গত কয়েকদিন যাবত মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় গেরিলা যোদ্ধা, ক্র্যাক প্লাটুনের অন্যতম সদস্য সাদেক হোসেন খোকার দেশে ফেরার আকুতি এবং সেই সাথে তার মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্টের বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছিল। এরই মধ্যে গত সোমবার সুদূর আমেরিকাতেই মৃত্যুবরণ করলেন সাবেক তিনবারের সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, এবং অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সর্বশেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। ২০১৭ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ায় সাদেক হোসেন খোকা এবং তার স্ত্রীর পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন করা হলেও দুবছরেও সেই কাঙ্খিত সবুজ বইটি আর হাতে পাননি। একদিন মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করে পরিবারকে না জানিয়ে তিনি যুদ্ধে গিয়েছিলেন। ছিনিয়ে এনেছিলেন সবুজ জমিনের পতাকা। পৃথিবীর মানচিত্রে যুক্ত করেছিলেন সবুজে ঘেরা দেশ, বাংলাদেশ। জীবন সায়াহ্নে এসে সেই দেশের নাগরিক হিসেবে সবুজ মলাটের বইটি (পাসপোর্ট) না পেয়ে মৃত্যুর আগে ফিরতে পারলেন না নিজের দেশে। জনাব খোকার বিরুদ্ধে দূর্নীতির মামলায় সাজার রায় হয়েছে ২০১৪ সালে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে স্বপরিবারে আমেরিকা পাড়ি জমানোর পর। তারপর থেকে গত পাঁচ বছর যাবত তিনি সেখানেই অবস্থান করছিলেন। কিন্তু দুর্নীতির মামলা হোক বা সাজা হোক, কোন নাগরিককে তার পাসপোর্ট থেকে বঞ্চিত করা যায় না। রাষ্ট্র এটা বলতে পারে না যে, আমি একজন বাংলাদেশের নাগরিকের পাসপোর্ট দেবো না বা আটকে রাখবে। সেই হিসেবে বৈধ উপায়ে পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন করার পর দু’বছরে তিনি তার পাসপোর্ট ফেরত পাবেন না – এমন কোন আইনি প্রতিবন্ধকতা নেই। জনাব খোকার মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, “পাসপোর্ট নবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কোন হস্তক্ষেপ ছিল না। পাসপোর্ট দেয়া বা নবায়ন করা – এর সাথে রাজনীতির কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। রাজনৈতিক দলেরও এতে কোন দায়িত্ব নেই। যারা এসব অধিদপ্তরের সাথে জড়িত, তারা ভাল ব্যাখ্যা দিতে পারবে। তবে পাসপোর্ট নবায়ন না করাটা দু:খজনক এবং অনৈতিক বলে আমি মনে করি।” মি. হানিফের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার এই অনৈতিক কাজটি করেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম শাহরিয়ার আলম রোববার তার ফেসবুকে এক পোস্টে বলেছেন, “নিউ ইয়র্কে সাদেক হোসেন খোকার পরিবার ‘ট্রাভেল পারমিট’-এর জন্য আবেদন করলে আমাদের মিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তিনি এবং তার স্ত্রীর যেহেতু পাসপোর্ট নেই, সেহেতু আন্তর্জাতিকভাবে অন্য দেশ থেকে নিজের দেশে ফেরার এটিই একমাত্র ব্যবস্থা।” দেশে আসার পর তার বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা হবে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। জনাব খোকার মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও একই কথাই বলেছেন। সে কথায় স্পষ্ট যে, মৃত্যুর পর সরকার তার প্রতি যেকোন ধরনের দয়া দেখাতে প্রস্তুত। যেখানে নিজ দেশের পাসপোর্ট পাওয়া তার নাগরিক অধিকার, সেখানে দয়া’র প্রশ্নটি কোত্থেকে আসে, সে বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। ক’দিন আগে সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এবং সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও বন্ধু ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু তার ফেসবুকে জনাব খোকার সাথে তার কথোপকথনের কয়েকটি লাইন লিখেছিলেন, “দোস্ত চলে যাচ্ছি, ডাক্তার জবাব দিয়ে দিছে। কষ্ট একটা বুকে…..মৃত্যু জয় করে যে দেশ স্বাধীন করলাম, আজ সেই দেশের মাটিতে আমার কবর হবে না?” হয়তো সরকারের ‘দয়ায়’ তার নিথর দেহ (লাশ) দেশে আসবে। দাফন হবে দেশের মাটিতে। কিন্তু রাষ্ট্র তার যে অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, তা কি কোনভাবে ফেরত দিতে পারবে?
রাজনীতিবিদদের পাসপোর্ট বাতিল করা, আটকে রাখা বা নবায়ন না হওয়া নতুন কোন বিষয় নয়। ১৯৭৫ সালের আগস্টে সিরাজুল আলম খান মেয়াদ শেষ হওয়ায় (শেষ হবার আগে) ভিসা নবায়নের জন্য কলকাতায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেন। ১২ আগস্ট তাঁকে জানানো হয়, “তার পাসপোর্ট বাংলাদেশ সরকার বাতিল করে দিয়েছে। তিনি এখন ‘পারসন নন গ্রাটা’ বা অবাঞ্চিত ব্যক্তি।” সিরাজুল আলম খান – কে ছিলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদান কতখানি তা ইতিহাস, রাজনীতি সচেতন মানুষ মাত্রই জানে। যে দেশকে স্বাধীন করার জন্য তিনি তাঁর ল্যামব্রেটা মোটরসাইকেলটি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা শহর, তেজগাঁও, আদমজী চষে বেড়িয়েছেন, সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্রলীগকে সংঘবদ্ধ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের জন্য; সেই দেশই স্বাধীন হবার পর ৪ বছরের মাথায় তাঁকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করেছে। ১৯৭১ সালের মার্চের সেই উত্তাল দিনগুলোতে ৩ রা মার্চ পল্টনের সমাবেশে চারদিকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সাঁজোয়া বহরের ভয় উপেক্ষা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইশতেহার (বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার একমাত্র লিখিত দলিল) পাঠ করেছিলেন ততকালীন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক চার খলিফার একজন শাজাহান সিরাজ। সেই ইশতেহারেই স্বাধীন দেশের পতাকা, জাতীয় সংগীত ঘোষণা করা হয়েছিল। আজ স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর সেই শাজাহান সিরাজ দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে নিরবে নিভৃতে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। হয়তো একদিন যে দেশকে স্বাধীন করবেন বলে মৃত্যুকে জয় করেছিলেন, সেই দেশেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চান বলেই পড়ে আছেন দেশে, একাকী এক কোণে। এখন আর কেউ সিরাজুল আলম খান, শাজাহান সিরাজের খবর নেয় না। চার খলিফার আরেকজন আসম রব এখনো সুস্থ আছেন বলে নিজেই ২রা মার্চ পতাকা দিবস পালন করেন। আফতাব উদ্দিন আহমেদ, চিশতী হেলালুর রহমান, রায়হান ফেরদৌস মধু-দের আজ আর কেউ স্মরণ করে না। কাজী আরেফ আহমেদ হয়েছেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নিষ্ঠুর বলি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এখন আর তাদের প্রয়োজন নেই। ইউভাল নোয়া হারারি’র ‘সেপিয়েন্স: অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অব হিউম্যানকাইন্ড’ বইয়ে তিনি মানুষের বয়ান (স্টোরি) তৈরির ক্ষমতার কথা বলেছেন। হারারি বলেন, বিবর্তনের একটা পর্যায়ে এসে মানুষ বয়ান তৈরি করার ক্ষমতা অর্জন করে। কোনও একজন মানুষ যদি একটা গ্রহণযোগ্য বয়ান তৈরি করতে পারে এবং সে যদি সক্ষম হয় তাহলে আরও অনেক মানুষকে সেই বয়ানের সমর্থনে নিয়ে আসতে পারে। বয়ান বিশ্বাস করিয়ে মানুষকে সংগঠিত করে অসাধারণ সব কাজ করানো যায়। আবার পৃথিবীর যাবতীয় ধ্বংসাত্মক কাজও হয়েছে বয়ান সামনে রেখে। হারারি বলেন, সব রাজনৈতিক ব্যবস্থা (যেমন, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র), বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, এমনকি রাষ্ট্র নিজেই একটা গল্প। আমাদের দেশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক ইতিহাসটা মূলত বয়ানতত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে সুদীর্ঘ সংগ্রাম ও একটি সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এই সুদীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমেই একাত্তরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে বাঙালি জাতিরাষ্ট্র-বাংলাদেশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঠিক ইতিহাস জানার প্রধান অন্তরায় হচ্ছে সুদীর্ঘ সংগ্রামের সময়কে সচেতনভাবে আড়াল করা। আমরা আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামকে মূলত নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। বিষয়টিকে বাংলাদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল এড়িয়ে গিয়েছে সচেতনভাবেই। কেননা ২২ মার্চ ১৯৭১ পর্যন্ত প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন তথা ছয় দফা এবং সত্তরের নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সংসদ গঠনের বিষয়ে শেখ মুজিব এবং ইয়াহিয়ার বৈঠক অব্যাহত ছিল। এমনকি ২৪ মার্চ সন্ধ্যা ছয়টায় আওয়ামী লীগের আলোচক দল ইয়াহিয়ার উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন এবং ওই বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সর্বশেষ প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, দেশের নাম হবে “কনফেডারেশন অব পাকিস্তান”। অন্যদিকে আরেকটি প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছিলেন ২৭ মার্চ ১৯৭১ স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধে যার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। সুতরাং উভয় পক্ষই স্বাধীনতা সংগ্রামকে নয় মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছে। তারা যে যার মত একটা করে বয়ান তৈরি করেছে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ তাদের বয়ানকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে সক্ষম হয়েছে। আর তাই আড়ালে থেকে গেছে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের অনেক বীরের গল্প। ৪৮ বছর পরও আমরা স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি, বিপক্ষ শক্তি নিয়ে বিতর্ক করছি। এত বছরেও অনেক প্রশ্ন অমীমাংসিত। রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হতেই পারে। বাম রাজনীতি থেকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়া সাদেক হোসেন খোকা হয়তো স্বাধীনতার কৃতিত্বের দাবিদার রাজনৈতিক দলে যুক্ত ছিলেন না। রাজনীতির মাঠে লড়াই করেছেন তাদের বিরুদ্ধে। হয়তো তিনি দূর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত; কিন্তু এসবের উপরে তাঁর পরিচয় তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। যে দেশের আইন আদালত তাঁকে দণ্ডিত করেছে, যে দেশের সরকার তার নাগরিক অধিকার হরণ করেছে – জীবন বাজি রেখে যারা এই দেশটি স্বাধীন করেছিলেন, তিনি তাদের একজন। সবুজ জমিনের পতাকাটা তিনি সেদিন জয় করেছিলেন কিন্তু সবুজ মলাটের বইটা তার অধরাই থেকে গেল।
সাকিব আনোয়ার
লেখকঃ রাজনীতিবিদ, কলামিস্ট mnsaqeeb@gmail.com

