কাশ্মীর সমস্যা এবং বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

“ইয়াসির আরাফাত, লও লও লও সালাম” – ঢাকার রাজপথে এক সময় ৮০ দশকে আমারা নিজেরাও  শ্লোগান দিয়েছি । সেই সময়ের স্লোগান ছিলো ফিলিস্তিনিদের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে, মানবতার উপর আঘাতের বিরুদ্ধে, জলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে । PLO  -প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন। এই অর্গানাইজেশনের পক্ষে,  প্যালেস্টাইনের মুক্তির সংগ্রামের পক্ষে আমাদের দেশের মানুষের সহানুভূতি, আমাদের দেশের ছাত্র-জনতা থেকে শুরু করে সকলেরই একটা মহানুভবতা প্রকাশ পায় । সবারই জানা প্যালেস্তাইনের সমস্যাটি দীর্ঘদিনে, ইহুদি আর মুসলিমদের সাথে । মনে পরে সেই সময়ে রাজপথে ইয়াসির আরাফাতের নামে শ্লোগান  দিয়ে, প্যালেস্টাইনদের পক্ষে শ্লোগান  দিয়ে, তাদের প্রতি আমাদের মত প্রকাশ করেছি বটে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সেই মত প্রকাশের পক্ষে ধর্ম সামনে আসেনি। মুসলমান বা মুসলিম এই জাতীয় কথা সামনে আসেনি। এমনকি অনেক বড় বড় বিজ্ঞ নেতাদের বক্তৃতায়ও কখনো ধর্ম বা মুসলিম জাতি গোষ্ঠীর কথা সামনে আসেনি। যা সামনে এসেছে তা ছিলো মানবতা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কথা, মুক্তি সংগ্রামের কথা । কেননা প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের ভিত্তিটাই মুক্তি সংগ্রামের কথা বলে। যদিও প্যালেস্টাইন মুসলিম সমৃদ্ধ দেশ, কিন্তু মানুষের মুক্তিই ছিলো প্রধান বিষয় । যদিও আজ অব্দি তা হয় নি, আদৌ হবে কিনা ? সেটা মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন ।  যতটুকু মনে পরে, জন্ম হওয়ার পরে যখন থেকে একটু আধটু বুঝতে শিখেছি, কিংবা জ্ঞাণ-বুদ্ধি টুকিটাকি হচ্ছে, সেই থেকেই ইয়াসির আরাফাতের নাম শুনে এসেছি। বয়স এখন আমার পঞ্চাশের উপরে , অথচ আজ অব্দি ইসরাইল-প্যালেস্টাইন  সমস্যার সমাধান হয়নি !!! আর কিছু বলার মনে হয় প্রয়োজন নাই । একটি রাজনৈতিক সমস্যা এত বছরেও সমাধান হয় না ! তাহলে বুঝতে হবে বিশ্ব রাজনীতি কি ? প্যালেস্টাইন-ইসরাইল প্রসঙ্গটি আনলাম দুটি কারণে। একটি ধর্মবাদ আর অন্যটি রাজনীতি । এত বছরেও একটি রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হয় না ! এবং কেন হয় না ? এই প্রশ্ন বা প্রসঙ্গ  তোলার উদ্দেশ্যে  কাশ্মীরের প্রসঙ্গ নিয়ে কঠিন কিছু সত্য এবং বাংলাদেশ প্রসঙ্গ বলার অনুভূতি থেকে।

কাশ্মীর নিয়ে বর্তমান বিশ্বে বেশ তোলপাড় চলছে এবং কেন ? সেটা বলার প্রয়োজন নাই। তাই আর ৩৭০ ধারা বা ৩৫ এ নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছি না। কেননা বিশ্ব একয়দিনে ভালোভাবেই জেনে গেছে, ভারত সংবিধানের এই ধারাগুলোর কথা, কেননা এই ধারার খন্ডন করাতেই আজকে নতুন করে কাশ্মীর কনফ্লিক্ট শুরু । আসলেই কি কাশ্মীরের সমস্যা এই ধারা খন্ডন করাতেই শুরু ? তবে হ্যাঁ আজকে যে সমস্যা শুরু হয়েছে তা এখান থেকেই উৎপত্তি । আসুন একটু ইতিহাসের গোড়ার দিকে তাকাই। দীর্ঘ ১৩৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং প্রায় ৩০-৪০ কিলোমিটার প্রস্থের মোট ২২২,০০০ কিলোমিটার ভারতিয় অংশটি জন্মু, কাশ্মীর ও লাখাদ বিভাগে বিভক্ত এবং মোট ২২ টি জেলা। ভারতীয় কাশ্মীরের বৃহত্তম বিভাগ এই  লাখাদ  । পাকিস্তানের গিলগিট     বেলুচিস্তান  অঞ্চল এবং আধা-স্বায়ত্তশাসিত পাকিস্তানি আজাদ  কাশ্মীরের মোট ৮০,০০০ হাজার কিলোমিটার  এবং প্রায় ৫ মিলিয়ন বাসিন্দা রয়েছে। ৩৭,০০০ কিলোমিটার রয়েছে চীনা আকসাই অঞ্চলে , যেখানে কয়েক হাজার বাসিন্দাদের বসবাস।

১৫৮৭ সালে কাশ্মীরকে দিল্লির বাদশাহ আকবর  প্রথম মুঘলদের অন্তর্ভুক্ত করে। পরবর্তীতে ১৭৯৯ সালে নাদের শাহ কাশ্মীরকে ফের দখল  বা জয় করে প্রায় ১৮০৯ সাল পর্যন্ত এই কাশ্মীর ছিলো কাবুল রাজ্যের  একটি অঙ্গ প্রদেশ। সেই সময়ে রাজপাল মুহাম্মদ আজিম খান সেই সময়ে স্বাধীন ঘোষণা করেছিলেন । তারও আরো পরে ১৮১৯ সালে শিখ মহারাজা রঞ্জিত সিং রাজধানীর শ্রীনগর সহ দেশের বিশাল অংশ দখল করে নেয়।  ১৮৪৬ সালে প্রথম শিখ যুদ্ধে কাশ্মীর ও জম্মুতে রাজপাল হিসেবে একজন ব্রিটিশ দায়িত্ব নেন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারতকে ভাগ করার সময় কাশ্মীরের মত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের অবস্থান কি হবে ? তা না বলে দেওয়ার কারণেই কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়, যা আজ অব্দি বর্তমান । একদিকে মুসলিম সংখাগরিষ্ঠ ভারতিয় রাজ্যেটির অস্তিত্ব এই উপমহাদেশের সব মুসলমান পাকিস্তানে থাকবে, ধারণাটি সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে ভারত তার একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যেকে হারালে ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র হিসেবে এর মূল পরিচয় ক্ষুণ্ণ হবে এবং সাথে অবশিষ্ট প্রায় ১৮ কোটি মুসলমানকে অরক্ষিত করবে। এই ইতিহাস বলার কারণ, আমরা ব্রিটিশদের গালাগালি করি বটে এবং ঠিকও আছে, তবে ব্রিটিশরা যা করে দিয়েছে বা শিখিয়ে গেছে, তার বাইরে আজ অব্দি নিজস্বতায় তেমন কিছুই করতে পারিনি। তার জলজ্যান্ত প্রমাণ এই কাশ্মীর। ব্রিটিশরা করে দিয়ে যায় নি, বেশ সমস্যা এখনও জীবন্ত , চলছে এবং আগামীতেও চলবে বলেই মনে হয়। অবশ্য ব্রিটিশ শাসন নিয়ে পজিটিভ/নেগেটিভ অনেক বলার থাকে বলে এখানে ক্ষান্ত দিলাম।

গত কয়েকদিন পূর্বেই মার্কিল মূল্লুকের প্রেসিডেনট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারত ও পাকিস্তানে মধ্যে এই কাশ্মীরের সমস্যা সমাধানের জন্য মধ্যস্থতা করার কথা নিজ থেকেই বলেছিলেন।  বেশ দুদিন যেতে না যেতেই ভারত সরকার কাশ্মীরের নতুন সমস্যার জন্ম দিলো। অন্যদিকে পত্রিকায় এসেছে মার্কিন মূল্লুকের ডোনাল্ড ট্রাম্প পূর্বেই সব জানতেন বা ভারত মার্কিন মূল্লুককে পূর্বেই জানিয়েছে। ! বলাই বাহুল্য পাকিস্তান ( পত্রিকায় এসেছে) এখন অর্থনৈতিকভাবে ভীষণ চাপে আছে। ধারণা করা যায় ভারত সেই সুযোগটাই ভালোভাবে গ্রহণ করেছে ( ব্যক্তিগত মত), কেননা অন্তত পাকিস্তান তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক দুরবস্থায় এই কাশ্মীর ইসুতে তেমন কিছুই করতে পারবে না বা তেমন স্ট্যান্ড নিতে পারবে না। তার নমুনা পাকিস্তানে দেখাও যাচ্ছে। যেখানে ভারত পাকিস্তানে কোনো ঘটনায় চুন থেকে পান খসলেই পাকিস্তান যুদ্ধের ডামাডোল বাজাতে বেশ পছন্দ করে , সেখানে এই কাশ্মীরের মত এত বড় ইসুতে এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেই বেশি ভরসা রাখছে বা রাখতে বাধ্য হচ্ছে। উপায়ই বা কি আছে ? কেননা কাশ্মীরকে রক্ষা করার ক্ষমতা অন্তত বা আপাতত  পাকিস্তানের নাই বললেই চলে । আবার কাশ্মীর পুরোপুরি স্বাধীন হোক সেটাও বলা তাদের জন্য মুশকিল বটে। কেননা সাথে আছে তাদের নিজেদের রাষ্ট্রের ভিতরে কয়েকটি অঙ্গ রাজ্যের স্বাধীনতার প্রশ্ন । মনে পরে , নওয়াজ শরীফ কয়েকবার পাকিস্তানের বিভিন্ন বিক্ষোভের সময় বারবার বাংলাদেশের কথা  স্মরণ   করে দিয়েছিলেন, প্রকারান্তরে তিনি কয়েকটি অঙ্গ রাজ্যের স্বাধীনতার কথাই স্মরণ  করিয়ে দিয়েছিলেন। পাকিস্তানকে ভারত ভালোই বেড়াজালে ফেলেছে বলেই মনে হয়। পাকিস্তান রাজনীতিতে প্রাক ক্রিকেটারদের একটা ভালোই ওজন আছে, এদিকে আবার সাবেক ক্রিকেটাররা রাষ্ট্রের নেতৃত্বে। গতকালই পত্রিকায় দেখলাম, সে রকম একজন প্রাক ক্রিকেটার শহিদ আফ্রিদি বলেছে, তিনি কাশ্মীরকে না ভারত না পাকিস্তানের কাশ্মীর হিসেবে দেখতে চান !! কথাটির মাজেজা কি হতে পারে ? পাকিস্তানের এতবড়      প্রমিনেন্ট মানুষ নিশ্চয়ই না বুঝে কথাটি বলেন নি । আর উনার মত মানুষ এই কথা বলে সহজে পাড় পেয়ে যাবেন পাকিস্তানীদের নিকট, ভাববার বিষয় । ধারণা করি এটা আফ্রিদির নিজের কথা না । উনার মুখ দিয়ে বলিয়ে রাষ্ট্র একটা ইশারাই দিতে চাচ্ছেন । তবে সেই ঈশারা ভারত তো পুছবেই না বরং দুর্বলতা বড় সুযোগ নিবে বলেই মনে করি। তবে পাকিস্তানীদের  দুর্বলতা একেবারেই প্রকাশ্যে বলেই মনে হচ্ছে। আর আন্তর্জাতিক রাজনীতি বলে তো একটা কথা আছেই । ইতিমধ্যেই কাশ্মীর ইসুতে পাকিস্তানের পাশে থাকার চীন তার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। অন্যদিকে রাশিয়াও বসে নেই , তার সমর্থনও ভারতকে দিয়ে দিয়েছে। এই আন্তর্জাতিক রাজনীতির মুরুব্বি জাতিসংঘ কয়েকদিন পরে হলেও এগিয়ে এসেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তুনিও গুতারেস কাশ্মীর ইসুতে দুই পক্ষকেই ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। গুতারেসের  ভাষ্য হলো, সিমলা চুক্তি অনুযায়ীই এই সমস্যার সমাধান হতে হবে দিপাক্ষিক  আলোচনার ভিত্তিতেই। যা কিনা জাতিসংঘের রেজ্যুলেশন নম্বর  ৩৯ মোতাবেকই হতে হবে। এতো কেবল আন্তর্জাতিক মারপ্যাঁচ, তবে কাশ্মীরে যে নির্যাতন শুরু হয়ে গেছে, সেটাই বিশ্ব অবাক হয়ে দেখছে, দেখছে বাংলাদেশও। 

আসলে কাশ্মীর নিয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আনতেই এত বলা বা কেউ বলতে পারেন অপ্রসাঙ্গিক । আগে দেখে নেই বাংলাদেশকে কাশ্মীর নিয়ে কি বলা বা করা উচিত । সেই কথায় আসতে হলে আগে একটু বাংলাদেশের সংবিধান দেখে নেওয়া ভালো । কেননা গণতান্ত্রিক দেশ বাংলাদেশ, এখানে যাই হোক তা নিশ্চয়ই সংবিধান অনুযায়ীই হতে হবে। বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ (১) (গ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে , ” সাম্রাজ্যেবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ বা বর্ণবৈষম্যেবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করিবেন “। আর যারা বাংলাদেশের জনগনের এই সাংবিধানিক দায়িত্বকে অস্বীকার করবে, কিংবা নাগরিকের এই সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে বাধা দিবে, কিংবা ভয়-ভীতি বা হুমকি প্রদর্শন করবে, তারা প্রত্যেকেই সংবিধানের বিধান মতে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইবে। যাহার শাস্তি মৃত্যুদন্ড হইবে। 

সংবিধানের আরো একটু গভীরে গিয়ে দেখলে, ” বাংলাদেশ সংবিধানের  ৭ ক (১) (খ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘ এই সংবিধান বা ইহার কোনো বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস  বা প্রত্যয় পরাহত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে – তাহার এই কার্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা হইবে এবং ঐ  ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইবে।’। ( উল্লেখ্য যে এই ধারাটি এই সরকারের আমলেই সংযুক্ত হয়েছে, কেন সেটা নিশ্চয়ই সবার জানা )। এত গেলো কেবলমাত্র সংবিধানের কথা ।

এবার বলি বাংলাদেশ ও কাশ্মীরির মাঝে কিছু উল্লেখ যোগ্য বিষয়, যা না বললে অনেক কিছুই অসমাপ্ত রয়ে যাবে। উপরেই অল্প করে কাশ্মীরের ইতিহাস বলেছি,  ৪৭ এ দেশ বিভক্তির সময়েই কাশ্মীরের বিভক্ত হয়েছিলো। তবে উল্লেখ্য যে ব্রিটিশদের করা ভাগাভাগিতে, সাথে নিজেদের জ্ঞাণে যেমন ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করার পরে পূর্ব ও পশ্চিম মিলে পাকিস্তান , যেখানে হাজারো সমস্যা নিয়ে একটি দেশ তৈরি  হয়, ঠিক তেমনি কাশ্মীরও একইভাবে ভৌগলিক ও ধর্মের প্যাঁচে জড়িয়েই কাশ্মীর । কনফ্লিকট দুই দেশের জন্যেই ছিলো, তবে আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করতে পেরেছি, এখন প্রশ্ন কাশ্মীরেরা কি করতে পারে বা পানি কোন দিকে গড়ায়। লক্ষণীয়  যে আমাদের যেমন মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন , কাশ্মীরিদেরও ছিলেন শেখ মুহাম্মদ আব্দুল্লা । তবে পার্থক্যেটিই এখানে শেখ মুজিব এই পূর্বের কৃষক/শ্রমিক/মেহনতি মানুষদের সাথে নিয়ে একটি স্বাধীন দেশ দিতে পেরেছিলেন। যার ফলে আমরা আজকে একটি যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশ। অন্যদিকে কাশ্মীর আজ অব্দি সেই একই জঞ্জালে ভুগচ্ছে। যেহেতু আমরা নিজেরা মুক্তিযুদ্ধের  মধ্যে দিয়েই স্বাধীন হয়েছি, যেহেতু আমাদের স্বাধীন দেশের সংবিধান স্পষ্ট করে বলেছে, নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থনের কথা, সেই সূত্রে এই দেশকে অবশ্যই কাশ্মীরের মুক্তি সংগ্রাম কে সমর্থন করাটাই স্বাভাবিক, প্রাসঙ্গিক ও উচিত। 

এই প্রাসঙ্গিকতা বা উচিতকে সামনে না এনে দেশে কিছু জনমানুষ একটু ভিন্ন আঙ্গিকেই যেন কাশ্মীরের পক্ষে আওয়াজ তুলছে, একটু পরিষ্কার করেই বলা প্রয়োজন । লক্ষণীয় যে একদল মানুষ কাশ্মীরের মুক্তি সংগ্রাম কে ধর্মবাদ , জাতীয়তাবাদকে গুলিয়ে ফেলে কাশ্মীরের কনফ্লিক্টকে ধর্মের কনফ্লিক্ট মনে করে আওয়াজ তুলছে! তাদের স্পষ্ট ভাষ্য কাশ্মীরে মুসলমানদের কে হত্যা করা হচ্ছে ! এটা করতে গিয়ে তারা যে প্রকারান্তরে কাশ্মীরের মুক্তি সংগ্রামকে ছোটো করে ফেলছে, সে দিকে কারো নজর নেই। দেশে এই বিশেষগোষ্ঠি অবশ্য সব কিছুতেই ধর্ম টেনে আনতে ভালোবাসে , কেননা এতে তাদের সুবিধেটা একটু বেশি ( এটা আবার ভিন্ন আলোচনা) । যেহেতু ধর্মের টানে তাদের আত্মা টানে, তাই কিছু কঠিন সত্য না বললেই নয় । শুধু তাদের জন্যেই বলছি। লক্ষণীয় যে , মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই বলে যারা আকাশ বাতাস কম্পিত করছে, অথচ এদের একবারের জন্যও স্মরণ  হয় না, ৭১ এ যখন রাতের আধারে ঘুমন্ত বাঙালির উপরে পাকিরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে  দলে দলে মানুষ হত্যা করলো! তখন বিশ্বে কি মুসলমান রাষ্ট্রের অভাব ছিলো ? সেই সময়ে কোন মুসলিম রাষ্ট্র মুসলমান হত্যার প্রতিবাদে আকাশে-বাতাস কম্পিত করেছিলো ?  তাদের কে বলবো উত্তর খুঁজে দেখবার জন্য, উত্তর হবে না । এমনকি সেই সময়ে কাশ্মীরিরাও এতসব  মুসলমান হওয়ার পরেও আমাদের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলো । যদিও ইতিহাস বলে তাদের সাথে আমাদের প্রায় সব কিছুর একটা সাদৃশ্য ছিলো। এমন কোনো মুসলিম রাষ্ট্র সেদিন আমাদের পক্ষ নিয়ে  বা এই জঘন্য হত্যাকান্ডের পক্ষ নিয়ে একটি বাক্যে জাতিসংঘের কাছে তুলেছিলো ? উত্তর হবে না । প্রতিবাদ তো দূরের কথা । এই দেশ স্বাধীন হবার পরেও মুসলমানদের পবিত্র, অন্তরে আকাঙ্ক্ষার, কাঙিক্ষত আরব দেশের একটি দেশও কি আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছিলো ? উত্তর হবে না । তার চেয়েও বড় বিষয়, বিশ্বে কি এখন অন্যপ্রান্তে বর্তমানেও কোনো মুসলমান নিধন  হচ্ছে না ? সেই ইয়েমেনি বা কুর্দিদের জন্য মুসলমান ভাইদের কোনো মায়া কান্না নাই কেন ? তাহলে তারা কি মুসলমান না ? এখানেই ক্ষমতার রাজনীতি, বৈশ্বিক রাজনীতি, সাথে ধর্মের রাজনীতি!! এইতো কিছুদিন পূর্বেই পত্রিকায় দেখছিলাম ( ইউরোপের পত্রিকা)  সিরিয়াতে আইএসের জন্য দিনে ১০০ ট্রাক সামরিক রসদ যেতে ! এই সবের মূল্য কে বা কোন দেশ পরিশোধ করেছে ? এটা কে না জানে ! আরবের শেখেরা হাজার কোটি টাকা দিয়ে  একদিকে মুসলমান মেরে ছাফা করে ফেলছে, অথচ সেই দিকে মুসলমান ভাইদের নজর দিতে মানা ! জিহাদ করা ! প্রশ্নই উঠানো যাবে না । কেননা শেখদের চটালে যে নিজেদের স্বার্থটা  ছোটো হয়ে আসবে। আরবের ধনে এত হুমকি ধামকি, আর মোটা হয়ে , সেই প্রভুদের সাথে কিভাবে দ্বিচারিতা করা যায়  ? কেননা এরাই যে বিশ্বে সেই সকল মুসলমানদের সাথে ধনের বিনিময়ে ধর্মের আপন ভাই। সুতরাং আরবরা যেদিকে , তথাকথিত মুসলমানদের কেবলাও সেই দিকে। তাই কাশ্মীর নিয়ে ধর্মকেই তাদের সামনে আনা ! 

মূলত কাশ্মীরের বিষয়টি সত্যি বলতে ধর্মের বিষয় মোটেও না । বিষয়টি স্পষ্ট, বর্তমানে ভারতের উগ্রবাদী শাসকের রাজনৈতিক অভিলাষ । সেই রাজনৈতিক অভিলাষ থেকেই সংখ্যালঘু মানুষের উপর, আমাদের সেই ৭১ এর মত পৈশাচিক, সীমাহীন নির্যাতন । সত্যিকারের ধর্ম তো মানবিকতা, সহনশীলতা ও মূল্যবোধ ।  আর যদি তাই হয় , তাহলে তো আমাদের দেশে কেবল টুমি মাথায় দিয়ে মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই বলে তাদের একা রাজপথে থাকার কথা না । তাহলে এই উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে কেন হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো প্রতিবাদ, প্রতিক্রিয়া বা তীব্র আওয়াজ রাজপথে নেই ? নাকি সেখানে আবার সেই ধর্মের  গোড়াত্ববাদ এসে হানা দেয় ? আরবরা করলে যেমন  মুসলমানদের ( তথাকথিত!) কাছে সাতখুন মাপ, ঠিক তেমনি ভারত করলেও হিন্দুদের ( তথাকথিত!) কাছে ঠাকুর হয়ে আসে । তথাকথিত আরাবা বা তথাকথিত ঠাকুর নয় , মানবতা, মনুষ্যত্ব,মানবিকতাই বড়। কাশ্মীরে অত্যাচার, অবিচার, অন্যায়, জুলুম, নিষ্ঠুরতা স্বৈরশাসন চলছে, প্রতিবাদ সেটারই হওয়া উচিত।

তাই সর্বশেষে বলবো, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কাশ্মীর আমাদের সাথে কি করেছিলো সেটা না দেখে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সামনে রেখে, কাশ্মীরের মুক্তি সংগ্রামকে সমর্থন করাই হবে ন্যায়সঙ্গত ও সঠিক। ধর্মের খেলা বন্ধ হোক, মানবতার প্রশ্ন আগে আসুক। যদিও বাংলাদেশের সরাসরি কিছুই করার নেই , তবে আমরা যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশ হিসেবে মুক্তি যুদ্ধের চেতনার সাথেই থাকতে চাই এবং থাকবো। পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ ও প্রজ্ঞা বিপদের মাঝেও কাশ্মীরিদের মাঝে বিরাজ করুক ।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার

সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

 

 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.