পুঁজিবাদে বৈষম্য থাকে , তবে

করপোরেট ওয়ার্ল্ডের চরিত্র বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডে মোটামুটি কাছাকাছি, তবে আমাদের দেশে এটার একটা নিজস্ব স্বকীয়তা ও বহুমাত্রিকতা লক্ষ্য করা যায় । আমরা স্বাধীন হয়েছি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিবাদের চরিত্র নিয়ে । সাম্য , সমাজতন্ত্র, মানবতা আমাদের স্বাধীনতার একটি ভিত্তি অবশ্যই । যদিও আমাদের স্বাধীন হবার পর থেকেই আমাদের সরকারগুলো সেই ভিত্তিক চরিত্র বহন করতে পারেনি। সেটা কেবলমাত্র মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলই নয়, সেটা কোনো দলই এ অব্দি সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেনি।  একারণেই দেশের ভিতরে সর্বক্ষেত্রেই একটা ভারসাম্যহীনতার ছাপ স্পষ্ট । সেটার ছাপ আমাদের মত উঠতি অর্থনৈতিক দেশের পুঁজিবাদেও পরিষ্কার ভর করেছে। এখানে বলা ভালো যে,স্বাধীনতার সাধারণ চিন্তাভাবনাকে পাশ কাঁটিয়ে বা বাধ্য হয়েই  আমাদের দেশ পুরোপুরিই বিশ্ব বাজারের পুঁজিবাদের চর্চায় লিপ্ত। সহজ বাংলায় বলা যায়, আমারা বর্তমানে পুঁজিবাদী সমাজ এবং মহা সত্য হলো যে অদুর ভবিষ্যতেও আমরা  সমাজতান্ত্রিক হতে পারবো না , সুতরাং পুঁজিবাদকেই সহনীয় পর্যায়ে রাখাটাই বর্তমান ও ভবিষ্যতের সরকারগুলোর বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে। 

পৃথিবীর সর্বত্রই পুঁজিবাদী দেশ গুলোতেই অর্থনৈতিক  বৈষম্য থাকে। তবে এটাও সত্য একটি উঠতি অর্থনৈতিক দেশগুলোতে উন্নয়নের শুরুর পর্যায়ে একটা বড় বৈষম্য থাকে, যা আমাদের দেশকে বিশেষায়িত করাটা অতিব সহজ । মহাভারতের মত সত্য যে, স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরে আমাদের দেশ বর্তমানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দেশে পরিণত হচ্ছে এবং সাথে বর্তমানে নানাবিধ মারাত্মক বৈষম্য চলছে। এই বৈষম্যেটি বর্তমানে শুধু অর্থনৈতিক নয় বলেই প্রতীয়মান হয়। এটা অনাকাঙিক্ষতভাবে সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানসিকতার মাঝেও বিরাজমান! এখানেই বর্তমান করপোরেট ওয়ার্ল্ডের চরিত্রের সাথে আমাদেরকে পার্থক্য দাঁড় করিয়ে দেয় । এই চরিত্রটি একটা ভিন্ন মাত্রার চরিত্র, যা সম্ভবত কেবলমাত্র আমাদের দেশেই চর্চিত হচ্ছে  এবং এই অস্বাভাবিক চরিত্রের কারণেই আমাদের দেশে বর্তমানে বেশি সমস্যায় জর্জরিত বলেই প্রতীয়মান হয়। যদি শুধুমাত্র পুঁজিবাদের চরিত্র বহাল থাকতো, তাহলে হয়তো বা সেই পুঁজিবাদী সমস্যা থেকে অনায়াসেই দেশ বেড় হয়ে আসতে পারতো। কিন্তু বর্তমানে দেশে পুঁজিবাদের সাথে যে অস্বাভাবিক উপসর্গগুলো জড়িয়ে আছে, সেটা থেকে বেড় হয়ে আসা ততটা সহজ হবে না বলেই মনে হয়। তবে শুধু আশাবাদী হতে চাই, যুদ্ধে জয়ী স্বাধীন দেশ হাল নিশ্চয়ই ছাড়বে না, সমাধান আসতেই হবে এবং আসবে।

বর্তমানে যে বৈষম্য চলছে, সেটা যদি শুধুমাত্র পুঁজিবাদী চরিত্র বহন করে হতো, যেমন একপেশে ব্যবসা-বানিজ্য, একপেশে আধিপত্যের ঠিকাদারি কিংবা জনমানুষকে ঠকিয়ে নিজেদের অবস্থান ঠিক রাখা, তাহলেও এই সমস্যা সময়ে শুদ্ধ হতো। কিন্তু সমস্যা যে আরো গভীরে ! কেননা আমাদের নিজস্ব অস্বাভাবিক উপসর্গগুলোর মাঝে সব চাইতে ভয়ানক হলো, দেশের টাকা বিদেশে পাচার করা ! জানি, সুইজারল্যান্ডে এমন টাকার পাহাড় আছে। তবে সেই টাকা যত না  পুঁজিবাদের টাকা, তারচেয়েও বেশি লুটেরার টাকা। পুঁজিবাদ আর লুটরাজ একেবারেই ভিন্ন বিষয় । একটার সাথে অন্যটির চারিত্রিক মিল থাকলেও বিশদ পার্থক্য আছে। আমাদের  উঠতি অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে যদি পুঁজিবাদীরা দেশের টাকা পাচার না করে, দেশেই  কাজে লাগাতো, তাহলে কিছুটা হলেও দেশ উপকৃত হতো। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি আমাদের অতি স্বার্থনেষী পুঁজিবাদী মহল সেই দিকে পা মারান নি ( অবশ্য এটা পুঁজিবাদীদের অনেকগুলো চরিত্রের একটি )। এই অতি স্বার্থপরদের কারণেই ভবিষ্যতে দেশ পুঁজিবাদীদের হাত থেকে রক্ষা পেতে বেগ পাবে।

এই অতি স্বার্থপরদের কারণেই আজকে দেশে যেমন বিরাটকায় অর্থনৈতিক বৈষম্য আছে, ঠিক এদের অনাধীক অপচর্চার কারণেই বিরাটকায় সামাজিক বৈষম্য তৈরী  হয়েছে এবং সেখান থেকেই নৈতিকস্থলন স্পষ্ট, সমগ্র জাতির মাঝে। বাঙালির হাজার বছরের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকেও এরা বিষাক্ত ছোবল দিচ্ছে , প্রতিনিয়ত । পুঁজিবাদের অতি আগ্রাসন, সাথে লুটরাজের ফলাফলই মারাত্মকভাবে সামাজিক অবক্ষয় সুস্পষ্ট তার প্রমাণ । হাজারো উদাহরণ আছে। এটা সচ্ছ জলের মত পরিষ্কার যে, এখনই যদি এটা সমষ্টিগতভাবে না থামানো যায় , তাহলে অদূর ভবিষ্যতে এই স্বাধীন দেশকে তার মৌলিক অবস্থানে সহজে ফিরিয়ে আনা যাবে না। চারিদিকের পরিস্থিতি থেকে এটা স্পষ্ট যে, অল্প সময়ে জল অনেক বেশিই গড়িয়ে গেছে। সুতরাং রুখে দিবার এখনই চুড়ান্ত সময় অতিবাহিত হচ্ছে। মনে রাখা ভালো, এই স্বাধীন দেশ একটি আগ্রাসী পুঁজিবাদী, আগ্রাসী অন্যায়-বেবিচার , সর্বোপরি আগ্রাসী বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়েই স্বাধীনতা পেয়েছে। সুতরাং এই জাতিই পারে তার নিজস্ব সঠিক দিকটি খুঁজে পেতে।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার 

সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.