একটা দুঃস্বপ্ন

রাত বাজে প্রায় ১১টা। আমি সায়েদাবাদ বাস স্ট্যান্ডের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিকোটিনে ফুসফুস পূর্ণ করছি। সায়েদাবাদ এমন একটা জায়গা যেখানে সবাই যার যার কাজে ব্যাস্ত। কারো দিকে কারো তাকানোর ফুসরত নেই। এই যেমন আমি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রায় আধা ঘন্টা ধরে বায়ু দূষণ করে চলেছি সে ব্যাপারে কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। আধা ঘন্টা ধরে কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করলে বিরক্ত বোধ করার কথা। কিন্তু আমি বিরক্ত হবো হবো করেও হতে পারছি না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মানুষের বিচিত্র কান্ড কারখানা দেখছি। আসলে বাসস্টেশন, লঞ্চস্টেশন বা রেলস্টেশনেই বোধহয় মানুষের আচার আচরণ সম্পর্কে এত বিচিত্র ধারণা লাভ করা যায়।

আমার বিচিত্রতা আহোরণে বাধ সাধল শামীম। ওর জন্যই এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম।
-কিরে এত টাইম লাগে আসতে? আধ ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি।
-আর বলিস না! তুই যেই সময় ফোন করলি সেই সময়ে মাত্র খেতে বসছিলাম। মা বলল, খাওয়া শেষ করে যেতে। তাই, একটু দেরী হল আর কি!
-প্যাঁচাল বন্ধ কর। তাড়াতাড়ি চল। ১০ মিনিটের মাঝে বাস ছেড়ে দিবে।
-হুম চল।

এই জন্যই শামীমকে আমার এত পছন্দ। সবসময় রেডি। জাস্ট, একটা ফোন করলেই হল। জিজ্ঞেসও করবে না কোথায় যাব।
যেমন আধা ঘন্টা আগে ফোন করে বলেছিলাম তাড়াতাড়ি সায়েদাবাদ আয়। এক জায়গায় যেতে হবে। শামীমও তার স্বভাবমত কোন কিছু জিজ্ঞেস না করে চলে এসেছে।

বাস ছেড়ে দিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। রাতের বেলা। হুহু করে বাতাস ঢুকছে জানালা দিয়ে। ঠান্ডায় প্রায় জমে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ আগেই জানালা বন্ধ করার ব্যার্থ চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়েছি। তারওপর জানালার পাশে সিট আমার। মনে হয় সর্দিটা আজ বেঁধেই যাবে। তাকিয়ে দেখি শামীম ঘুমিয়ে কাঁদা। আমিও ঘুমানোর চেষ্টা করলাম।

ভোর হয়ে গেছে পৌঁছুতে পৌঁছুতে। সিএনজি থেকে নেমে দাঁড়ালাম। বাস স্টেশন থেকে সিএনজি নিয়েছিলাম দরদাম করেই। তাই, ভাড়া নিয়ে কোন ঝামেলা হল না। বিশাল গেটটার সামনে আমরা দুজন দাঁড়িয়ে আছি। একজনের অনুভূতি একরকম। আমার প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। রাতে খেয়ে বের হইনি। তাই, ক্ষুধায় পেট জ্বলছে। আর শামীম পুরো হতবুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ও জানে উদ্ভট সব জায়গায় যাওয়ার আমার বদভ্যাস রয়েছে। কিন্তু পাবনা মানসিক হাসপাতালে আসব সেটা মনে হয় আশা করেনি। আসলে গতকাল একটা বই পড়েছিলাম মানসিক রোগীদের ব্যাপারে। তখনই হুট করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম স্বচক্ষে একবার তাদের দেখার। যার ফলাফল স্বরুপ আমরা দুজন এখন এখানে দাঁড়িয়ে।

দারোয়ানের সাথে আমার তর্কাতর্কি হচ্ছে। তার কথা হচ্ছে ডাক্তার বা রোগীর আত্মীয় ছাড়া ঢোকা নিষেধ। নিরুপায় হয়ে শামীমের দিকে তাকালাম। এরকম কঠিন পরিস্থিতে হ্যান্ডেল করার ওর একরকম জাদুকরী ক্ষমতা রয়েছে। ও এগিয়ে এসে দারোয়ানের সাথে কথা শুরু করল। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছি। একটু পরেই দেখি দারোয়ান হাসিমুখে গেট খুলে আমাদের ঢুকতে দিল। ভেতরে ঢুকেই শামীমকে জিজ্ঞেস করলাম কিভাবে ম্যানেজ করলি?
-বঙ্গবন্ধুর সহায়তায়।
-মানে!?
-একটা ১০০ টাকার নোট দিতে হয়েছে।
-এতে বঙ্গবন্ধু কিভাবে আসলো?
-আরে, গাধা! ১০০ টাকার নোটে বঙ্গবন্ধুর ছবি আছে না?

আসলেও তো! খেয়াল করে দেখিনি আগে! যদিও ঘুষ জিনিশটা আমার পছন্দ নয়। তবে এটা মাঝে মাঝে বেশ কাজের, মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হলাম।

-এই লোকটার অবস্থা দেখি আরও ভয়াবহ!
-আসলেই। আর সহ্য হচ্ছে না।
-তুই ই তো নিয়ে আসলি এখানে। চল!! আর ভালো লাগছে না।
শামীমের কথায় আমিও সম্মত হলাম। এতক্ষণ ঘুরে ঘুরে কয়েকজনকে দেখলাম। আসলে শারীরিক থেকে মানসিক দিক দিয়ে অসুস্থ হওয়াটাই ভয়াবহ। হাঁটতে হাঁটতে গেটের কাছাকাছি এসে পড়েছি। এ পর্যন্ত তেমন কাউকে দেখলাম না। এত সকালে এখনও ডাক্তার বা নার্সরা আসেনি। গেটে এসে দেখি আরেকজন দারোয়ান বসে আছে এখন। ভাবছি একে কিভাবে ম্যানেজ করব।
-চাচা, দরজাটা খোলেন। বের হব।
-আরে ভাইস্তা, চাইলেই কি সবাই বাইর হইতে পারে নাকি! ডাক্তারের পারমিশন লাগে!
-আপনি বোধহয় ভূল করছেন। আমরা রোগী নই।
-কেউই তো কয় না হ্যায় রোগী।
মহান কোন বাণী বলে ফেলেছে এরকম একটা ভাব করে শরীর দুলিয়ে হাসতে লাগল।
কি করব বুঝতে পারছি না। এমন সময় দেখি দারোয়ান দুইজন গার্ডকে ইশারা করে ডেকে আমাদের দেখিয়ে বলল, কাশেইম্মা এগোরে লইয়া যা। কেম্নে জানি সেল থেইকা ছুইটা আইছে।
গার্ড দুইজনকে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে ভয়ে মেরুদন্ড দিয়ে যেন একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। আমরা চিৎকার করে বোঝানোর চেষ্টা করছি যে আমরা পাগল নই। কিন্তু তারা মনে হয় বধির। একরকম টেনে হিঁচড়েই আমাদের নিয়ে যাচ্ছে। আমিও সমানে চিৎকার করে যাচ্ছি, আমি পাগল নই। আমি পাগল নই। কিন্তু টানাটানি বন্ধ হচ্ছে না।
এই সময়ে ঘুম ভেঙ্গে গেল। জেগে দেখি সত্যিই আম্মু টানাটানি করছে,
-কিরে, আর কতক্ষণ ঘুমাবি!? সকাল ১০টা বাজে। তাড়াতাড়ি উঠ! আর কি বিড়বিড় করছিস এসব!!??
এতক্ষণে বুঝতে পারলাম আমি স্বপ্ন দেখছিলাম। এখনও মাথার মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে। কি ভয়টাই না পেয়েছিলাম। একটু স্বস্তিও পাচ্ছি এটা ভেবে যে, এটা তাহলে সত্যি নয়! শুধুমাত্র একটা দুঃস্বপ্ন ছিল। দুঃস্বপ্নও যে স্বস্তি দিতে পারে এই প্রথম উপলব্ধি করলাম।

60853235_2493135637364825_3381477157149605888_n

লেখক :  সাকিব হাসনাইন

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.