৭.৪ মাত্রার প্রবল শক্তিশালী কম্পন। বিপর্যস্ত কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চল। দেশটির সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চল বলে পরিচিত ‘চোকো’ এবং বিখ্যাত ‘কফি অ্যাক্সিস’-এ সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই ভূমিকম্পে অন্তত ১৩২ জন নিহত ও ৫৭০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এছাড়া বহু বাড়ি ধসে পড়েছে। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নীচে জীবিতদের সন্ধানে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন। কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, একবিংশ শতাব্দীতে সোমবারের কম্পনই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী।
কলম্বিয়ার দরিদ্রতম অঞ্চল চোকোতে উদ্ধারকাজ এক বড় চ্যালেঞ্জ
চোকো অঞ্চলের ‘সান হোসে দেল পালমার’-এর কাছে ভূমিকম্প হয়। এই অঞ্চলের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাস করে। যোগাযোগব্যবস্থা সীমিত হওয়া এবং দুর্গম জনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় জরুরি উদ্ধারকারী দলগুলোর পক্ষে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
‘কফি অ্যাক্সিস’ অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
কলম্বিয়ার কফি উৎপাদনকারী অঞ্চলের কেন্দ্রস্থল ‘রিসারালদা’ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে একটি। পেরেইরা শহরে সর্বোচ্চ ৬০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। ডসকিব্রাদাস এলাকাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কর্তৃপক্ষ যখন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করছে, তখন উদ্ধারকর্মীরা ধসে পড়া ও ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির ধ্বংসস্তূপ মাঝে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
১,৫০০-এর বেশি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত
প্রেসিডেন্ট আবেলান্দো দে লা এসপ্রিয়েলা জানিয়েছেন যে, ১,৫৭৭ আবাসিক বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। ৬০টিরও বেশি ভবন ধসে পড়েছে। ১৮টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ৫২টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাঁচটি প্রধান শহরে ‘রেড অ্যালার্ট’ বা সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
উদ্ধারকাজ চলাকালীন হাসপাতালও ক্ষতিগ্রস্ত
ভূমিকম্পে বেশ কয়েকটি শহরের স্বাস্থ্যসেবা পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কালিতে ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের একটি অংশ ধসে পড়ায় ভেতরে থাকা রোগীরা আটকা পড়েন। হাসপাতালটির প্রায় ৩০ শতাংশ পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে শিশু বিভাগ, ইন্টারনাল মেডিসিন এবং নবজাতক ইউনিটের (নিওনেটাল ইউনিট) অংশবিশেষও অন্তর্ভুক্ত। ধ্বংসস্তূপ থেকে অন্তত চারজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এবং অন্যান্য রোগীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উদ্ধারকাজ
ধসে পড়া কাঠামোর নীচে আটকা পড়া মানুষদের সন্ধানে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পুলিশ, দমকলকর্মী, সেনা সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকদের মোতায়েন করা হয়েছে। কালিতে উদ্ধারকারীরা একটি ধসে পড়া বাড়ি থেকে দুই মহিলা ও দুই শিশুকে জীবিত উদ্ধার করেছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জীবিতদের খুঁজে বের করা ও উদ্ধার করাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
বিপর্যয়ের মোকাবিলায় কলম্বিয়ার পাশে আন্তর্জাতিক সহায়তা
বেশ কয়েকটি দেশ উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা কর্মী ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। ইকুয়েডর ৪৭ জন উদ্ধারকর্মী, বিশেষ প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানকারী কুকুর এবং এমন সব সরঞ্জাম দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে যা টানা সাত দিন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম। এল সালভাদর ও মেক্সিকোও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাষ্ট্রসংঘ জানিয়েছে যে, প্রয়োজনে তারা কলম্বিয়াকে সহায়তা করতে প্রস্তুত।
সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৭.৩৪ নাগাদ ভূমিকম্প হয়। ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে-এর তথ্য অনুযায়ী, চোকো অঞ্চলের সান হোসে দেল পালমার-এর কাছে ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০৭ কিলোমিটার গভীরে ছিল এর উৎপত্তিস্থল। উদ্ধারকাজ চলার পাশাপাশি কর্তৃপক্ষ পশ্চিম ও মধ্য কলম্বিয়া জুড়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

