ভারতে ভোটের আস্থা বনাম জাতীয়তাবাদের স্লোগান : কতদূর টিকবে মোদির কৌশল ?

নরেন্দ্র মোদির রাজনীতির সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো প্রতিটি বড় লড়াইকে একটি নৈতিক দ্বৈরথে রূপ দেওয়া। একদিকে দেশপ্রেমিক, অন্যদিকে দেশবিরোধী। একদিকে জাতীয়তাবাদী, অন্যদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী। কখনো আবার সরাসরি ভারত বনাম পাকিস্তান। এই কাঠামোর সুবিধা হলো, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষির সংকট বা প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার মতো জটিল প্রশ্ন আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে যায়। তখন প্রশ্ন দাঁড়ায় একটাই: তুমি কোন পক্ষে? উত্তরটা আবেগ ও পরিচয়ের, তথ্য ও যুক্তির নয়।

কিন্তু প্রতিটি কৌশলের একটি সীমা থাকে। প্রশ্ন হলো, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ ঘনীভূত হলে এই কৌশল কতটা কাজ করবে ?

কারণটা সহজ। জাতীয়তাবাদের আখ্যান বিরোধীকে শত্রু বানাতে পারে, কিন্তু রেফারির সততার প্রশ্ন সেই আখ্যানে মেটে না। গণতন্ত্রে ক্ষমতার বৈধতা আসে ভোট থেকে, আর ভোটের বৈধতা আসে নিরপেক্ষ ব্যবস্থাপনা থেকে। ভোটার তালিকা সংশোধন, কারও নাম বাদ পড়া, কমিশনার নিয়োগের পদ্ধতি, আচরণবিধি প্রয়োগে সমদর্শিতা, তথ্য প্রকাশের স্বচ্ছতা, এসবের কোনোটিই পাকিস্তান বা দেশদ্রোহের বিতর্কে ঢাকা পড়ে না। এগুলো সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। যার নাম তালিকা থেকে বাদ গেছে, সে জাতীয়তাবাদের স্লোগানে সান্ত্বনা পায় না। যে ভোটার মনে করে তার একটি ভোটের মূল্য আর আগের মতো নেই, তার কাছে প্রশ্নটি আবেগের নয়, অধিকারের।

সরকারের সমর্থকরা অবশ্য বলবেন, বিরোধীরা নির্বাচনে হেরে প্রতিষ্ঠানকে দোষ দিচ্ছে। তাঁদের যুক্তি, ভোটার তালিকা পরিচ্ছন্ন করা কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং অনুপ্রবেশকারী বা ভুয়া ভোটার চিহ্নিত করা গণতন্ত্রেরই স্বার্থে। এই যুক্তি উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। কিন্তু প্রশ্নটা কেবল কী করা হচ্ছে তা নিয়ে নয়, কীভাবে করা হচ্ছে তা নিয়েও। প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ না হয়, আপত্তির সুযোগ যদি সীমিত থাকে, আর সিদ্ধান্তের সময় যদি রাজনৈতিক সুবিধার সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে সদিচ্ছার দাবিও সন্দেহের মুখে পড়ে। রেফারির কাজ শুধু ন্যায্য হওয়া নয়, ন্যায্য দেখানোও। এই জায়গাতেই বিশ্বাসের সংকট তৈরি হয়, আর বিশ্বাসের সংকট কোনো প্রচারেই সহজে মেটে না।

এই প্রেক্ষাপটেই এসেছে ছাত্র ও বেসরকারি সংগঠনগুলোর আন্দোলন। এর বৈশিষ্ট্য বিরোধী দলের আন্দোলন থেকে আলাদা। রাজনৈতিক দল ভোটের হিসাবে চলে, তাই তাকে ‘বিরোধী’ বলে চিহ্নিত করা সহজ। কিন্তু শিক্ষার্থী বা নাগরিক সংগঠনের দাবি সাধারণত চাকরি, পরীক্ষার স্বচ্ছতা, শিক্ষার ব্যয়, নাগরিক অধিকার ও জবাবদিহির মতো বিষয়ে। তাদের ওপর ‘দেশবিরোধী’ তকমা লাগাতে গেলে সমাজের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে তরুণরা, সেটি মানতে চায় না। কারণ তারা নিজেরাই ওই সমস্যাগুলোর শিকার।

সরকারের সামনে তাই কয়েকটি পথ আছে। প্রথমটি পুরোনো ও পরীক্ষিত: আন্দোলনকে বিদেশি মদদ, ‘শহুরে নকশাল’ বা এনজিওর অর্থায়নের গল্পে বেঁধে ফেলা। বিদেশি অনুদান আইন, আর্থিক তদন্ত ও আইনি চাপ এই পথেরই হাতিয়ার। নির্বাচনী বছরে এই পথ আবেগ উসকে দিতে পারে। কিন্তু এর ঝুঁকি হলো, দাবি যতক্ষণ জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, ততক্ষণ দমনের প্রতিটি পদক্ষেপ আন্দোলনের পক্ষে সহানুভূতি বাড়ায়। দ্বিতীয় পথ হলো ক্লান্তির কৌশল: আলোচনার আশ্বাস, কমিটি গঠন, সময়ক্ষেপণ, আর ধীরে ধীরে আন্দোলনের গতি কমিয়ে আনা। ভারতীয় রাজনীতিতে এর নজির অনেক। তৃতীয় পথ হলো আংশিক ছাড়: সবচেয়ে স্পর্শকাতর দাবিগুলোর কয়েকটি মেনে নিয়ে আন্দোলনের ধার ভোঁতা করা। কৃষি আইন প্রত্যাহারের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, মোদি প্রয়োজনে পিছু হটতেও জানেন, যদিও সেটি তিনি করেন নিজের শর্তে ও নিজের সময়ে।

আমার ধারণা, সরকার এই তিন পথেরই মিশ্রণ বেছে নেবে। একদিকে কঠোর ভাষা ও আইনি চাপ, অন্যদিকে নিঃশব্দে কিছু ছাড়। কিন্তু আন্দোলনের পরিণতি নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর।

প্রথম, আন্দোলন কি নির্দিষ্ট দাবিতে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারবে, নাকি নানা মতের ভারে ভেঙে পড়বে ? ছাত্র ও নাগরিক আন্দোলনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সাংগঠনিক ধারাবাহিকতার অভাব। বড় সমাবেশ সহজ, বছরের পর বছর চাপ ধরে রাখা কঠিন।

দ্বিতীয়, আন্দোলন কি রাজ্য থেকে রাজ্যে ছড়িয়ে একটি জাতীয় রূপ পাবে? ভারতের বিশালতা আন্দোলনের পক্ষে যেমন সুযোগ, তেমনি বাধা। আঞ্চলিক ভাষা, স্থানীয় রাজনীতি ও ভিন্ন ভিন্ন সংকট একে খণ্ডিত করে দিতে পারে।

তৃতীয়, এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মধ্যবিত্ত ও অনিশ্চিত ভোটারদের মনোভাব। যতক্ষণ আন্দোলনকে তারা ‘নিজেদের সমস্যার কথা’ বলে মনে করবে, ততক্ষণ সরকারের পক্ষে একে ‘ওদের ষড়যন্ত্র’ বলে সরিয়ে রাখা কঠিন হবে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা এখানে সতর্কবার্তা। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হয়ে ছাত্র আন্দোলন সরকার পতনে গড়িয়েছিল। নেপালে তরুণদের ক্ষোভ রাতারাতি রাজপথে ফেটে পড়েছিল। ভারতের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভিন্ন, ফলে সরাসরি তুলনা টানা ভুল হবে। তবে একটি শিক্ষা সর্বজনীন: দীর্ঘদিন জমে থাকা তরুণ-ক্ষোভকে অবজ্ঞা করলে তা কখন কোন আকারে বিস্ফোরিত হবে, আগে থেকে বলা যায় না।

তাহলে শেষ পরিণতি কী? আমার বিশ্লেষণে সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি নাটকীয় কোনো পতন বা পূর্ণ বিজয় নয়। বরং একটি মাঝামাঝি অবস্থা: আন্দোলন সরকারকে কিছু নীতিগত ছাড় দিতে বাধ্য করবে, কিন্তু ক্ষমতার কাঠামো ভাঙবে না। তবে প্রকৃত ক্ষতি অন্যত্র হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন যদি সময়মতো স্বচ্ছভাবে না মেটে, তাহলে ক্ষতিটা হবে একটি সরকারের নয়, ভোটব্যবস্থার ওপর নাগরিকের আস্থার। এবং সেই আস্থা একবার ক্ষয়ে গেলে তা ফেরানো কোনো রাজনৈতিক নেতার একার সাধ্য নয়।

মোদির বর্ণনা-কৌশল এত দিন কাজ করেছে, কারণ বিরোধীরা প্রায়ই তাঁর তৈরি মঞ্চেই লড়াই করেছে। কিন্তু যখন প্রশ্ন ওঠে ভোটার তালিকা, কমিশনের স্বাধীনতা, চাকরি ও শিক্ষা নিয়ে, তখন মঞ্চটাই বদলে যায়। সেখানে ‘ভারত বনাম পাকিস্তান’ প্রাসঙ্গিক থাকে না। সেখানে প্রশ্ন একটাই: আমার ভোট কি সত্যিই আমার ?

যে সরকার এই প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর দিতে পারে, সে আবেগের রাজনীতি ছাড়াও টিকে থাকে। যে সরকার পারে না, তার জন্য সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ স্লোগানও এক সময় ফাঁপা শোনায়।

হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.