উৎসবমূখর পরিবেশে আমন ধান কাটা মাড়াই শুরু করেছেন কৃষকরা। পাকা ধানের মৌ মৌ ঘ্রাণ। অগ্রহায়ণ মাসে আমন কাটতে শুরু করবে কৃষক। গোলায় উঠাবে সোনার ফসল, এমনই প্রত্যাশায় স্বপ্ন বুনছেন আমন চাষিরা। সভ্যতার গতি যত বেগবান হচ্ছে ততই কমছে আবাদী জমি। কতজন কতরুপে গলাটিপে ধরেছে ফসলী জমির। শাশ্বত বাঙ্গালীর ঐতিহ্যের বর্ণিল স্মারক, গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু, আজ কেবলি ইতিহাস। চুপিচুপি সংগোপনে বিলুপ্তপ্রায়। আবহমান বাংলায়, গৌরবের স্বপ্ন সাধনায় ছিল কেবলি চাষাবাদ। আর সব সাধকের বড় সাধকের নাম ছিল “চাষা”। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অকৃত্রিম স্নেহে, কাঠফাটা রোদে অতুলনীয় পরিশ্রম করে দেশ ও দশের জন্য অন্ন যোগাত বলে রাজদরবারে তাদের স্থান হতো সর্বাগ্রে। আর এখন ‘চাষাভুষা’ বললেই দেখা হয় অবজ্ঞা অবহেলার চোখে! কখনও ভেবে দেখেছেন কি? এরাই যে আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এসব কেটে খাওয়া মানুষগুলো না থাকলে কি অবস্থা হতো আমাদের? আমিও আজ একজন চাষা। সুখ দুঃখের নিরন্তন যাত্রায় তাদের সাথে মিশে হয়ে গেলাম একাকার। আমায় পেয়ে কাজের ফাঁকে গল্প সল্পে, আনন্দ উচ্ছাসে তাঁরা কত অভিজ্ঞতার ঝাঁপী খুললো। কখনও গলা ছেড়ে জারি, সারি, আধূনিক বাংলা, আঞ্চলিক, পল্লী, দেশের গান, মাটির গান ধরলো আমিও গোগ্রাসে তা গিললাম। তবে কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা শুনে সত্যিই ব্যতিত হলাম।” ভাই মন্দা এলাকার লোক বলেই তো আজ ‘কামলা’। আর কামলা বলেই কত গৃহস্থ তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে, একটু জিরোতে গেলেই মন্দ ব্যবহার করে? এমন কি সকালে পান্তাভাতে বাসি তরকারী, দুপুরে আলু -মূলার পাঁচমিশালি, রাতের অবস্থা আরো করুণ। কখনও কখনও থাকার ব্যবস্থা হয় বড়ই নাজুক!! কোন কোন গৃহস্বামী থাকতে দেয় ঝড়া জীর্ণ দেউরী ঘরের স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে, তথায় কেঁচো, তেলাপোকা কিলবিল কিলবিল করে। ভাই আমরাও তো মানুষ,তাই না? তবে ব্যতিক্রমও যে নেই তাই না।স্নেহ-ভালোবাসা, মায়া-মমতা,কৃতজ্ঞতাহীন এই হৃদয়হত্যার কাহিনী আমার কাছে মনে হল সত্যিই বড়ই লজ্জার এবং দূর্ভাগ্যের। একটু যত্ন, একটু ভালোবাসা, একটু সহমর্মিতা, সহৃদয়তার কিঞ্চিত পরশ যদি দেন প্রত্যুত্তরে তারাও আবেগ, আন্তরিকতা, ভালোবাসা, মানবিকতা, কৃতজ্ঞতার মতো মানব হৃদয়ের কোমল সত্তাগুলি আপনার জন্য নির্দ্বিধায় উৎসর্গ করবে। তাদের আত্মত্যাগ, কষ্ট, পরিশ্রমের চিরন্তন লড়াইকে পুঁজি করে এবার জমিতে ফসল নয় স্বপ্ন বুনেছি স্বপ্ন। তাদের অমায়িক ব্যবহার, আত্মবলিদান, কঠোর খাটুনী সত্যিই আমাকে বিমোহিত করেছে। নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে আমার মনে। আমিও সংবেদনশীল, স্পর্শকাতর ও মানবীয় দূর্বলতাকে আশ্রয় প্রশ্রয় না দিয়ে যত্ন আত্তির কমতি না করে তাদের সাথে চাষার খাতায় নাম লিখিয়ে নিয়েছি।বিদায় বেলায় যাও না বলে বলেছি এসো ভাই। আবার দেখা হবে, আগ্রহায়ণে নবান্নের উৎসবে। চলে এসো আমারি আঙ্গিনায়। রইলাম নতুন শস্য আর বর্ণিল জীবনের প্রত্যাশায়।

লেখক: আবু জাফর শিহাব (এল এল বি)

