ইদানীং আপনি কেমন আছেন?
আচম্বিতে প্রশ্নের সম্মুখীন মর্মরমূর্তি আগুন্তক
খবরের কাগজ না সরিয়ে বারেক আড়মোড়া ভেঙে বললেন, “ধন্যবাদ।ভাল আছি বলি মুখে কিন্তু আদৌ ভাল নেই।”
অন্যমনস্ক উত্তর।ধ্যানাসন ভঙ্গি ।
একটি পাঁচতারা হোটেলের মুগ্ধ মনোরম পরিবেশ, টেবিলের অ্যাসট্রেতে তাঁর আধখাওয়া প্রিয় ট্রিপল ফাইভ ব্রান্ডের জলন্ত সিগারেট, পাশে ধূমায়িত বর্তমানে বরফ শীতল গ্রীনচায়ের কয়েক পেয়ালা ।
কোনদিকে মন নেই তাঁর; সকল মনোযোগ
দৈনিকের প্রথম পাতার এক প্রতিবেদন,যার শিরোনাম “সচ্ছল সমাজের জন্য হোক সোচ্চার পৃথিবীর তাবৎ পত্রিকার হেডলাইন।”
ঝুলিতে ক্যামেরা,কাগজ কলম হাতে, অপরপাশে দাঁড়িয়ে আছি অনেকক্ষণ, ইন্টারভিউ নেব তাঁর ।
অনুমতি বা সময় নির্ধারণ নেই, ভেবেছি মূর্তি নড়েচড়ে উঠলে শুরু করবো প্রশ্নোত্তর।
সুনামির ঢেউ মাথায় আছড়ে পড়লেও আপাতত অন্য কোথাও ভ্রুক্ষেপ নেই, এমনই ধ্যানমগ্ন সে বরাবর ।
অখণ্ড নিস্তব্ধ নিরবতা,অপেক্ষায় অনন্তকাল
সময় চলে যায় টিকটিক দ্রুত অতি ।
ধৈর্যের অলস বাঁধ গেল ভেঙে ।
হেডিং দেখিয়ে বললাম, “অবশ্যই তাৎপর্যবাহী কি বলেন? বসতে পারি———–?”
ধ্যান ভাঙলেন আগুন্তক ।
ভাবনা ব্যাহত হওয়ায়
ভালে অসম্ভব বিরক্তির রেখা।
:”আশ্চর্য।বসেই তো পড়েছেন আবার অনুমতি কি? ”
একটু থেমে গমগমে গলায় বললেন দ্বিতীয়বার
:”কি চাই বলুন দেখি?”
:”আপনার সঙ্গে বিশেষ গুটিকয় বাক্যালাপ মানে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর যদি দেন আমায়——-”
:”কি করা হয়?”তেমনই নির্লিপ্ত তিনি হেলায়।
:”একটু আধটু লিখি আর কি।”
:”তা বেশ।কাঁধে ব্যাগ,এলোমেলো কেশ,পোশাক ও ভাবখানা সাদা-সিধা,হবেন লেখক কিংবা কবি -সাহিত্যিক,ওরা ধোপার গাঁধা,তেমন হলে কথা বলুন, সাংবাদিক হলে নয়।”
আগুন্তক না তাকিয়ে আমার বর্ণনা দিলেন গড়গড়, মেধাবী সুনিশ্চিত ।
:”ওদের দোষ?”
:”ওই শালারা বেজায় বজ্জাত, মানীলোকের মান রাখেনা।নাড়ি-নক্ষত্র ছাপায় সব।
:”জ্বী,হক কথার এককথা।”
চোখ দুটি তৎক্ষণাৎ আমার ওপর
অবজ্ঞার কুঁচকানো নাসিকা,উত্তোলিত ভ্রুকুটি ,চাইলো একটু ।
তাঁকে দেখে মহাভাগ্যবান হলাম মুহূর্তমাত্র।
সিঁদুররাঙা জ্বলন্ত আগুনের টগবগে মুখ
চওড়া কালো ফ্রেম,ফুল পাওয়ার চশমার ফাঁকে গনগনে দৃষ্টি, গিলছে যেন সদা,
কাঁচা পাকা মেশানো মোটাগুম্ফে শ্বেতবিন্দু
সাদা খাদির পান্জাবী ভিজে উঠেছে ঘামে,
আকর্ষণ আছে চেহারায়।
দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা এবং সুবিধা ধরে রাখা
লৌহমুখোশের অন্তরালে ভয়ঙ্কর এক মানুষ,
বর্তমানে মসনদচ্যুত হলে হবে কি;
এখনও সমানে দাপটে রাজনৈতিক নেতা।
তিনি শুধোলেন, “আগের থেকে বলা-কওয়া আছে কোনো?”
:”জ্বী-না । আপনার নাগাল পাওয়া দুষ্কর।লম্বা হাত থাকতে হয়।”
:”অপেক্ষা করতে হবে।”
:”আপনার মহানুভবতা।আমি রাজি।ইতোমধ্যে পার করেছি সোয়া তিনঘন্টা।
জলদগম্ভীর গলা চটজলদি বললেন,
:”তবে মাত্র দুইটি প্রশ্ন করুন।”
:”তথাস্ত।আমার ওতেই চলবে।”
কাগজ কলম নিয়ে তৈরি হই ঝটপট।
:”মুক্ত সমাজ কি করে সম্ভব?”
:”বিশ্বের সবকটি সাংবাদিককে ধরে নিয়ে গিয়ে একত্রে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করানো।”
কোনো ভাবাভাবি নেই,নেতা স্বাভাবিক দিলেন উত্তর।
:”আর আজকের পত্রিকায় রাজীবের লেখা প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়া? ”
:”অসচ্ছল যাঁরা, তাদেরকে বেঁধে বিষাক্ত গ্যাসে নিক্ষেপ করা।”
:”চমৎকার,প্রশংসনীয়।বহুত ধন্যবাদ।”
:”আপনার জবাব পেয়েছেন।এখনও বসে রইলেন যে,নির্লজ্জ বেহায়া নন তো?”
:”তা বলতে পারেন।আমি এমনই ।দুঃখিত,কথা রাখতে পারছি না ।”
:”হোয়াট। আবার কি চাই?”
:”চাই আপনার একখানা ফটো।”
:”মহাশয়ের নাম-ধাম-পরিচয়? ”
:”আহামরি গোছের কিছু না ।একটি ছোট্ট দৈনিকের সামান্য রিপোর্টার।নাম —–রাজীব আহমদ ।”
শার্কের ন্যায় গালে হা হলেন নেতা, পুরাতন শিলার পাথুরে মূর্তির ভাঙাচোরা মুখ, নিষ্প্রাণ
শম্বুক চোখ, চেয়ে থাকলো এইবার জনম জনম।
সত্যিকার ধ্যানেই বুঝি,
অবাক কান্ড, নড়েচড়ে না।
হার্ট অ্যাটাক হলো না কি; ধরেই দেখি;
ধরবো কি?
ভয়ের চেয়ে ভাবনা এখন, থানা পুলিশ আরো কত না জানি কি?
ধ্যান ভেঙে গমগমে কন্ঠের তেজীমূর্তি হঠাৎ ভেউভেউ,শুরু করেছে কান্না
অজস্র জলরাশির নদী তৈরি হবে বুঝি পদ্মা,মেঘনা,যমুনা ।থমকালাম ,একি বিভ্রাট।নেতার হাত জাপটে ধরেছে আমায়।
ফিসফিসিয়ে বললেন :”ভাই আবার লিখবেন না প্লিজ ।
কি বলতে কি বলেছি।মনে বড় দুঃখ, বেরসিক জাতি ইজ্জত রাখেনি কোনো। দেখছেন তো নিজে বস্ত্র নেই পরিধানে।”
আক্ষেপ শেষে দ্রুত চোখ মুছলেন ব্যথিত হৃদয়ের নেতা ।
তারপর দৌড়ে গিয়ে নামলেন কোটি মানুষের রাস্তায় ।
আমার দিব্য দৃষ্টে এসে লাগলো,উলঙ্গ এক মানব কাঠামো ।
:”আরে সত্যিই তো,নেতার শরীরে এক টুকরো সুতোও নাই।”

(স্নেহভাজনেষু সাংবাদিক রাজীব আহমদকে )
———-সিফাত হালিম, ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া

