১৯৭১ সন,গোপালপুর থানা।সেই থানায় ঘাটি গেড়েছে পাকিস্তানি সৈনাবাহিনী।ঘাটি তাদের বিরাট শক্ত,মুক্তিযোদ্ধারা তা কোনো পরিকল্পনা করেই দখলে আনতে পারতেছে না,সমস্যার উপরে এটা এখন হয়ে দাঁড়িয়েছি বড় সমস্যা।তখনই তারা শহিদুল ইসলাম নামের একটি ছেলেকে পেলন যে করবে এই দুর্ধর্ষ অভিযান।বয়স তার মাত্র ৯ কি ১০ হবে।কাদেরিয়া বাহিনীর ক্ষুদে মুক্তিযোদ্ধা।তার পুরো নাম ছিল শহিদুল ইসলাম লালু।
অপারেশনের দিন ঘনিয়ে এল।“লালু” সেই বিপদজনক অপারেশন এর জন্য তৈরি।হাটবারের দিন মুক্তিযোদ্ধারা থানা আক্রমণের জন্য পশ্চিম দিকে লুকিয়ে আছে সন্ধ্যার আধারে।লালুও প্রস্তুত।তার ডান হাতে দড়ি দিয়ে ঝুলানো কেরোসিন ভর্তি এক মাটির হাড়ি,বাম হাতে দড়ি দিয়ে ঝুলানো এক শিশির বোতল।এগুলো নিয়ে সে থানায় ঢুকলো।পাক বাহিনী ভাবলো সে বাজার করে ফিরেছে।পাক বাহিনী তাকে থানায় আসার কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের খবর দিতে এসেছি,কিন্তু সে সঠিক খবর না দিয়ে ভুল অবস্থানের খবর দেয় পাকিস্তানিদের।
লালুর শার্টের নিচে লুঙ্গির সাথে ছিল দুইটি প্রাইম গ্রেনেড।সে প্রথমে সরিষার তেলের শিশি ফেলে দিয়ে অন্য হাড়ির কেরোসিন তেল থানার ভিতরে ছুড়ে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং সাথে সাথেই দুই পাশের দুইটি ঘরে গ্রেনেড ছুড়ে নীরবে।শত্রুরা আগুনের দিকে হন্যে হইয়ে দৌড় দেয় এবং গ্রেনেডে কে কে আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে তা দেখে ভয়ে বাইরে চলে আসে।লালু সেই সুযোগে পালিয়ে যায় এবং মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীদের আক্রমণ করে এবং পাক বাহিনী সেখানেই পরাজিত হয়।
১৯৭২ সালে শেখ মুজিব দেশে আসেন।এই একই বছর তিনি শহিদুল ইসলাম লালুকে দেখতে যান এবং তাকে কোলে নিয়ে পরম মমতায় আদর করেন।১৯৭৩ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট প্রকাশ হয়।মুক্তিযোদ্ধে অসীম সাহসীকতা ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য শহিদুল ইসলাম লালুকে “বীর প্রতীক” ঘোষণা করা হয়।সে লালুই ছিল বাংলাদেশ,লালুর সাহসীকতাই বাংলাদেশের সাহসীকতা।সেই লালু নামের “বাংলাদেশ” কে ২০১০ সালে বিনা চিকিৎসায়,অনাহারে,দুঃখ আর বুক ভরা কষ্ট নিয়ে মরতে হয়।লালুর মৃত্যুই প্রমাণ করে এই দেশে দেশপ্রেমিকদের পরিণতি কি হতে পারে।জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের এই অভাগা জাতি কখনো মূল্যায়ন করতে পারলো না।
(বিঃদ্রঃএই গল্প আমি শুনেছিলাম আরেক ঐতিহাসিক মুক্তিযোদ্ধা,মুক্তিযোদ্ধের গবেষক,বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবঃপ্রাপ্ত মেজর কামরুল হাসান ভূইয়া(চাচা)’র কাছ থেকে।মুক্তিযোদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ ও জানানোতে এই মানুষটার অবদান অপরিসীম।তিনি এখন খুবই অসুস্থ।দয়া করে সবাই তার নেক হায়াতের জন্য আল্লাহের কাছে দোয়া করবেন।)
লেখক: মোঃ শাহিন আহমদ রিয়াদ

