জাতীয় নির্বাচনের পর গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন, বেশ প্রাঞ্জল ভাষন। মাননীয় শেখ হাসিনা বর্তমানে পৃথিবীর একজন উচ্চ মানের নেতা। ক্ষমতায়, সামরিক চিন্তায়, মানবতায় কত নিউজ আমরা পৃথিবীর নানান পত্রিকায় পড়ি এবং গর্বিত হই। কেননা যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধুর কন্যা এত উচ্চতায় সেটা নিশ্চিতভাবেই দেশের জন্য গর্বের ।
শুক্রবার সরাসরি ভাষনটি শোনার সুযোগ হয়নি। তাতে কি , আধুনিক যুগে ওনার গুরুত্বপূর্ণ ভাষনটি ইন্টারনেটে শুনলাম, আবার শুনলাম, বোঝার চেষ্টা করলাম। কিছু বিষয় বুঝে আসলো আবার কিছু বিষয়ে কেমনজানি খটকা লাগলো। কোথায় খটকা লাগলো, সেটাই বলার চেষ্টা করবো। তবে তার আগে বলা ভালো, আজকের পত্রিকায় দেখলাম ওনার ভাষন নিয়ে রিজভি সাহেব , মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেব এবং ওলি আহমেদ সাহেবের ভাষ্যেও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, বলা যায় এটা একান্তই প্রত্যাশিত ছিলো। তাদের ভাষ্যেগুলোর মাঝে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভাষ্যেটি বেশ আকর্ষণীয় বলা যায় । মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর ভাসনটি একটি ” গিল্টি কনসেন্স “- অপরাধবোধ থেকে।
মির্জা সাহেব কেন প্রধানমন্ত্রীর ভাষন কে অপরাধবোধ থেকে বলছেন, তা মনে হয় যারা ভাষন শুনেছেন, তাদের নিজেস্ব বিবেচনায় বিচার করবেন । তবে আমি যা বলতে চাচ্ছি , সেটা সেই খটকার কথা । কোথায় ভাষনটি খটাকা লাগে ?
স্বাধীনতার পর থেকে দেশে ভোটের পরে ক্ষমতায়ন হয়েছে অনেক সরকার । নিয়মমাফিক ক্ষমতাসীন সরকার প্রধান ভাষন দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও দিবেন নিশ্চয়ই । সেই রকম ক্ষমতাসীন সরকারের অনেক ভাষন এ অব্দি শুনেছি, কিন্তু আজ অব্দি কোনো সরকার প্রধানের ভাষনে ” ভোটে কিভাবে জয়ী হলাম এবং কেন বিরোধীদল পরাজিত হলো “ এরকম কোনো ভাষন আমার অন্তত মনে পড়ছে না। জানিনা বাংলাদেশে কেউ শুনেছেন কিনা ? এই যে ভোটের ফিরিস্তি গাওয়া ! এখানেই মনে হয় মির্জা সাহেবের সেই শব্দটি প্রযোজ্য ” গিল্টি কনসেন্স ” !সামনে প্রধানমন্ত্রী এই গিল্টি কনসেন্স নিয়ে আবার না জাতির উদ্দেশ্যে ভাষন দিয়ে দেন, আশ্চর্য হবো না।
এবার আসি ভাষনটির ভিতরের কিছু কথায় । মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভাষনে খুবি সম্মানের সাথে গণতন্ত্রের মানষ পুত্র হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের প্রথম সভাপতি মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী , প্রথম সাধারণ সম্পাদক এম সামসুল হক, জাতীয় চার নেতা, মহান মুক্তিযুদ্ধে সকল মুক্তিযোদ্ধা এবং সর্বশেষ বঙ্গবন্ধুর কথা স্বরণ করেছেন । অতি স্বাভাবিক কারণেই ( যেহেতু দেশে প্রথম চারবারের প্রধানমন্ত্রী) ৭৫-এ নিজ গর্বিত পিতা সহ পরলোকগত সকল সদস্যের নাম স্বরণ করেছেন। ওনার চাওয়া পাওয়ার কিছুই নেই , অতীতেই অনেকবার দেশবাসীকে স্বরণ করিয়ে দিয়েছেন, জাতির উদ্দেশ্যে ভাষনে তা পুনরাবৃত্তি করে স্বরণ করিয়ে দিয়েছেন , কারণ সহকারে । সব কিছুই সঠিক বলে গন্য হয়। এখানেও এই স্বরণ করানোর ক্ষেত্রে খটকা লাগে !
লক্ষ্যণীয় যে , প্রধানমন্ত্রীর ভাষনে ৫২ এর ভাষা আন্দোলন- ৬৯ এর গণ আন্দোলন- ৭০ এর নির্বাচন- ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ৭৫ এর বঙ্গবন্ধু হত্যার নির্মম কাহিনী স্বরণ করে একধাপে ৯৬ এ চলে গেলেন। তারপর আবার ২০১৪ এর পেট্রল বোমার ইতিহাসে এসে আওয়ামী লীগের ২১ হাজার কর্মির মৃত্যুর কথা বেশ জোরালোভাবেই বললেন। ২১ হাজার কর্মির মৃত্যুর কথায় দ্বিমত করছি না , তবে এখানে বলা ভালো যে আজ অব্দি এই ২১ হাজারের কোনো লিস্ট দেশে প্রকাশ হয়নি! অন্তত নির্ভিক সেই সৈনিকদের নাম প্রকাশ করা আওয়ামী লীগের মত ঐতিহ্যবাহী দলের উচিত ছিলো বলেই মনে করি।
এখানে বলা ভালো যে, ২০১৪ এর নির্বাচনে প্রথম দিকে বলা হতো ২৫০ টির মত ইস্কুল পুরিয়ে দেওয়া হয়েছে ( স্বরণ করে দেখুন, এটা প্রথম দিকের কথা ) পরবর্তীতে ধীরে ধীরে এটা ৬৫০ এ দাঁড়িয়েছে ! আশ্চর্যের বিষয় এই ইস্কুল গুলোতো রেজেস্ট্রি করা, এটারও কোনো সঠিক হিসেব কাগজে কলমে প্রমাণ দেওয়া হয়নি !
আবার অন্যদিকে জাসদের দাবির পরিপ্রেক্ষীতেও ৩০ হাজার তরতাজা প্রাণের মৃত্যু ঘটেছে। সেটারও কোনো কাগজে প্রমাণ নেই ,যদিও তখন কেবলি দেশ স্বাধীন হয়েছে, তবে তরতাজা প্রাণের মৃত্যু ছিলো হাজারে হাজারে, এটা মনে হয় অনেকেরই ভালো স্বরণে আছে।
লক্ষ্যণীয় যে, প্রধানমন্ত্রী এই ৩০ হাজারকে স্বরণ করেন নি , যদিও এই জাসদের একাংশ আওয়ামী লীগের মহাজোটের সাথেই নির্বাচনে জয়ী হয়েছে বটে ( করাটা প্রত্যাশিতও ছিলো না ) । তবে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ ২১ বছরের আওয়ামী লীগের করুণ ইতিহাস কে স্বরণ করে, ৯০ এর গণ আন্দোলনে কেবলমাত্র ” নুর হোসেনে “ এর কথা স্বরণ করেছেন। ৯০ এর হাজারো তরুণদের নাম যেখানে আওয়ামী লীগের অনেক তাদের কথা বলেন নি। কথাটি কেন বললাম।
এই ২১ বছরকে প্রধানমন্ত্রী কেমন জানি এরিয়ে যাওয়ার মনোভাব দেখিয়েছেন! গত দুবছর আগেই আমাদের বীজ্ঞ আদালত পূর্বের দুইটি সামরিক সরকার কে অবৈধ বলে রায় দিয়েছিলো । জিয়া এবং এরশাদ সামরিক সরকারকে। ধারণা করি , প্রধানমন্ত্রী সেই অবৈধ সামরিক সরকারের একজনকে নিয়ে ভোটে জিতে (!) এখন আদালতের দেওয়া অবৈধতাকে এরিয়ে যাবার প্রচেষ্টায় ছিলেন। কেননা ঘরের মাঝেই বিভীষিকা , কি আর করা । তবে সাধারণত জনগণ সবকিছুই কিন্তু অবলোকন করে।
এবার আসবো শুভেচ্ছা বাণীতে। সাম্প্রতিক আমেরিকার প্রেসিডেনট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রীকে জয়ী হওয়ার জন্য শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। আমরাও বেশ আনন্দিত নিশ্চয়ই কেননা বিশ্বের মহা শক্তিশালী দেশের পক্ষ থেকে ভোটে (!) জয়ী হওয়ার শুভেচ্ছা বাণী বলে কথা । তবে আবার এখানেও খটকা লাগে !
ট্রাম্প এর শুভেচ্ছা বাণী নিয়ে কিছু পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেলে যেন আনন্দে বর্ষাবরণ হচ্ছে। হই হই রই রই অবস্থা, আমেরিকার শুভেচ্ছা সুতরাং নির্বাচন নিয়ে আর বোধ হয় প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকবে না। ৭১ টিভিতে দেখলাম নতুন পররাষ্ট্র মন্ত্রী জনাব মোমেন সাহেব বললেন ” আমেরিকা সাধারণত কোনো দেশের কোনো প্রধানমন্ত্রীকে ভোটে জয়ী হওয়ার বিষয়ে কোনোপ্রকার শুভেচ্ছা বাণী পাঠান না, কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বিপুল বিজয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। সাথে অবশ্য উনি বললেন, আমেরিকার সাথে আমাদের নানান পারস্পরিক বানিজ্য ও বিনিয়োগের কথাও। বেশ ভালো এবং সত্য কথাও বটে।
হ্যাঁ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় সত্যেতা আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠিটি এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও পাওয়া যাচ্ছে। চিঠিটির যে অংশের কথা পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন তা ছিলো চিঠির শুরুর অংশ মাত্র । কিন্তু শেষের অংশের কথায় উনি এগুলেন না ! বর্তমানে মিডিয়া গুলোও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মত চিঠির প্রথম অংশ নিয়েই বেশ তোড়জোড় চালাচ্ছে। ট্রাম্পের শুভেচ্ছা, ট্রাম্পের শুভেচ্ছা । জনমানুষ মিডিয়ার উপর ভরসা রাখবে কি করে ?
এখানে মিডিয়ার বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ” নোয়াম চমস্কি “ এর একটি বিখ্যাত উক্তি বলি। চমস্কি বলেছেন , ” মিডিয়া আমাদের যা শোনায়, আমরা তাই শুনি। আমরা যা শুনতে চাই মিডিয়া আমাদের তা শোনায় না “ এখানেই স্বৈরাচারী সরকার গুলোর সফলতা এবং মিডিয়ার দূর্বলতা। যেমন , আপনি কখনোই জানতে পারবেন না , ইরাক যুদ্ধে সত্যিকারে কতজন সাধারণ জনগণ মৃত্যুবরণ করেছে ? বা সত্যিকারেই আমেরিকান কতজন সৈন্য মারা গিয়েছিল? আপনি উত্তর পাবেন না, কারণ মিডিয়া তা জানাবার ক্ষমতাই রাখে না। বাংলাদেশের মিডিয়া কি অবস্থায় আছে? তা না হয় নিজেরাই বিবেচনা করে নিবেন।
এবার ট্রাম্পের শুভেচ্ছা বাণীর শেষ অংশে দেখার চেষ্টা করবো। ট্রাম্প শেষে বলেছেন, ” একটি অঙ্গীকার সুনির্দিষ্টভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে , আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তরফে ৩০ শে ডিসেম্বরের নির্বাচনের নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানানো হয়েছে “। আরো গুরুত্বপূর্ণ যে, ওই নির্বাচনে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতা কর্মি সমর্থকদের উপর সুনির্দিষ্ট আক্রমণ এবং সাংবাদিকদের উপর সুনির্দিষ্ট নির্যাতনের রির্পোট বা তথ্য রয়েছে । যা জাতীয় নির্বাচন এবং বাংলাদেশের বৈশ্বিক ইমেজকে সুস্পষ্ট কলঙ্কিত করেছে।

লক্ষ্য করুণ, মহা ক্ষমতাসীন আমেরিকার ট্রাম্পের শুভেচ্ছা নিয়ে আমাদের মিডিয়া যে হারে প্রচার চালাচ্ছে, অথচ শেষের সত্যেকে নিবিরভাবে এরিয়ে যাচ্ছে । এটা কি সত্যি মিডিয়ার ভূমিকা হতে পারে ?
সত্ সাহস যে আমাদের দেশের মিডিয়া গুলো রাখে না , এটাকি তার প্রমাণ বহন করে না ?
আমাদের দেশে যে সত্য প্রকাশ করে তাকে সাহসি বলা হয় ! মানে কি দাঁড়ায় ? দেশে সত্য বলা ভয়ের বিষয় নিশ্চয়ই? আমাদের মিডিয়া গুলো কতটা সাহসি ? এই প্রশ্ন জনগণই বিচার করুন ।
প্রধানমন্ত্রী একটি কবিতার চয়ন দিয়ে ভাষন শেষ করেছেন। বলতেই হয়, এটাও জাতীয় ভাষনে নতুনত্ব। এটা নিয়ে সমালোচনা করছি না । শুধু আশা থাকবে কখনো গান না আসলেই চলবে। কেননা জাতীয় সংসদে আমরা গানও গাইতে দেখি। সত্যিকারের বিরোধী দল বিহিন সংসদে গানই চলার কথা। নিজেরাই সরকারে, নিজেরাই বিরোধী দলে ! এখন আবার একসাথে ভোট করে , ভোটে জিতে (!) ভাগবাটোয়ারা করে বিরোধী দল তৈরি করা ! গণতন্ত্রের জন্য কি অবশিষ্ট থাকলো ? সেটা নিশ্চয়ই মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন ।

বুলবুল তালুকদার
সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

