রাজনীতির ঘৃণ্য অধ্যায় জেল হত্যা

আজ ৩ নভেম্বর শোকাবহ জেল হত্যা দিবস। ১৯৭৫ সালে এই দিন  বাংলাদেশের রাজনীতির জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, এএইচএম কামরুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গুলি করে হত্যা করা হয় । এই হত্যাকান্ড ছিল প্রধানত আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করা, আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে চীরতরে ধ্বংস করা। এ হত্যাকান্ডের মাধ্যমে দেশের গোটা রাজনীতি পরিবর্তন করে ফেলার সুগভীর চক্রান্ত শুরু হয়। আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রধান ষড়যন্ত্রকারী হলেও এর সুতা ছিল আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৯৭১ সালে সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে । এ স্বাধীনতার জন্য ৩০ লাখ মানুষের এবং জীবন প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রম হারাতে হয়। যুদ্ধে দেশের সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অবকাঠামো, অর্থনৈতিক অবস্থা, শিল্প, কৃষিসহ সবখাতই ছিল বিধ্বস্ত। এমন একটি দেশ টিকে থাকবে এটিও বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। সর্বত্রই ছিল এক অস্থিরতা । আর এই সুযোগে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে । সেই ষড়যন্ত্রের প্রধান কুশিলব হয় খন্দকার মোশতাক এবং ষড়যন্ত্রের নীলনক্সা অনুযায়ী কর্নেল ফারুক-রশিদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি অংশ । তারাই ১৯৭৫ সলের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তিমুজিব হত্যাকান্ড ছিল না। এ হত্যাকান্ডের পেছনে ছিল রাজনীতি ছিল দেশের সমৃদ্ধির পথ বন্ধ করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নস্যাৎ করা, সর্বপরি মহান মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির পুনর্বাসন। সেই রাজনীতিতে ছিল আরো গভীর চক্রান্ত। সেই চক্রান্তের নির্মম বলি হন জেলখানায় শহীদ জাতীয় চার নেতা। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের তিন মাসেরও কম সময় অর্থাৎ ৭৮দিনের মাথায় জেলখানায় শহীদ হন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এ এইচ এম কামরুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলী।
রাজনীতিকদের জীবনে কারাবরণ অতি সাধারণ বিষয়। তৃতীয় বিশ্বের কোন দেশে জননেতা হয়েছেন কিন্তু কারাবরণ করেননি এমন রাজনৈতিক নেতা খুঁজে পাওয়া খুব দুষ্কর। যারা জনগণের দাবি আদায়ে জনগণকে সাথে নিয়ে আন্দোলন করেন, দল গড়ে তোলেন, দলকে শক্তিশালী করেন, জনগণকে সংগঠিত করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে চান তাদের ভাগ্যে কারাবরণ অবধারিত বিষয়। আবার তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশ যখন সামরিক অভ্যুত্থান, হত্যা, ক্যুর রাজনীতির মহোচ্ছপ চলে, তখনও জননেতাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয় কারাগার। এই অবৈধ ক্ষমতা দখলদাররা যখন জনগণের ক্ষমতাকে বলপ্রয়োগ করে দখল করে নেয়, তখন দেশের কোন স্থানই আর কারো জন্য নিরাপদ থাকে না। কারাগারও হয়ে ওঠে মৃত্যুকূপ। আর এমনি এক বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটেছিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর। যেখানে সকল কয়েদীরা নিরাপদে থাকে সেখানেই জাতীয় নেতাদের মতো সন্মানিত ব্যক্তিদের হত্যা করা হয়েছে । জাতীয় চার নেতার জেল হত্যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক ও ঘৃণ্য অধ্যায় । এই হত্যাকান্ডের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমাদের দেশ ও দেশের রাজনীতি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ক্ষমতা দখলের পর খন্দকার মোশতাক আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে সহযোগিতা চান। কোন কোন নেতা ভয়ে বা স্বেচ্ছায় তাকে সহযোগিতা করতে রাজী হন। আবার অনেক আওয়ামী লীগ নেতা সহযোগিতা করতে রাজী হননি। তারা মোসতাকের হুমকি-ধামকী উপেক্ষা করে নিজের আদর্শের প্রতি অবিচল থাকেন। যেসব নেতা তাকে সহযোগিতা করতে রাজী হননি, তাদের সইতে হয়েছে নির্মম নির্যাতন । ১৯৭৫ সালের ২২ আগস্ট এই চার নেতাসহ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাদের গ্রেফতার করা হয়। তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সেখানে গুলি করে তাদের হত্যার হুমকী দেওয়া হয়। পরে হত্যা না করে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫, রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনের নেতৃত্বে চার-পাঁচজন সেনাসদস্য কারাগারে ঢুকে চার নেতাকে হত্যা করেন। গুলি করে নেতাদের হত্যা করার পর বেয়ানেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাঁদের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। ঘটনার পরদিনই তৎকালীন কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন) আবদুল আউয়াল লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
কাজী সালমা সুলতানা, সাংবাদিক এবং রাজনীতি বিশ্লেষক ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.