কাজী সালমা সুলতানা : বাঙালীর সত্তার বিকাশে যারা স্বপ্ন দেখেছিলেন তাদেরই একজন কাজী আরেফ আহমেদ। কোন স্বাপ্নিক মানুষ নয় স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবার এক সফল কারিগর।ষাটের দশক থেকে নিহত হবার আগ পর্যন্ত জাতির প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর সপ্রতিভ উপস্থিতি। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আগে এবং পরে সকল গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল আন্দোলনে তাঁর ভুমিকা সেই সব আন্দোলন সংগ্রামকে বেগবান করে তুলতো গণমানুষের মুক্তির সংগ্রামে উৎসর্গকৃত এই নেতা শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার রাজনীতি করতেন। তিনি শান্ত প্রকৃতির মানুষ ছিলেন কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল অনড় অবিচল। বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক বড় বড় ঘটনার সংগঠক ছিলেন তিনি।
কাজী আরেফ বরাবরই নিভৃতচারী, প্রচার বিমূখ কিন্তু দৃঢ়চেতা। তাঁর রাজনীতি ছিল সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে, নির্লোভ, নির্মোহ, সৎ ও ত্যগী রাজনীতিবিদের প্রতিকৃত । মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির সাথে কখনও আপোষ করেন নাই, অসাম্প্রদায়িকতা ছিল তাঁর ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের অন্যতম গুণাবলী ।
কাজী আরেফ আহমেদের জন্ম ১৯৪২ সালের ৮ই এপ্রিল কুষ্টিয়ার ঝাউদিয়া ইউনিয়নে । নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ১৯৪৮ সালে পিতার সাথে সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। শুরু করেন পুরান ঢাকার কলেজেয়েট স্কুলে লেখাপড়া, মেট্রিক পাশ করেন এখন থেকেই। স্কুল জীবন থেকেই তাঁর মধ্যে বাঙালী জাতীয়তাবোধের চিন্তা চেতনার উন্মেষ ঘটে। ১৯৬০ সাল থেকেই আইয়ুবের সামরিক শাসনামলে শিক্ষা সংকোচন বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি। জগন্নাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও ১৯৬৬ সালে বি এস সি পাশ করেন। অতপরঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল বিষয়ে ভর্তি। হন। রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তদানিন্তন পাকিস্তান সরকারের দৃষ্টির আড়াল করা যায় নি। ফলশ্রুতিতে তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বাতিল করে দেয় পাকিস্তান সরকার।
১৯৬২ সালে ছাত্রলীগের সদস্য হবার মধ্য দিয়ে কাজী আরেফ সক্রিয় ভাবে ছাত্র রাজনীতিতে অংশ গ্রহন করেন । তৎকালিন দেশের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তাঁকে রাজনীতিক হিসাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। ১৯৬২ সালের নভেম্বর মাস থেকে তিনি বাংলার স্বাধীনতা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির তথা বাঙালী জাতীয় রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠণ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সিরাজুল আলম খান ও আব্দুর রাজ্জাক এর সাথে আলোচনা শুরু করেন। পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে তৎকালিন প্রগতিশীল সংগঠন ছাত্রলীগের ছত্রছায়ায় একটি বিপ্লবী ধারা গঠন করে ধাপে ধাপে আন্দোলন এগিয়ে নেবার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। চুড়ান্ত লক্ষ্য ছিলো বাঙালী জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে জনযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করা।
১৯৬৩ সালে ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি হন কাজী আরেফ আহমেদ। তখন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন কে এম ওবায়দুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল আলম খান। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত রাজনীতির একটিই লক্ষ্য ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চাঙ্গা করা এবং একটি সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালীর নিজস্ব জাতীয় রাষ্ট্র নির্মাণের প্রেক্ষাপট তৈরী করা।
১৯৬৪ সালে স্বাধীন পূর্ব বাংলা বাংলা বিপ্লবী পরিষদের (Bangladesh Liberation Front) তিন সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াস গঠিত হয়। নিউক্লিয়াসের তিনজন সদস্য ছিলেন সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ। এই নিউক্লিয়াসই বিপ্লবী পরিষদের সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী ছিল। নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্তে ১৯৬৪ সাল থেকে তিনি তাঁর পৈত্রিক নিবাস ১৪/৩ অভয় দাস লেনের বাড়িতে সাইক্লোষ্টাইল মেশিনে নিজের হাতে জয়বাংলা নামে স্বাধীনতার ইশতেহার ছাপতেন । কর্মীদের নিয়ম ছিল পত্রিকা পরার পর তা পুড়িয়ে ফেলা। উক্ত সাইক্লোষ্টাইল মেশিন টি পরবর্তিতে জনাব আলমগীরের (মিসেস সুলতানা কামালের বড় ভাই) নিকট হস্তান্তর করা হয়। ১৯৬৯ এর পূর্বে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ এর সাথে যোগাযোগ রাখার দয়িত্ব ছিল কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াস সদস্য আব্দুর রাজ্জাকের উপর। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বিপ্লবী পরিষদে কাজ কর্মের অগ্রগতির কথা জানানো হয়। বিপ্লবী পরিষদের সকল কর্মকান্ড শেখ মুজিবের প্রত্যক্ষ্ বা পরোক্ষ্য সমর্থন ছিল । কাজী আরেফের দায়িত্ব ছিল ছাত্রলীগের মধ্যে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের শাখা–প্রশাখা বিস্তৃত করা ।
ধীরে ধীরে ঢাকা সহ দেশের সব কয়টি জেলায় স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের ফোরাম গঠণ করা হয়। এই গোপন সংগঠণটির সুবিন্যস্ত ও সুসংগঠিত হবার কাজটিও এগিয়ে যেতে লাগলো। মোট কথা একটি গোপন সংগঠন এর যেমন সুশঙ্খল কার্যক্রম থাকা দরকার তার সবই বিপ্লবী পরিষদের ছিল। ছাত্রলীগের অনেকেই ফ্রন্ট সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। মূলত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ থেকেই বিপ্লবী পরিষদের সদস্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। কঠোর পরিশ্রম, আদর্শ ভিত্তিক লেখাপড়া ও বিপ্লবী অনুশীলণ দেওয়া হত।১৯৬৬ সালের আগেই অর্থাৎ শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা দেবার আগেই সংগঠনের কার্যক্রম দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। ছাত্রলীগ পরিচালনার জন্য একটি ছায়া ফোরাম গঠন করা হয়, এই ছায়া ফোরাম এর দায়িত্ব ছিল কাজী আরেফ আহমেদ এর উপর, এর সদস্য ছিল মনিরুল ইসলাম , আ স ম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ ,স্বপন কুমার চৌধুরী, ১৯৬৯এ ঐ ফোরাম এ যুক্ত হন শরীফ নুরুল আম্বিয়া, মোস্তাফিজুর রহমান এম পি, মাসুদ আহমেদ রুমি (দৈনিক বাংলা), আ ফ ম মাহবুবুল হক, ১৯৭০ সালে ঐ ফোরাম এ হাসানুল হক ইনুও যুক্ত হন।
নিউক্লিয়াসের সদস্য হওয়ার কারনে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ (Liberation Front) যে সব কাজের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেছিল তার প্রত্যেকটির সাথেই কাজী আরেফ আহমেদ প্রত্যক্ষ ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্তের ফলে যে সব ঐতিহাসিক কাজ সংগঠিত হয়েছিল—-
- পূর্ব পাকিস্তান কে বাংলাদেশ নামকরণ সমর্থন।(যা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর সর্বপ্রথম প্রস্তাব আকারে পেশ করেন ১৯৭০ সালে)
- জাতীয় পতাকা তৈরী (যা আনুষ্ঠানিক ভাবে ২ মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তোলন করেছিলেন আ.স.ম.আব্দুর রব) উল্লেখ্য কাজী আরেফ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক জাতীয় পতাকার অন্যতম রূপকার। তিনি ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানিন্তন ইকবাল হলের ১১৮ নং রুমে বিপ্লবী পরিষদের সদস্যদের সাথে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার নকশা চূড়ান্ত করেছিলেন। নিউক্লিয়াসের সদস্য হিসেবে তিনি উক্ত সভায় পতাকা তৈরীতে নেতৃত্ব দেন।
- ‘জয়বাংলা’ কে জাতীয় শ্লোগান হিসাবে নির্ধারণ করা।
- স্বাধীনতার ইশতেহার তৈরী (যা আনুষ্ঠানিক সভাতে ভাবে পাঠ করেন স্বপণ কুমার চৌধুরী, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক ) বিপ্লবী পরিষদের নির্দেশ মত শাহজাহান সিরাজ ৩ মার্চ ১৯৭১ এ পল্টনের জনসভায় স্বাধীন বাংলা ইশতেহার পাঠ করেন।
- জাতীয় সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের নাম প্রস্তাব (স্বপন কুমার চৌধুরী কর্তৃক )
- শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রদান ( আনুষ্ঠানিক ভাবে তোফায়েল আহমেদ ঘোষণা করেন ) ।
- কর্ণেল এ জি ওসমানিকে সম্ভব্য মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হিসাবে দায়িত্ব দানের জন্য বঙ্গবন্ধুকে সুপারিশ করা।
- গাড়ি সহ বিভিন্ন যানবাহনের নম্বর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দোকানপাটের নামফলক ইংরেজীর পরিবর্তে বাংলায় লেখা ।
- “তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা”, “বীর বাঙালী অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর”, “পিন্ডি না ঢাকা ঢাকা ঢাকা”, “ছয় দফা না এক দফা–এক দফা এক দফা”…. এমন অনেক শ্লোগান তৈরী করে ব্যপক প্রচার করা।
- জাতীয় সংগীত নির্ধারন। উল্লেখ্য জাতীয় সংগীত এর জন্য ২টি গানকে পছন্দ করা হয় আমার সোনার বাংলা ও আমার দেশের মাটি, সিরাজুল আলম খান প্রথম গান “আমার সোনার বাংলা” গানটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসাবে পছন্দ করেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুমোদন লাভ করেন।
- ৬দফা, ১১দফা ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও জনআন্দোলন কে ১ দফায় রূপান্তর করে স্বাধীকার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসা।স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের সভা থেকে এসব সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়।
ছয় দফার প্রতি সমর্থন:
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু লাহোরে বাঙালীর মুক্তি সনদ “ছয় দফা” ঘোষণা করলে বাঙ্গালীর স্বাধিকার বিষয়টা সামনে চলে আসে। বঙ্গবন্ধু যখন ছয় দফা ঘোষণা করেন তখন জাতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। আর এই বিতর্ক কে পাস কাটিয়ে সে সময়ের ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সর্বসন্মতিক্রমে মহানগর সভাপতি কাজী আরেফ আহমেদ সর্বপ্রথম বিবৃতি দিয়ে ছয়দফার প্রতি সমর্থন জানান এবং তার নেতৃত্বে ঢাকার রাজপথে মিছিল বের হয়।
সাংগঠনিক কাজের ব্যয় নির্বাহের জন্য ১৯৬৬ তে তিনি ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন। ১৯৬৮তে অবশ্য পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তা ছেড়ে দেন। সে সময় তিনি আগরতলা মামলা তহবিল সংগ্রহের দায়িত্বে নিয়োজিত কমিটির সাথে কাজ করেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বি এল এফ (Bangladesh liberation front) মুজিব বাহিনী হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। মুজিব বাহিনীর অন্যতম সংগঠক ছিলেন কাজী আরেফ। ভারতের কালসিতে এইটটি লিডার্স এর নেতৃত্ব পর্যায়ে ট্রেনিং গ্রহন করে তিনি পশ্চিমাঞ্চলীয় সেক্টরে মুজিব বাহিনীর ডিপুটি প্রধান হিসাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন ।মুজিব বাহিনীর ৪ আঞ্চলিক প্রধান (শেখ মনি, সিরাজূল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ) এর মধ্যে সমন্বয় সাধনের দায়িত্ব পালন করতেন। ১৯৭১ সালে তিনি বি এল এফ বা মুজিব বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ও ছাত্রলীগের সমন্বয়কের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। বি এল এফ এর দায়িত্বে দেশের অভ্যন্তরে ২০ হাজার ছাত্র যুবক কে ট্রেনিং দেওয়া হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তিনি জনযুদ্ধ হিসাবে আখ্যায়িত করেন। তার ভাষায়–‘নিজের অধিকার আদায়ের জন্য জনগন যে যুদ্ধ করেছে যে যুদ্ধ কোন গোষ্ঠী বা শ্রেনীর স্বার্থে নয় সে যুদ্ধই হলো জনযুদ্ধ‘ ।
স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য কাজী আরেফ আহমেদ সহ কয়েক জন ১৯৬২ সাল থেকে যে কাজ শুরু করেন তা ১৯৭১ তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে জনযুদ্ধে পরিনত হয় এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তব রূপায়ন সম্ভব হয়।
জাসদে কাজী আরেফ আহমেদ :
সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিশ্বাসী কাজী আরেফ মনে করতেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ একটি মানচিত্র বা পতাকা পাবার জন্য ছিল না। জণগণের মুক্তিই ছিল মুখ্য। তিনি শোষনমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখতেন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন দেখতেন। তিনি মনে করতেন পাকিস্তান ধর্মরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরেকটি ধর্ম রাষ্ট্র পাবার জন্য ছিল না। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ৩১শে অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) প্রতিষ্ঠিত হয়। কাজী আরেফ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষে বিপ্লবী গণআন্দোলন সংগঠিত ও পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন। জাতীয় কৃষক লীগের সভাপতির দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন।
কাজী আরেফ সাংবাদিকতাতেও অবদান রেখেছেন।স্বাধীনতা উত্তরকালে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের বলিষ্ঠ মুখপাত্র “দৈনিক গণকন্ঠ” পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর অবৈধ ক্ষমতা দখল সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন। তার নীতি কৌশলের ভিত্তিতেই মতৈক্যের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও জাসদ ১৯৮০ সালে দশ দলীয় ঐক্যে যোগ দেয়। আরেফ আহমেদ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সফল সংগঠক ছিলেন। তিনি জেনারেল এরশাদের অবৈধ ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে নিরলস আন্দোলন সংগ্রামের নেপথ্য নেতৃত্ব দেন। ১৯৮৭ সালের জুনে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তাকে গ্রেফতার করা হয়। নয় মাস কারা ভোগের পর ১৯৮৮ সালের ২৯শে মার্চ তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র গণঅভ্যুথানের নেতৃত্বে ছিলেন কাজী আরেফ।একই সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী চক্র জামায়াতে ইসলামী ও শিবিরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন। এ ছাড়াও পত্রিকায় ধারাবাহিক জামায়াতের বিরুদ্ধে লেখা শুরু করেন।এছাড়াও সাপ্তাহিক তারকালোক,সাপ্তাহিক সুগন্ধা, এখনই সময়,দৈনিক জনকন্ঠ ছাড়াও বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যগাজিনে তিনি ধারাবাহিক ভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন। তার শেষ সাক্ষাতকার তার মৃত্যুর পর ১৯৯৯ সালের সাপ্তাহিক বিচিত্রার ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
১৯৭১য়ের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের লক্ষে ১৯৯১ সালে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সকল শক্তিকে একটা প্লাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে নামেন কাজী আরেফ আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তৃনমূল থেকে সংগঠিত করার করেন ।আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক , শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, অধ্যাপক মান্নান চৌধুরী, হাসান ইমাম , সবার সাথে এ বিষয়ে কথা বলেন। তাদের কাছ থেকে সাড়া পেয়ে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রধানদের সাথে কথা বলেন।এভাবে সকলকে নিয়ে গঠন করেন।১৯৭১ এর ঘাতক দালাল ও নির্মূল কমিটি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের জাতীয় সমন্বয় কমিটিগঠনে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখেন । তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র কমান্ড গঠনেও প্রধান ভূমিকা রাখেন। ১৯৯২ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমের বিচারের দাবীতে গণআদালত মুল উদ্যেক্তা ছিলেন তিনি। ১৯৯৮ সালে ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়ার আম্রকাননে মুজিব নগর দিবস পালনে তিনি উদ্যেগী ভুমিকা পালন করেন।
ঢাকায় সর্বশেষ জনসভা : কাজী আরেফ ১৯৯৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারী মিরপুর এর শিয়ালবাড়ীতে একটি সভার প্রধান অতিথি হয়ে আসেন । মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদদের বধ্যভূমির জায়গা কতিপয় দুস্কৃতকারী দখল করার চেষ্টা চালালে তার প্রতিবাদে এই সভার আয়োজন করা হয়েছিল। বর্তমানে ঢাকার মিরপুরে শহিদ বুদ্ধিজীবি গোরস্থান কবার জন্য তিনি উদ্যেগী ভুামকা রেখেছিলেন।
যেভাবে নিহত হন : ১৯৯৯ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারী কুষ্টিয়ার কালিদাসপুরের স্কুলমাঠে সন্ত্রাস বিরোধী জনসভাতে বক্তব্যরত অবস্থায় সন্ত্রাসীদের হামলায় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। সেদিন আরো নিহত হন কুষ্টিয়া জেলা জাসদ সভাপতি লোকমান হোসেন, সাধারন সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইয়াকুব আলী সহ আরো তিনজন ।
প্রতিক্রিয়া : কাজী আরেফ আহমেদ এর মৃত্যুতে জাতীর অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়। কাজী আরেফ বুঝতে পেরেছিলেন মৌলবাদী ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি এক হয়ে আমাদের অর্জিত স্বাধীনতা নষ্ঠ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। ঐক্যবদ্ধভাবে এই অপশক্তিকে প্রতিরোধ করতে হবে। তাই কাজী আরেফ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি যা ছোট ছোট দলে বিভক্ত তাদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছিলেন। তিনি সরকারী দল ও স্বাধীনতার পক্ষের দলগুলোর মধ্যে একটা সেতুর মত কাজ করতেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাঙালী জাতির বিকাশ,অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি, শোষনমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিয়োজিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে এক বার্তায় গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছিলেন “কাজী আরেফের মৃত্যুতে জাতি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও নিবেদিতপ্রান রাজনীতিবিদকে হারিয়েছে। ঘটনার পর পর জাতীয় সংসদে তাৎক্ষণিক ভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বিবৃতিতে ঘটনাটিকে” দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা বলে উল্লেখ করেন । মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর জর্ডান সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে আসেন ও তার মন্ত্রীপরিষদ সহ শহীদ মিনারে কাজী আরেফ আহমেদের কফিনে পুস্পস্তবক অর্পন ও শ্র্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। জাতীয় নেতৃবৃন্দ প্রায় সকলেই তার কফিনে শ্রদ্ধা জানায়। তাদের মধ্যে তার এককালীন সহযোগী তৎকালীণ পানিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের মন্তব্য তুলে ধরা হলো ।
জনাব আব্দুর রাজ্জাক বলেন ১৯৬০ দশকের শুরুতে আরেফের সাথে আমার পরিচয় ১৯৬২ সালে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়তে সিরাজুল আলম খান, কাজী আরেফ ও আমি ৩ সদস্যের নিউক্লিয়াস গঠন করি। তিনি আরো বলেন এই নিউক্লিয়াস স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদে রূপান্তিত হয় । কাজী আরেফ এই বিপ্লবী পরিষদের হাইকমান্ডের সাহসী বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান সদস্য ছিলেন।জনাব রাজ্জাক বলেন—আমরা ছাত্র ও যুবকদের রিক্রুট করতাম আর কাজী আরেফ কর্মীদের সশ্স্ত্র সংগ্রামের প্রশিক্ষণ দিতেন। এই প্রশিক্ষণের কাজ অতি গোপনে করতেন। রাজনৈতিক কারনে তাকে নেপথ্যে রাখা হত । জনাব রাজ্জাক বলেন—৭১এর ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলনের শুরু থেকে কাজী আরেফ জড়িত ছিলেন। এই বিষয়টা নিয়ে আমার সথে তার যোগাযোগ ছিল। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন কমিটিও করেছিল । একই চেতনা সম্বলিত আরেকটি সংগঠন ছিল ” ৭১য়ের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। এই দুটো সংগঠনের সমন্বয়ে “জাতীয় সমন্বয় কমিটি গড়ে ওঠে। এতে কাজী আরেফ এর অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা ছিল।আমরা যৌথ উদ্যোগে কাজ করেছি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দৃঢ়চেতা কাজী আরেফ ” গোলাম আজম এর বিচারে গঠিত গণআদালত গঠনে মুখ্য ভূমিকা রাখেন। তিনি আরো বলেন—আরেফ নিজেকে জাহির করার জন্য কোন কাজ করতেন না। আমরা দলের নেতা হয়েছি, অনেক সুযোগ সুবিধা নিয়েছি কিন্তু কাজী আরেফ কোনদিন এ ধরনের সুবিধা নেন নাই, তাঁর মত সৎ আদর্শবান নেতা আজকের যুগে বিরল।
(তথ্যসূত্র: কাজী আরেফ আহমেদের বিভিন্ন প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত লেখা )
কাজী সালমা সুলতানা
তথ্যও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ

