্রিশের দশকের আধুনিকতা সেই প্রতাপের অখন্ডতায় চিড় ধরালো। আবার চল্লিশের দশক না পেরুতেই ত্রিশের আধুনিকতাতেও কালের ছাপ পড়ে গেল। বাংলা ভাগ হয়ে গেল। কিন্তু বাংলা কবিতা কিছুকাল ভাগ হলো না। কিছুকাল হাতধরাধরি করে চললেন দুই বাংলার আরও তরুণ কবিরা। তারপর দেশভাগ, সমাজ ও সংস্কৃতির ভিন্ন প্রবাহ তাদের কবিতায় ভিন্নমাতায় দ্বার যোজনা করলো। সুরটি হয়তো ভাষার গুনে এক রইলো। কিন্তু চিন্তায় ও চেতনায় শোনা গেল গঙ্গার এপার এবং ওপারের ভিন্ন তরঙ্গের ধ্বনি।

কেউ কেউ বলেন, বাংলা কবিতায় উত্তরাধুনিকতার ছাপ এসে লেগেছে। আমি এটাকে ছাপ লাগা এখনো বলি না; বলি আবহাওয়া বদলের পূর্বাভাসের মতো। বাংলাদেশের কবিতার কবিতার আকাশে এটাও পূর্বাভাস, কিন্তু পুরোপুরি বদলাতে পারেনি।পূর্বাভাস র্আবহাওয়া বদলের, কিন্তু পুরোপুরি বদলাতে পারেনি। নতুন প্রজন্মের একেবারে তরুণ কবিরা নিরন্তর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বৈরী সমাজ ও সময়ের প্রতিকূলতা ও ভাঙনের মুখে কবিতাকে তার নিজ পরিবর্তনের স্রোতে নতুনভাবে নির্মাণের—তা শুধু ভাবে ও ভাষায় নয়; তা মননে, দ্রোহে এবং সৃষ্টিশীলতাতেও।

খাতুনে জান্নাত বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের একেবারেই নতুন এক কবি। তার এবং তার কবিতার সঙ্গে আমার পরিচয় আকষ্মিক। কিন্তু তার সমাজ চিন্তা ও ব্যক্তিগত ভাবনা যখন সব জাগতিক স্থুলতা পেরিয়ে পাঠকের সূক্ষ্ণ মননে আঘাত করে,তাকে সুপ্ত বা উদ্দীপ্ত করে, তাকে স্বসময়ের বাইরে অনাদি আধুনিকতার স্পর্শ দেয় তখন বিস্মিত হই। তার কবিতা প্রথম পাঠেই আমি বিস্মিত হয়েছি। তার কবিতা প্রথাগত চিন্তার নয়; একেবারে প্রথাগত আঙ্গিকেরও নয়। তার কবিতায় ব্যক্তিমনের যন্ত্রণার সঙ্গে যুগ যন্ত্রনাও আছে। কিন্তু তার প্রকাশটি কাব্যিক। তা অকাব্যিক শ্লোগান হয়ে ওঠেনি। এজন্যই তার কবিতা পাঠকের মন স্পর্ করার ক্ষমতা রাখে। তার কবিতার এ যাদুস্পর্শ আমিও পেয়েছি এবং বিস্মিত হয়েছি। আমার ধারণা, তিনি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কবিতার আকাশে একটি উল্কা হয়ে থাকতে না চাইলে একদিন নক্ষত্র হয়ে উঠতে পারবেন। সেই প্রতিভা ও ক্ষমতা তার কবিতায় স্পষ্ট। এজন্যেই তার প্রথম কবিতার বই ‘দিনান্তে দেখা হলে’র ভূমিকা লিখতে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি এবং তার কবিতার সম্ভাবনাশীল ভবিষ্যতের দ্বারোদঘাটন করতে পেরেছি ভেবে আনন্দ ও তৃপ্তিবোধ করছি।

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী

এজোয়ার, যুক্তরাজ্য

২২ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯

খাতুনে জান্নাতের ‘ দিনান্তে দেখা হলে’ কাব্যগ্রন্থ প্রসঙ্গে/ নুরুজ্জামান মনি

…………………………………………………………………………………….

খাতুনে জান্নাতের সাথে আমার পরিচয় ছিল না। কবি হিসেবে তো নয়ই ব্যক্তিগতভাবেও পরিচয়ের কোন সুযোগ ঘটেনি। কিন্তু যেহেতু বাগদেবীর আরাধনায় জীবনের অধিক সময় ব্যয় করেছি এবং এখনো করে যাচ্ছি, তাই সতীর্থ কারো সাথে কোন পথের মোড়ে কিংবা ঢেউবোনা নদীর বাঁকে সাক্ষাৎ দৈবাৎ কোন ঘটনা নয়। বরং অনিবার্যই বলা যায়। সেই বাঁধা নিয়মের পথ ধরেই তার প্রথম ‘ভ্রূণ সৃষ্টির উন্মাদনা’ ‘দিনান্তে দেখা হলে’ র সাথে আমার সাক্ষাৎ।

বইটি খুলে ফ্লাপে পাওয়া গেল তার পরিচয়। বয়সের দিক থেকে তিনি নবীন নন। ১৯৬৯ সালের ১২ জুলাই তার জন্ম। সেই হিসেবে তিনি চল্লিশোর্ধ, প্রৌঢ, প্রাজ্ঞ। কিন্তু কবি হিসেবে তিনি সেই প্রাজ্ঞতার দাবী করতে পারেন না। নিজের লেখা যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও গ্রন্থভূক্ত হয়ে পাঠকের সামনে না এলে তিনি বয়সে নবীনই থেকে যান।

সেই নিরিখে খাতুনে জান্নাত নবীন কবি। কবিতার সমূদ্র পথে তিনি সাহসী নবীন নাবিক। আমি তাই নতুন কবির কবিতা পড়ার প্রস্তুতি নিয়ে গ্রন্থের দ্বার উন্মোচন করে ভেতরে ঢুকতে দোরগোড়ায় পেলাম প্রাজ্ঞ কবি আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন খাতুনে জান্নাতকে পরিচয় করিয়ে দিতে। খাতুনে জান্নাত কবি ও তার কবিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বললেন, ‘তার কবিতা প্রথাগত চিন্তার নয়, একেবারে প্রথাগত আঙ্গিকেরও নয়। তার কবিতায় ব্যক্তিমনের যন্ত্রণার সঙ্গে যুগ যন্ত্রণাও আছে। কিন্তু তার প্রকাশটি কাব্যিক।’

খাতুনে জান্নাতের কবিতা বিশ্লেষণ করার আগে কবি হয়ে ওঠা সম্পর্কে দুটো কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন বলে আমার মনে হচ্ছে। কবিতা সম্পর্কে এখনো অনেকের ধারণা যে কবিতা ঐশী বাণীর মতো। এ বাণীগুলো কোনো স্বর্গীয় দেবদূত কবির মনে মগজে পৌঁছে দেন আর তা আপনা আপনি কবিতা হয়ে ওঠে।

কিন্তু এরকম ধারণা কে পুরোপুরী খারিজ করে দিয়েছেন আধুনিক যুগের অন্যতম কবি অধ্যাপক বুদ্ধদেব বসু।

কবিতা রচনায় পারদর্শিতা অর্জন করতে হলে নিজেকে আগে প্রস্তুত করে নিতে হয়। অঙ্কন শিল্পি যেমন রঙ ও রেখার তাৎপর্য সঠিকভাবে বুঝে রঙতুলির কাজ করে, শিল্পকে বুঝে শিল্প ভাঙে গড়ে, ফিগারকে করেন এবস্ট্রাক্ট। শিল্পে নিয়ে আসেন সুররিয়ালিজম- তেমনি কবিকেও শব্দের মালার ভেতরে জীবনের নির্যাস বইয়ে দেওয়ার জন্য নিজের মনোজগতকে কবিতা নির্মাণের উপযোগী করে নিতে হয়। যেহেতু কবি মানেই কালোত্তীর্ণ,, যুগোত্তীর্ণ মানুষ, ভবীষ্যৎ দ্রষ্টা, আগামীর পথ প্রদর্শক, সেহেতু তার জ্ঞান হবে দ্বিধামুক্ত, সরল এবং ঋজু।

খাতুনে জান্নাত তার ‘কবির কথা’য় বলেছেন, কবিতাকে ভালোবেসে হাঁটতে শুরু করেছিলাম কবিতার রাজ্যে সে শৈশবেই। হাঁটতে পেরে একসময় নিজেকে সরিয়ে নিলাম কেন যে নিলাম সে উত্তর আজো খুঁজে পাইনি।’ খাতুনে জান্নাত যে উত্তর খুঁজে পাননি, কিন্তু আমার কাছে সে উত্তর র’য়ে গেছে। তিনি নিজেকে বড় করে খুঁজে পেতে নিজেকে সরিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি হয়তো বুঝতেও পারেননি শুরুর আগেও যে একটা শুরু থাকে। রবীন্দ্রনাথ যেটাকে বলেছেন কুপি জ্বালানোর আগে সলতে পাকানোর মুহূর্ত- তিনি সেই কাজটিই করেছেন। এটি তিনি জেনেই করুণ বা না জেনেই করুণ। তার কাজের কাজ হয়ে গেছে। নিজেকে তৈরী করার করার কাজটি তিনি যথাযথভাবেই করতে পেরেছেন। শব্দ চয়ন, উপমা, উৎপ্রেক্ষা প্রয়োগ, কবিতার আঙ্গিক নির্মাণ সর্বোপরি নিজের ভেতর তিলে তিলে গড়ে তোলা বিশ্বাস-দর্শন কবিতায় চারিয়ে দেওয়ার কাজটি তার আত্মস্থ হয়েছে। তিনি শিখে নিয়েছেন ব্যক্তিগত যন্ত্রণা ও অভাববোধকে কি করে সামাজিক যন্ত্রণায় পরিণত করা যায়। কি করে সমাজ ও ব্যক্তির স্থ্যুল ভাবনা ও আচরণকে বাগদেবীর সূক্ষ্নবীণার তারে ঝঙ্কৃত করে তোলা যায়। প্রথম কাব্যগ্রন্থেই তার ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। তার কবিতা কাব্যের সঙ্গায় নবীন হলেও নতুনের কেতন উড়াবার চেষ্টা আছে নবীনের আনাড়িপনার লক্ষন কম। বরং তার কবিতা পরিপূর্ণতার লক্ষাভিসারি।

২.

সর্বমোট ৫৭টি কবিতা ঠাঁই পেয়েছে ‘দিনান্তে দেখা হলে’ কাব্যগ্রন্থে। কবিতাগুলো গভীরভাবে পড়ে আমার মনে হলো খাতুনে জান্নাত কুপি জ্বালানোর আগে সলতে পাকানোর কাজটি খুব দক্ষতার সাথেই করেছেন। কবিতার কর্ম ও কন্টেন্ট সম্পর্কে তার ধারণা হয়েছে পরিপুষ্ট। নিজস্ব চিন্তা-কল্পনা-অভিজ্ঞতা-বিশ্বাস, দর্শনকে কাব্যরূপ দেয়ার কাজটিতে মুন্সিয়ানা এসেছে। গ্রন্থভূক্ত সকল কবিতাকে এ সনদ দেয়া যায়, এমন কথা বলার দুঃসাহস দেখাবো না। কিন্তু অধিকাংশ কবিতাই যে এমন যোগ্যতা পাওয়ার দাবী রাখে-সেকথা বলাই যায়।

ধরা যাক তার প্রথম কবিতা ‘শাশ্বত শব্দ’। কবি তার উপলব্ধিজাত সত্যটি প্রকাশ করেছেন। খাতুনে জান্নাত জেনে নিয়েছেন কবিতা নির্মাণের জন্য ঋষির মতো পাহাড়ের গুহায় বসে, কিংবা বাল্মিক বসন পরিধান করে জটাজুটধারী অশ্বত্থ বৃক্ষের নীচে ধ্যানে বসতে হয় না। শব্দ খোঁজার জন্য কোন মরুভূমি মরুদ্যান কিঃবা অরণ্যভিসারী হবার দরকার পড়ে না। কবিতায় ব্যবহৃত শব্দাবলী এমনকি উপমা, উৎপ্রেক্ষা হাতের কাছেই মেলে। যেমনটি তিনি বলেন,

‘শাশ্বত শব্দেরা ঘোরে

টেবিলে, ড্রয়ারে তাকে

উত্তপ্ত উনুন আঁচে

বিছানা বালিশে।

চৌচির চৌকাঠ ঘিরে

চায়ের চুমুকে

ডিনারে নালিশে।

তার তৃতীয় কবিতা ‘হয়ত ফিরব’ এ এক ধরনের জীবনানন্দীয় আবেশ রয়েছে। তবু তার এ ফেরার প্রত্যয় সম্পূর্ণ আলাদা। সম্পূর্ণ কবির নিজস্ব। খাতুনে জান্নাত তার আপন কবি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন এ কবিতায়। একবার পড়লেই তার সুক্ষ্ন বিচার হয়ে যায়। তিনি বলেছেন,

হয়ত ফিরব/নীরবে পাতবো প্রাণ ভোরের বিভায়;/ডাহুকের ডাকে/কিংবা বাতাসের ঘ্রাণে/ তুলে দেবো গন্ধরাজের হৃদয়-শরীর।

……হয়ত ফিরবো/পরীক্ষা পাশের আশায় রাতজাগা/কেরোসিন কুপিতে সলতে হয়ে/ডুবেভেসে ফিরেপেতে আগুয়ানি শ্লোক।

এরপর পাতা উল্টিয়ে যেতে যেতে ‘দীর্ঘশ্বাস’ কবিতাটিতে আটকে যায় চোখ। কী অসম্ভব নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত এই কবিতাটি। একবার পড়ে আশ মেটে না। বার বার পড়তে ইচ্ছা করে। যেন কবিতা নয় তুলি আর রেখায় এঁকে দিয়েছেন নিজস্ব বালিকা বেলা। কবি বলেন,

আমার হৃদয়ে গাঁথা গ্রাম/ সুরপাখি বাঁধা প্রাণ/বুনতে নতুন ফসল/মগজে বিনুনি করে/কাস্তে, নিড়ানি আগাছার/নাজুক চারায় দিতে জল/

সাঁঝ-জ্বলা চেরাগ আলোর/তোমার পায়ের কাছে/টেবিলে-বিছানায়/প্রশ্ন-উত্তরে আঁকা ইংরেজি আসর।/ছোট বুকে কেঁপে কেঁপে উঠে একা।

কিংবা তোমার সবুজ সব্জি বাগান/প্রথম সুবাসে সাজা হাস্নার ঝাড়/গাভিকোলে প্রথম বাছুর/ফিরে ফিরে দেখো কিনা গ্রাম ও শহর

হাজার নক্ষত্ররাজি আঁধার জগৎ/কোনখানে! সবখানে?

‘স্মৃতির ওম’ কবিতাটিও পুরোপুরি নস্টালজিক লক্ষণাক্রান্ত। গ্রামের নিসর্গ নিকুঞ্জে রেখে আসা বালিকা বেলা কবিকে বার বার স্মৃতি ভারাতুর করে ফেলছে। কবিতাটির অধিকাংশই উদ্ধৃত করার যোগ্য। কবি বলেন,

গাছের কোটরে আঁটা নরম তুলোর মতো

শিশু পাখিটির ক্ষুধার আকুতি

চকিতে তাড়ায় ফিরায় কিশোরীর চঞ্চল চিবুক।

নিবিড় নম্র সুরে জলপাইয়ের

উষার বাগান জুড়ে সন্তর্পিত বালিকা

অপেক্ষায় থাকে ভোরের আলোর…

কৃষ্ণচূড়া, সোনাইলের আগুনজ্বলা দ্যুতি

পথের দু’পাশে দুলে দুলে ফুলে উঠা

বাটুই ফুলের মুগ্ধ মদিরতা

সোহাগে ভরে তুলে হৃদয়ের জীর্ণ ভুবন।

বর্ষশেষে শীতের উরুতে

রোদছায়া পুকুরপাড়ের মুখর চড়ুইভাতি

এখনো কাঁপন জাগায় গোপন সেঁতারে

হারিয়ে সময়ের পথ

তুলে আনে স্মৃতির তলানী হতে দীপ্ত অশোক।

একই ধারার আরেকটি ছোট কিন্তু অসাধারণ কবিতা ‘কবিতার ঘ্রাণ’ কবিতাটি ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। কাব্য রসিকরা নিজে থেকেই এর রসাস্বাদন করতে পারেন। আমি এখানে পুরো কবিতাটা তুলে ধরছি…

গুড় ও মুড়ির মতো বুকের ওড়নায় বেঁধে কবিতাকে চুরি করে কোন এক বাউল বালিকা। বৈশাখের পড়ন্ত দুপুরে অশ্বত্থ ছায়ায় বাউল বালকের সাথে ভাগাভাগি করে। কবিতার ঘ্রাণে কেঁপে ওঠে বনভূমি। ফুলে ফুলে হিন্দোলিত আদিঅন্ত বাতাস। কুজনে কুঞ্জে গুঞ্জরণে মেতে উঠে নীরব বিকেল।আর বালক বালিকা মত্ত হয়-প্রথম ভ্রূণ সৃষ্টির উন্মাদনায়।

জন্মদাত্রী জননীকে বিষয় করে কবিদের পংক্তি নির্মাণ চিরন্তন। জননীর কাছে যে কোন মানুষের ঋণ অপরিশোধ্য। মা পাখি যেমন খাদ্য কণা কুঁড়িয়ে এনে ছানার চষ্ণুতে তুলে দেয় তেমনি মানব মাতাও আপন শিশুর পরিচর্যা নিয়ে ব্যস্ত থাকে চিরকাল। তাই মাকে নিয়ে শিশুবেলার অনেক স্মৃতি। পরিণত বয়সে এসব স্মৃতি মনে এলে যে কোন মানুষ নস্টালজিক হয়ে উঠতে বাধ্য। খাতুনে জান্নাত তার ‘মা এখন কেমন’ কবিতাটিতে এরকম স্মৃতিগন্ধী পংক্তিমালা গেঁথে দিয়েছেন। পুরো কবিতাটি এখানে উদ্ধৃত করার ভীষণ লোভ হচ্ছে,

এখনো কি/ রোজ ভোরে কলসি ভরে রাখো/ পবিত্র পানির প্রত্যাশায়!/ এখনো কি/ প্রভাতের নরোম বুক মুখর করে অলোকিত বাণীর নহর।/ এখনো কি/ নতুন নতুন পিঠা-পায়েসের মৌতাতে উনুনের চারপাশ ঘিরে রাখে গৃহস্থালী মূর্ছনা।/ রান্নাঘরের শিকা, খাবারের তাকে/ হরেক রকম ব্যঞ্জনা/ পড়শীর জিহ্বে জল নামায়।

স্মৃতি কি অসাধারণ হয়ে ওঠে খাতুনে জান্নাতের এ কবিতায়।‘মা এখন কেমন’ কবিতাটি পড়তে পড়তে কবি শামসুর রাহমানের ‘কখনো আমার মাকে’ কবিতাটির কথা মনে আসে। খাতুনে জান্নাত বলেন, এখনো কি নরম নরম হাতে বিন্যস্ত শীতল পাটি/ নকশী বুননে প্রকৃতি হেসে উঠে ঘরের দেয়ালে।/ ঘরের বারান্দায় রঙিন কাগজ,/ঝুমঝুমির ঢেউ আগন্তুককে চমকে দেয়।/ এখনো কি সন্ধ্যা হলে দিনের পাওয়া না পাওয়া/ হিসাবের কাঁদা হাসা আর বিরামহীন বাকরীতি।/ অথবা এখন নিস্তব্ধ থাকো;/ চোখের ধারায় ঢেউ, ওপার পলক/ সঙ্গীসব হারানোর শোকে, শূষ্ক হৃদয়ে/ অভিযোগ, অনুযোগহীন এককীত্বের/ ভারী বাতাস খেলা করে।

৩.

আগেই বলেছি খাতুনে জান্নাত নিজেকে তৈরী করে তবেই কবিতা লিখতে শুরু করেছেন। বিশুদ্ধতা, উদারতা আর প্রগতিশীলতার আদর্শ আর বিশ্বাস দিয়ে নির্মিত হয়েছে তার মনোজগত।কবিকে বর্তমানে বসে আাগামীর কথা বলতে হয় ভবীষ্যত বক্তার মতো। কহলীল জিবরান যে রকম “দ্য ফ্রফেট’ কবিতায় মানুষকে বলেছিলেন। খাতুনে জান্নাত চান শুদ্ধ মানবিকতার একটি উদার আকাশ। যে আকাশে থাকবে না কোন অশিক্ষা, অজ্ঞানতার অন্ধকার।ধর্মের ভেদ রহিত থাকবে মানুষের মন। কবি বলেন-

সত্যের গূঢ়তা এঁকে হৃদয়ের তাবিজ কবজে

মাটির ঢেলার মতো ভেঙে ভেঙে ধর্মের মূঢ়তা

শস্যের কাঁকর বেছে শুদ্ধতম জীবন হাসুক

আত্মার দাসত্ব হতে মুক্তি হোক, মুক্তি হোক।

‘মুক্তি হোক’ নামক উপরে উদ্ধৃত কবিতাটির

 

দ্বিতীয় স্তবকটি আরও ঋজু ও শাণিত। তিনি বলেন,

বেদনার পরিচ্ছদে ঢাকা নয় নন্দন প্রতিমা

ক্রন্দনের ধ্বনি নয়, কণ্ঠ হোক রণনের সুর

মুষ্টিবদ্ধ কোমল হাতে হাতে মশাল জ্বলুক,

আত্মার দাসত্ব হতে মুক্তি হোক, মুক্তি হোক।

খাতুনে জান্নাত জানেন আজ থেকে শতাধিক বছর আগে এক অবরোধবাসিনী নারী বেগম রোকেয়া বাঙালী মুসলমান নারীদের মনে মুক্তবুদ্ধির সূর্যোদয় ঘটাতে চেয়েছিলেন। জাগাতে চেয়েছিলেন হাজার বছরের নির্যাতনে নিস্পেষণে বিধ্বস্ত নারী জাতিকে। তাঁর আহবানে নারীরা জাগেনি। তবু তার বিবেক থেকে উৎসারিত এ আহ্বান যুগে যুগে বাঙালী নারীকে মুক্ত আলোয় বেরিয়ে আসার পথে অনুপ্রেরণা যোগাবে। সে জন্য বাঙালী নারীদেরকে এগিয়ে আসতে হবে চির অবরোধের দেয়াল ভেঙে। হতে হবে আত্মনির্ভর। শৃঙ্খলের শৃংখলায় বসবাস করতে করতে নারীরা হয়ে পড়ছে নির্জীব, নিস্প্রাণ, অসাড়। খাতুনে জান্নাত তার ‘জাগো ভগ্নী রোকেয়া’ কবিতায় রোকেয়া বন্দনা এভাবেই করেছেন।-

জাগাতে চেয়ে চাবকে দিয়েছো আঘাত

প্রত্যাঘাতে দগ্ধপ্রাণ নিয়ত সংঘাত

হটনী পিছু প্রস্তর বোঝাই নাও

তীরে নয় অভিমুখে

আশায় গিয়েছে ছুটে

নতুন রোকেয়া কোন বেদনা অসুখে

পুড়িয়ে গলিয়ে টলিয়ে দিবে

আসল সংবাদ।

৪.

খাতুনে জান্নাতের ‘দিনান্তে দেখা হলে’ নাম কবিতাটি পড়ার পর কবির কাছে আমাদের প্রত্যাশা বেড়ে যায়। কোন নামী দামী কবিরও গ্রন্থভূক্ত সব কবিতা উত্তীর্ণ হয় না। আবার কোন কোন কবির একটি পংক্তিও পাঠক নন্দিত হয়ে উঠতে পারে। খাতুনে জান্নাতের সকল কবিতা অবশ্যই উত্তীর্ণ নয়। তবু কিছু উজ্জ্বল কবিতা রয়েছে যা এতক্ষণ উদ্ধৃত হয়েছে।

বইটিতে মুদ্রণ প্রমাদ চোখে পড়ার মতো। বানান প্রয়োগের ব্যাপারে কবি আরেকটু সচেতন হলে ভালো করতেন। অবশ্য এ ত্রুটি তার কাব্য শক্তিকে খর্ব করে না।ম্যাচুরিটির কোন শেষ সীমানা নেই। লিখতে লিখতে কবিতায় আরো পূর্ণতা আসবে। খাতুনে জান্নাত তার সমকালে বিশিষ্ট হয়ে উঠতে পারবেন।- এ আমার বিশ্বাস। আমরা তার পরবর্তী কাব্যগ্রন্থের প্রত্যাশায় রইলাম।

…………………………………………………………………………………..

ম্যানচেস্টার, ইউ কে ২০০৯

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.