১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর বাংলাদেশে যে সিপাহী অভ্যুত্থান হয়েছিলো , তার কিছু অজানা কাহিনী বললেন সেই সময়ের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতা সুবেদার মাহাবুবুর রহমান, তিনি ১৯৭৮ সাল থেকে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে বসবাস করছেন,তাঁর একটি সাক্ষাতকার নিয়েছি যা তিনি নিজ হাতে লিখিত দিয়েছেন।

আমি তাকে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করেছিলাম সামরিক বাহিনীর একজন সদস্য হয়েও কিভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হলেন,তিনি বলেন স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীর প্রতি অবহেলা, সামরিক বাহিনিকে উপেক্ষা করে রক্ষীবাহিনী গঠন, দেশের তৎকালীন পরিস্থিতি আমাদের আমাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যেতে বাধ্য করে,১৯৭৩ সালেই হাবিলদার বারির মাধ্যমে তৎকালীন জাসদের সভাপতি মেজর জলিলের সাথে আমাদের যোগাযোগ হয় ।কিন্তু বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা শুধুমাত্র সৈনিকদের দাবী নিয়েই তাদের কার্যক্রম শুরু করে দাবীগুলোর মধ্যে অন্যতম দাবী ছিল ব্যাটম্যান প্রথা বাতিল, ব্রিটিশ আমলে এই প্রথা চালু ছিল, পাকিস্তান আমলেও ছিল এবং স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সেনাবাহিনীতে এই প্রথা থাকবে তা আমরা প্রত্যাশা করিনি।ব্যাটম্যান প্রথা হচ্ছে সেনাবাহিনীর অফিসারদের গৃহকর্মীর কাজ অনেকটা দাস প্রথার মতো। এর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর সাধারন সদস্যদের অসন্তোষ ছিল।যাই হোক ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে মেজর জলিল গ্রেফতার হওয়ার পর সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল তাহেরের সাথে আমাদের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। তাহের আমাদেরকে সংগঠিত হওয়ার পরামর্শ দেন,আমরা শুধু ঢাকা নয় বিভিন্ন সেনানিবাসে সংগঠিত হতে থাকি, এর মধ্যে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ১৯৭৫ সালে সেনাবাহিনীর জুনিয়র সদস্যদের দ্বারা নিহত হওয়ার পর সেনাবাহিনীতে অস্থিরতা দেখা দেয়, অফিসারদের মধ্যেও আসে বিভক্তি। ১৯৭৫ সালের ৩ রা নভেম্বর আরেকটি অভুত্থান হয় । এই অভুত্থান খালেদ মোশাররফের নামে হলেও এর নেপথ্য নায়ক ছিলেন কর্নেল সাফায়েত জামিল, এমনটাই মনে করেন নায়েব সুবেদার মাহাবুব।তিনি বলেন ৭ই নভেম্বর রাতে কর্নেল হায়দার, কর্নেল হুদা এবং খালেদ মোশাররফকে কারা হত্যা করলো তা রহস্যজনক, তার সঠিক তদন্ত হওয়া উচিৎ।

সুবেদার মাহাবুব বলেন তিন তারিখের অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর চেইন অব কম্যান্ড যখন ভেঙে যায় অফিসারারা বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব যখন বিপদজনক অবস্থায় চলে যায় তখন কর্নেল তাহের আমাদেরকে তার ভাই আবু ইউসুফের এলিফাণ্ট রোডের বাসায় ডেকে পাঠান, একটি অভ্যুত্থানের জন্য আমরা প্রস্তুত কি না জিজ্ঞাসা করলে আমরা তাতে সম্মতি জ্ঞাপন করি , আমাদের মধ্যে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা বিভিন্ন দায়িত্ব নিয়ে কাজে নেমে পরি, আমার উপর দায়িত্ব ছিল ফাকা গুলির মাধ্যমে অভ্যুত্থানের সূচনা করা,এটা ছিল একটা সিগন্যাল অন্যান্য সবাইকে এভাবেই বলা হয়েছিলো গুলির আওয়াজ পেলে সবাই যাতে যার যার ইউনিট থেকে বেড়িয়ে আসে, আমি আমার স্ত্রী এবং ছেলে মেয়েদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ওই দিন রাত ১২টায় প্রথম গুলি করে অভ্যুত্থানের সূচনা করি । আমার গুলির পরই সেনাবাহিনীর সদস্যরা ইউনিট ছেড়ে পথে বেড়িয়ে আসে, এর আগে লিফলেট ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো সারা ক্যান্টনমেন্টে , সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের দাবী দাওয়ার বিষয়ে সচেতন হয়েছিলেন সেই লিফলেটের মাধ্যমে কিন্তু অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না, অনেকেই ধারনা করেছিলেন খন্দকার মুশতাক বা জেনারেল জিয়ার নেতৃত্বে হয়েছে এই অভ্যুত্থান,লিফলেটে কোন নেতার নাম উল্লেখ না থাকায় এই ধারনা হয়েছিলো। এই অভ্যুত্থানে রাতের বেলায় কোন অফিসারকে হত্যা করা হয়নি বলে দাবী করেন সুবেদার মাহাবুব,তিনি বলেন অফিসারদের প্রতি সাধারন সৈনিকদের ক্ষোভ ছিল, আমাদের হাতে যতক্ষণ নিয়ন্ত্রন ছিল ততক্ষণ পর্যন্ত কোন হত্যাকাণ্ড হয়নি, শুধুমাত্র অফিসারদের ব্যাজ খুলে নেয়া হয়েছিলো, তিনি বলেন আমরা সেই রাতে অভুথানের সূচনা করে কর্নেল তাহেরের বাসায় আসি এবং পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করি। কর্নেল তাহেরের ভাই অধ্যাপক আনোয়ারকে নিয়ে ঢাকা রেডিও অফিস নিয়ন্ত্রনে নেই, সকাল বেলা আর্মি হেড কোয়ার্টরে জেনারেল জিয়া এবং কর্নেল তাহের আলোচনায় বসেন, এর আগে কর্নেল তাহেরের নির্দেশে জিয়াকে আমরা বন্দী থেকে মুক্ত করি কর্নেল তাহের জিয়াকে এলিফাণ্ট রোডের বাসায় নিয়ে আসতে বলেন কিন্তু জিয়া সেখানে আসতে রাজী হননি।সকালে হাসানুল হক ইনুকে নিয়ে কর্নেল তাহেরই সেনাবাহিনির হেড কোয়ার্টারে আসেন সেখানে আরও অফিসাররা উপস্থিত হয়েছিলেন । সুবেদার মাহাবুব দাবী করেন জেনারেল জিয়া ক্ষমতা গ্রহন করার পর অফিসার হত্যা সংগঠিত হয়।এর জন্য কর্নেল তাহের বা বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা দায়ী নয়, এটা কোন পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ছিল না,বিদ্রোহী সৈনিকরা অনেকেই অফিসারদের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তারাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে।তিনি বলেন, ৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ব্যর্থতার জন্য কর্নেল তাহেরকে জীবন দিতে হয়েছে। তিনি ৭ই নভেম্বরের পূর্ববর্তী ঘটনাবলীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন ৩রা নভেম্বর খালেদ মোশররফের অভ্যুত্থানের পর থেকে পুরো সেনানিবাসটি ছিল অন্ধকারে কোথায় কি ঘটছে কেউ কিছু জানেনা, সেনাবাহিনী কার নির্দেশ পালন করছে খালেদ না সাফায়েত জামিলের তাও নিশ্চিত নয় ,সাধারন সৈনিকদের মতো জুনিয়র অফিসারারও ছিল অন্ধকারে।
সেই পরিস্থিতিতে ৬ই নভেম্বরে রাত সাড়ে বারটায় চূড়ান্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী একক ফায়ার করে সৈনিকদের বিপ্লব শুরু করার ইঙ্গিত দিলাম, আমি বিদ্রোহী সৈন্যদের সাথে নিয়ে COD দখল করতে যেয়ে প্রথম প্রতিরোধের সম্মুখীন হই, তাদের বোঝালাম তোমাদের বাঁচানোর জন্যই এই বিপ্লব, তারা যখন বুঝতে পারলো তারাও আমাদের সাথে যোগ দিল ।পরবর্তী কাজ ছিল অফিসারদের রেঙ্ক বা ব্যাজ খুলে নেয়া যাতে তারা কোন সেনাদের কম্যান্ড করতে না পারে। এই বিপ্লবের উদ্দেশ্য সাধারন সৈনিকরা বুঝতে পেরে আমাদের সহযোগিতা করল এবং অতিদ্রুত বিনা রক্তপাতে ঢাকা সেনানিবাসের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে নিলাম । ঢাকা বেতার কেন্দ্রও দখল করা হয় বিনা প্রতিরোধে, কর্নেল ত্যাহের নির্দেশ দিয়েছিলেন জিয়াকে মুক্ত করতে এবং রেডিও অফিসে নিয়ে আসতে আমরা সে অনুযায়ী জিয়াকে মুক্ত করে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম কিন্তু জিয়া আমাদের সাথে আসলেন না , সকালবেলা কর্নেল তাহের সেনানিবাসের টু ফিল্ড আর্টিলারিতে এসে জেনারেল জিয়ার সাথে বৈঠক করেন।সেখানে কি কি আলোচনা হয়েছিলো সে সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। দুপুরের দিকে জেনারেল জিয়া নির্দেশ দিলেন সকল সৈনিকদের এবং অফিসারদের যার যার ইউনিটে ফিরে যেতে,এই নির্দেশের পর সেনানিবাসে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।এদিকে বিদ্রোহী সৈনিকদের বিরাট একটি অংশ শহরে টহল দিচ্ছে ,জনগনও স্বাগত জানাচ্ছে ,একটি ট্যাঙ্ক শাহাবাগে রেডিও অফিসের সামনে অবস্থান নিয়েছে। জাসদ কর্মীরা জাতীয় শহীদ মিনারে অবস্থা নিয়েছে।
(পরবর্তী অংশ আগামীতে প্রকাশিত হবে)
আলাপচারিতার অনুলিখন লিখেছেন শুদ্ধস্বর ডটকমের প্রধান সম্পাদক হাবিব বাবুল।

