সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ হোক

‘হ্যালো কে আপনি? আমি মনে হয় বাঁচমু না, আমি মনে হয় মইরাই যামু। আমার চোখের অবস্থা খুব খারাপ, আমি চোখে কিছুই দেখি না; আমি জানি না এখান থেকে কীভাবে রক্ষা পামু? আমাকে আগের বাসায় ১৫ দিন আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে, কিছুই খেতে দেয়নি। গরম তেল দিয়ে আমার হাত পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাকে বাঁচাও।’ কয়েকদিন আগে সৌদি আরবে নির্যাতিত প্রবাসী নারী শ্রমিক সুমি আক্তারের বাঁচার এমন করুণ আকুতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিও ফুটেজে সুমির আকুতি আরও জানিয়ে দেয়, সৌদি আরবে বাংলাদেশের নারী শ্রমিকের ওপর নির্যাতনের মাত্রা কতটা ভয়াবহ। সুমি একা নয়, অসংখ্য সুমি সৌদি আরবে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছে। শুক্রবার(১৫নভেম্বর)সেই সুমী আক্তার সৌদি আরব থেকে অবশেষে দেশে ফিরেছে। একই সঙ্গে ফিরেছে নির্যাতনের শিকার আরও ৯১ নারী গৃহকর্মী। গত মঙ্গলবার (১২ নভেম্বর) জাতীয় সংসদে সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের উপর নির্যাতন বন্ধ করার দাবি তুলে, দেশটিতে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধের দাবি জানিয়েছেন কয়েকজন সংসদ সদস্য । ইতোমধ্যে সাধারণ নাগরিকদের পক্ষ থেকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। এতে সৌদি আরবে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত নতুন কোনো নারী শ্রমিক সেখানে না পাঠানোর দাবি জানানো হয়।

 

‘বলো না কাতর স্বরে, বৃথা জন্ম এ সংসারে, এ জীবন নিশার স্বপন।’ তবুও মানুষ স্বপ্ন দেখে, জনমের ব্যর্থতা ঘুচাতে, জীবনকে সার্থক করতে সুখের আশায় ছুটে দিক থেকে দিগন্তে। ‘…করো না সুখের আশ, পরো না দুঃখের ফাঁস, জীবনের উদ্দেশ্য তা নয়’। সুখের আশা করতে কবি যতই বারণ করুক, তবু মানুষ সর্বদাই সুখের আশা করে। আর সেই সুখের আশা করতে গিয়ে সত্যিই পড়তে হয় দুঃখের ফাঁস। এর জীবন্ত দৃষ্টান্ত সৌদি আরবে বাংলাদেশের নারী শ্রমিক। সংসারে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা, নিরাপদ ভবিষ্যৎ, সন্তানের সুন্দর ও সুখী জীবনের আশা নিয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে পাড়ি জমিয়েছে বাংলাদেশের লক্ষাধিক নারী শ্রমিক। ১৯৭৬ সালে ছয় হাজার ৬৭ জন কর্মী পাঠানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনসংখ্যা রফতানি শুরু হয়। বর্তমানে দুই কোটিরও বেশি বাংলাদেশি মধ্যপ্রাচ্যসহ ১৪০টি দেশে কাজ করছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সূত্রমতে, ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৮৬ লাখ ছয় হাজার ৬৩৩ জন নারী চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন।

তাদের মধ্যে গত চার বছরে বাংলাদেশ থেকে তিন লাখ ৩০ হাজার ৫৯০ জন নারী শ্রমিক গেছেন সৌদি আরবে। যারা কাজ করতে গেছেন তাদের কাছে প্রয়োজনটাই মুখ্য। পরিবারের স্বামী, ছেলেমেয়ে ও আত্মীয়স্বজনের মায়া বুকের মাঝে পাথরচাপা দিয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে নারী শ্রমিকরা দিনরাত কষ্ট করছেন। তাদের প্রতি কেমন আচরণ করছে সে দেশের নিয়োগকারী মালিকরা? কেমন আছেন সেদেশে আমাদের নারী শ্রমিকরা? সম্প্রতি সৌদি আরব ফেরত এক নারী, যিনি গৃহকর্মী হিসেবে দেশটিতে কাজ করতে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘তোকে টাকা দিয়ে কিনে এনেছি, যা খুশি তাই করব, এটা বলেই মারধর শুরু করত মার খেতে খেতে আমি অজ্ঞান হয়ে যেতাম। ওই অবস্থায় যৌন নির্যাতন করত। জ্ঞান ফেরার পরে সেটা আমি বুঝতে পারতাম। প্রায় প্রতি রাতেই চলত এমন নির্যাতন। আমাকে ঠিকমতো খাবার দিত না, বলেন ওই নারী। তিনি বলেন, প্রথম এক বছর দেড় মাস যে বাসায় ছিলাম, তারা বেতন ঠিকমতো দিত না। দেশ থেকে ২০ হাজার টাকা বেতন বলা হলেও সৌদি মালিক তাও দিত না। উপরন্তু আমাকে নিয়ে তাদের আত্মীয়দের বাসায় কাজ করাত। শেষ দিকে আমি যখন প্রতিবাদ করতাম, তখন আমাকে অন্য একটি বাসায় পাঠানো হলো। সেখানেও আমাকে শারীরিক নির্যাতন করত। তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় চার লাখ টাকায় ওরা আমাকে কিনেছে। এ জন্য আমাকে দিয়ে যা খুশি করাতে চাইত ওরা’ বলছিলেন তিনি। ওই নারী বলেন, ‘ওরা আমার বাড়িতে টাকা পাঠিয়েছে বলে আমার কাছ থেকে স্বাক্ষর নিত। আমার কাছে ফোন ছিল না বলে বাড়িতে কথা বলে সত্য-মিথ্যা জানতে পারতাম না। তবে দেশে ফিরে জানতে পারি, তারা মিথ্যা বলেছে।’ সৌদি আরব থেকে ফেরত আসা ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার আরেক এক নারী বলেন, ‘মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হই। মালিক ও তার বড় ছেলে মিলে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করত। খাবার দিত না। বেতন দিত না। বাড়িতে কথা বলার সুযোগও পেতাম না।’ দেশে ফিরে নিপীড়নের রোমহর্ষক বর্ণনা দেয় তারা। ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা নিয়ে ফেরা এসব নারী বলেন, ‘ক্রীতদাসীর মতো আচরণ করা হতো তাদের সঙ্গে। ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের আবেদন, আর কোনো মেয়ে যেন কাজ করতে সৌদি আরব না যায়।’

চলতি বছরের প্রথম ৯ মাস সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন ৮৫০ নারী, যারা যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। ২৬ আগস্ট একদিনেই সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে আসেন আরও ১১১ নারী কর্মী। ফেরত আসা নারী শ্রমিকদের কারও হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কারও পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অনেক নারী স্ত্রীরোগে আক্রান্ত হয়েছেন যৌননিপীড়নের কারণে। ধর্ষণের ফলে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে দেশে ফিরেছেন বেশ কয়েকজন। বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, যেসব নারী শ্রমিক ফিরে এসেছেন তারা বেশিরভাগই যৌন নির্যাতনের শিকার। অনেককেই ঠিকমতো খাবার দেওয়া হয়নি। মারধরও করা হয়েছে। অনেক নারী শ্রমিক জানান, বাসাবাড়িতে কাজ করতে গিয়ে তারা বাড়ির মালিক কর্তৃক যৌন নির্যাতনেরও শিকার হয়েছেন। এ বিষয়ে মালিকের স্ত্রীকে বলেও কোনো ফল হয়নি। বরং তাতে নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা নারীরা জানান, নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেকেই সেফহোমে আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকলেও তাদের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে দেরি করার অভিযোগ আছে। এমনকি তাদের বেতনের টাকাটা পর্যন্ত দেওয়া হয় না। আরও অভিযোগ আছে, তাদের সঙ্গে ক্রীতদাসীর মতো আচরণ করে সৌদি মালিকরা। সৌদি আরবে নারী শ্রমিককে কমপক্ষে দুই বছর থাকার চুক্তি করতে হয়। তার আগে ফেরার নিয়ম নেই। তাই সময়ের আগে ফিরলে মুচলেকা দিয়ে টাকা না নিয়েই ফিরতে হয়। কেবল বাংলাদেশ নয়, সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের নাগরিকদের বিরুদ্ধে গৃহকর্মীদের ওপর যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলংকাসহ কয়েকটি দেশ মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব নির্যাতনের অনেক ভিডিও দেখতে পাওয়া যায়।

ব্র্যাক অভিবাসন বিভাগের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালে এক চুক্তির পর বাংলাদেশ থেকে নারী গৃহকর্মী পাঠানো শুরু হয় সৌদি আরবে। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই নারীদের ফেরত আসা শুরু হয়। এর মধ্যে গত এক বছরে সৌদি থেকে ফিরেছেন ২০ হাজার নারীকর্মী। সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি অনুযায়ী, নারী শ্রমিকরা বিনা খরচে সে দেশে যান। একজন নারী শ্রমিক পাঠিয়ে রিক্রুটিং এজেন্সির আয় হয় দুই হাজার ডলার। সৌদি আরবের সঙ্গে নাকি অলিখিত শর্ত রয়েছে যে, নারী শ্রমিক না পাঠালে পুরুষ শ্রমিকের ভিসা দেওয়া হবে না। এ কারণে নারী শ্রমিক পাঠাতে বাধ্য হয় তারা। মধ্যপ্রাচ্যে যেসব নারীকর্মী যান, তারা মূলত গৃহকর্মীর কাজ করে থাকেন। বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমেও অনেকে মধ্যপ্রাচ্যে যান। নারী শ্রমিকদের বিদেশে নিয়ে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও আছে অনেক এজেন্সির বিরুদ্ধে। দালালদের মাধ্যমেও অনেক নারী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে প্রতারিত ও নির্যাতিত হয়ে ফিরে এসেছেন। নারী শ্রমিকরা সৌদি আরব গিয়ে একদিকে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে দেশে ফিরে কেউ কেউ সংসার হারাচ্ছেন। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের জুলাইয়ে নারী শ্রমিক পাঠানোর শর্ত হিসাবে সৌদি আরবকে পুরুষকর্মী নেওয়ার শর্ত দেয় বাংলাদেশ। সৌদি আরব এ প্রস্তাবে রাজি হয়। নারী শ্রমিকদের সঙ্গে স্বজনদের পাঠানো হলে সে ক্ষেত্রেও নারী শ্রমিকের বিষয়টাই মুখ্য। বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা বাসা-বাড়িতে কাজ করেন। তারা মূলত কর্মস্থলেই যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হন। সে ক্ষেত্রে স্বজনরা সঙ্গে গেলেও কর্মস্থলে নির্যাতন হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় নেই এবং কোনো উন্নতি হবে বলে আশা করা যায় না।

এদিকে সৌদি আরবে নারীকর্মীদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন যখন সবাইকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে, সে সময় সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বললেন‘এখানে নারীদের যতটা নির্যাতনের কথা বলা হয়, বাস্তবে ততটা নয়। তিনি পরিস্থিতি এত ভয়াবহ বলে মানতে নারাজ।বৃহস্পতিবার ১৪ নভেম্বর সচিবালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন সৌদি আরবে কর্মরত ২ লাখ ২০ হাজার নারীর মধ্যে ৫৩ জনের মরদেহ ফিরে এসেছে; যা খুবই নগণ্য বলে মন্তব্য করেছেন ।সৌদি আরব থেকে নির্যাতিত হয়ে ফেরা নারীর সংখ্যা খুব বেশি নয় উল্লেখে করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাত্র ৮ হাজার নারী ফিরে এসেছেন যা খুবই নগন্য। তাদের এসব অসত্য কথা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয় বরং দেশের মানুষের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করে ।কারণ ইতোমধ্যে নির্যাতনের অভিযোগে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলংকাসহ কয়েকটি দেশ সৌদি আরবে শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। সুতরাং এটি শুধু বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের অভিযোগ নয়। অধিকন্তু ভিটেমাটি বিক্রি করে, চড়া সুদে ধার-দেনা করে বিদেশ যান আমাদের হতদরিদ্র শ্রমিকরা। দেশে ফিরলেই দেনা পরিশোধ করতে হবে। পেশায় যতই কষ্ট হোক, কেউ সহজে দেশে ফিরতে চান না। এই নিরীহ শ্রমিকরা অর্থ উপার্জনের জন্য বিদেশ যান। আগে ধার-দেনা পরিশোধ করেন এবং পরে কিছু অর্থ জমা করার চেষ্টা করেন। নইলে দেশে গিয়ে না খেয়ে মরতে হবে। তারা পারতপক্ষে দেশে ফেরত যেতে চান না। তারা দেশে ফিরে গল্প বানাবেন, এমন বিলাসীরা শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যান না। বাংলাদেশের একজন নারী অবলীলায় যৌন নির্যাতনের কথা প্রকাশ্যে বলবেন বা নিজের সতীত্বহরণের কথা অবলীলায় বলবেন এটা কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। তার কথা আমাদের কৃষ্টির সঙ্গেও মেলে না। দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও একজন রাষ্ট্রদূত যিনি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তিনি বাংলাদেশি শ্রমিকদের অভিভাবকও। তার এ ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত দুঃখ্জনক।

সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়ে মেয়েরা নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যাও করেছে। অভিবাসন নিয়ে কাজ করে এমন একটি বেসরকারি সংস্থা বলেছে, সাম্প্রতিক সময়ে নারী শ্রমিকদের মৃতদেহ দেশে আসার সংখ্যাও বেড়েছে। ফেরত আসা নারী শ্রমিকরা ধর্ষণসহ নানাভাবে নির্যাতিত হওয়ার অভিযোগ করছেন। এ বছর সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশী নারী গৃহকর্মির ৪৮ জনের মৃতদেহ দেশে আনা হয়। তাদের মধ্যে ২০ জনই সৌদি আরবে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে আত্মহত্যা করেছেন। ধর্ষণসহ নানা ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে এবছর ৯০০ জনের মতো বাংলাদেশী নারী গৃহকর্মি দেশে ফেরত এসেছে। একটু সচ্ছলতার জন্য আমাদের মেয়েরা বিদেশে যায়। পরিবার-পরিজন ফেলে সেখানে তার আত্মহত্যা করার কথা নয়। সেখানে এমন ভয়ঙ্কর কিছু তাদের সঙ্গে ঘটে, যাতে তারা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। কেউ কেউ মানসিক ভারসাম্য হারিয়েও দেশে ফিরছে। স্বজনরা বলছেন, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন সইতে না পেরেই হয়তো আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন তারা। আবার অনেকের অভিযোগ, নির্যাতন করে মেরে ফেলার পর আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্র্যাকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, ২০১৬ সালে একজন নারী কর্মী আত্মহত্যা করেছিলেন। ২০১৭ সালে তা বেড়ে হয় ১২ জন। ২০১৮ সালে আত্মহত্যা করা নারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩ জনে। ৩৪ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার। এ বছরের প্রথম ৯ মাসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে ১১৮ নারী গৃহকর্মীর মৃতদেহ ফিরেছে। এর মধ্যে ৩৬ জনই আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। আর গত তিন বছরে বিদেশে আত্মহত্যা করেছে ৭২জন।

সেপ্টেম্বর সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো এক প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে কাজ নিয়ে যাওয়া নারীরা নানা নির্যাতনের পাশাপাশি যৌননিপীড়নেরও শিকার হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস বাংলাদেশি অভিবাসী। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে বাংলাদেশের উন্নয়ন ঘটছে। অভিবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি-রফতানি বাণিজ্য চলছে। কিন্তু সভ্য জগতে শ্রমিকের ওপর নির্যাতন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কর্মস্থলে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত না করায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত নিয়ে বিদেশে অনেক সমালোচনা হয়েছে। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, পুরো তৈরি পোশাক খাত ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিল। অবশেষে পোশাক আমাদানিকারকদের চাহিদা মোতাবেক তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিকের কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হয়েছে। আর বাংলাদেশের শ্রমিকরা বিদেশে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হবেন, তা কাম্য নয়। যৌন নির্যাতনসহ নানা উপায়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে অভিবাসী নাগরিকরা বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাবে তা হতে পারে না। অবশ্যই পারিবারিক বা দেশের প্রয়োজনে শ্রমিকরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। কিন্তু যে দেশে কাজ করছেন, তাদেরও স্মরণ করিয়ে দিতে হবে, তাদের প্রয়োজনেই আমাদের শ্রমিকদের সেবা নিচ্ছে। তাই আমাদের শ্রমিকদের জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা তাদের দায়িত্ব।

বর্তমানে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের শ্রমিকরা যে পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন, তা অত্যন্ত উদ্বেগেরে বিষয়। এখন আর চুপ থাকার সময় নেই। সীমা ছাড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে দেশের মানমর্যাদার প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে। সৌদি আরব যত বড় শ্রমবাজারই হোক না কেন, আমাদের নারী শ্রমিকদের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়। একাত্তরে মাতৃভূমির মুক্তির জন্য নারীর জীবন সম্ভ্রম ত্যাগের হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছিল।স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর আজো বাংলাদেশের মানুষ ভালো থাকবে, তাই এখন নারীরা সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতিত! এটা কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আর কত ত্যাগ- অপমান- যন্ত্রণা সহ্য করবেন আমাদের নারীরা? এবার মুক্তি দিন, বন্ধ হোক সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আমাদের নারী শ্রমিকদের পাঠানো ।বন্ধ হোক এবং তা এখনই।

73513567_2483111151974237_128846828446679040_n

লেখক- কাজী সালমা সুলতানা

রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং গণমাধ্যম  কর্মী ।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.