জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে আগামী ২০ আগস্ট থেকে ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘নির্বাসনের দিনগুলি’। নির্বাসন, দেশত্যাগ, রাজনৈতিক নিপীড়ন, স্মৃতি, মানবাধিকার ও অভিবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে রেখে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে ফ্রাঙ্কফুর্টের ২৬টি স্থানে মোট ৫০টি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
থিয়েটার, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, জাদুঘর, আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিভিন্ন প্রদর্শনী ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে নির্বাসনের অতীত ও বর্তমানকে তুলে ধরা হবে। এতে অংশ নেবে শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, সিনেমা হল, জাদুঘর, বেসরকারি উদ্যোগ, সংগঠন, সমিতি, পৌর প্রতিষ্ঠান ও ফাউন্ডেশন।
আয়োজনটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী জার্মান জাতীয় গ্রন্থাগারের ১৯৩৩–১৯৪৫ সালের জার্মান নির্বাসন আর্কাইভ। এই আয়োজনের মাধ্যমে শুধু জার্মানির নাৎসি আমলের নির্বাসনের ইতিহাস স্মরণ করা হবে না; বর্তমান পৃথিবীতে যুদ্ধ, রাজনৈতিক নিপীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিভিন্ন কারণে দেশছাড়া মানুষের জীবন নিয়েও আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে।
‘নির্বাসনের দিনগুলি’র পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রয়েছেন ড. ইরিনা শেরবাকোভা। তিনি রাশিয়ার মানবাধিকার সংগঠন ‘মেমোরিয়াল’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। সংগঠনটি সোভিয়েত আমলের রাজনৈতিক নিপীড়ন, দমন-পীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাস সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
২০২২ সালে রাশিয়ার সুপ্রিম কোর্ট ‘মেমোরিয়াল’কে বিলুপ্ত ঘোষণা করে। একই বছর সংগঠনটি নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়।
ইরিনা শেরবাকোভা একজন ইতিহাসবিদ, অনুবাদক এবং জার্মান ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে পিএইচডিধারী। ২০২২ সালের গ্রীষ্ম থেকে তিনি জার্মানিতে নির্বাসিত অবস্থায় বসবাস করছেন। বর্তমানে তিনি ‘ভবিষ্যৎ মেমোরিয়াল’ নামের সংগঠনের পরিচালনা পর্ষদের সভানেত্রী হিসেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তাঁর নিজের জীবনেই নির্বাসনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে নির্বাসনের ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে আয়োজিত এই কর্মসূচির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তাঁর উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
নির্বাসন বলতে সাধারণত নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে যাওয়াকে বোঝানো হলেও এর সামাজিক ও মানবিক অর্থ অনেক বিস্তৃত। রাজনৈতিক নিপীড়ন, যুদ্ধ, ধর্মীয় বা জাতিগত বৈষম্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নিষেধাজ্ঞা কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সংকট—বিভিন্ন কারণে মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে পারেন।
দেশ ছাড়ার পর একজন মানুষ শুধু নিজের বাড়ি বা ভূখণ্ড হারান না। অনেক সময় হারান পরিচিত সমাজ, পরিবার, বন্ধুবান্ধব, ভাষার পরিবেশ, সংস্কৃতি এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক। নতুন দেশে এসে তাঁকে নতুন ভাষা, আইন, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়।
এই কারণে নির্বাসন একটি রাজনৈতিক বিষয়ের পাশাপাশি একটি মানবিক ও সামাজিক বিষয়ও।
জার্মানির ইতিহাসে নির্বাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি শুরু হয় ১৯৩৩ সালে নাৎসি সরকার ক্ষমতায় আসার পর। রাজনৈতিক বিরোধী, ইহুদি, লেখক, শিল্পী, বিজ্ঞানী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তখন নিপীড়নের শিকার হন। অনেককে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়।
অনেক নির্বাসিত ব্যক্তি বিদেশে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করেন। কেউ লেখালেখি চালিয়ে যান, কেউ গবেষণা করেন, কেউ শিক্ষকতা বা অন্য পেশায় যুক্ত হন। আবার অনেকেই নিজের মাতৃভূমিতে আর কখনো ফিরে যেতে পারেননি।
তাঁদের লেখা, বই, চিঠি, ছবি, ব্যক্তিগত নথি ও অন্যান্য স্মৃতি আজ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এসব দলিল সংরক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো জার্মান জাতীয় গ্রন্থাগারের ১৯৩৩–১৯৪৫ সালের জার্মান নির্বাসন আর্কাইভ।
জার্মান জাতীয় গ্রন্থাগার জার্মানির সাংস্কৃতিক স্মৃতি সংরক্ষণের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। ১৯১৩ সাল থেকে জার্মানি, জার্মানি সম্পর্কে অথবা জার্মান ভাষায় প্রকাশিত লিখিত, দৃশ্য ও শ্রাব্য বিভিন্ন ধরনের প্রকাশনা সংগ্রহ, নথিভুক্ত ও সংরক্ষণ করে আসছে।
প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ মাধ্যম বা নথি নিয়ে এটি জার্মানির বৃহত্তম গ্রন্থাগার। লাইপৎসিগ ও ফ্রাঙ্কফুর্টে এর পাঠকক্ষ রয়েছে। আইনগতভাবে যতটা সম্ভব, এর সংগ্রহ ও বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল মাধ্যমেও বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
তবে নির্বাসন আর্কাইভের বিশেষ গুরুত্ব হলো—এখানে সংরক্ষিত হয়েছে নাৎসি শাসনামলে দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতার অসংখ্য দলিল।
বই, সংবাদপত্র, সাময়িকী, ব্যক্তিগত চিঠি, ছবি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নথি, ব্যক্তিগত সংগ্রহ ও অন্যান্য প্রকাশনার মাধ্যমে সেই সময়ের নির্বাসিত মানুষের জীবন সম্পর্কে জানা যায়।
এই আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে নির্বাসিত ব্যক্তিরাও যুক্ত ছিলেন। তাঁদের কাছে এটি ছিল শুধু ইতিহাস সংরক্ষণের একটি প্রতিষ্ঠান নয়; বরং রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি এবং সত্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম।
বর্তমান সময়ে প্রদর্শনী, আলোচনা, প্রকাশনা ও শিক্ষামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে এই ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে।
ফ্রাঙ্কফুর্টের ‘নির্বাসনের দিনগুলি’ সেই কাজকেই আরও বিস্তৃত পরিসরে মানুষের সামনে নিয়ে আসছে।
এই আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইরানি শিল্পী নাজানিন হাফেজের শিল্পকর্ম। তিনি বর্তমানে জার্মানিতে বসবাস ও কাজ করছেন। ক্ষমতার কাঠামো, নিয়ন্ত্রণ, সেন্সরশিপ, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবিচার এবং দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা তাঁর শিল্পচর্চার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পের ওপর প্রভাব ফেলেছে। শিল্পের মাধ্যমে তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক অবিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং মানসিক আঘাত ও প্রতিরোধ নিয়ে ভাবনার সুযোগ তৈরি করতে চান।
২০২৬ সালে তিনি ‘ফোম ট্যালেন্ট’ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তাঁর শিল্পকর্ম জার্মানির ফোকভাং জাদুঘরের আলোকচিত্র সংগ্রহের অংশ।
২০২৬ সালের ‘নির্বাসনের দিনগুলি’র মূল প্রচারচিত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে তাঁর ‘শুভ নওরোজ’ নামের শিল্পকর্ম।
এই কাজটিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত ও খণ্ডিত স্মৃতির ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। স্মৃতি কখনো হারিয়ে যায়, আবার তার কিছু অংশ নতুনভাবে ফিরে আসে। নির্বাসিত মানুষের জীবনে স্মৃতির এই ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের দেশ, পরিবার, ভাষা ও পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর স্মৃতি অনেক সময় মানুষের কাছে নিজের শিকড়ের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। পুরোনো ছবি, চিঠি, গান, বই কিংবা পারিবারিক গল্প হয়ে ওঠে অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার উপায়।
কিন্তু স্মৃতিও সব সময় অক্ষত থাকে না। যুদ্ধ, সহিংসতা, রাজনৈতিক নিপীড়ন, তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহ এবং ডিজিটাল যুগের বিচ্ছিন্নতা মানুষের স্মৃতিকে আরও ভঙ্গুর করে তুলতে পারে।
নাজানিন হাফেজের শিল্পকর্ম সেই ভঙ্গুর স্মৃতির বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে আসে।
বর্তমান পৃথিবীর দিকে তাকালে নির্বাসনের বিষয়টি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংঘাত, স্বৈরশাসন, ধর্মীয় ও জাতিগত নিপীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন।
কেউ শরণার্থী হিসেবে অন্য দেশে আশ্রয় নিচ্ছেন, কেউ রাজনৈতিক আশ্রয় চাইছেন, কেউ আবার বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছেন।
জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও গত কয়েক দশকে বিশ্বের নানা অঞ্চল থেকে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের দেশত্যাগের কারণ এক নয়। কেউ যুদ্ধ থেকে পালিয়েছেন, কেউ রাজনৈতিক নিপীড়নের কারণে, কেউ আবার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন জীবনের সন্ধানে এসেছেন।
তবে নির্বাসন বা দেশত্যাগের অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিষয়—নিজের পরিচিত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন বাস্তবতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।
এই বাস্তবতার সঙ্গে জার্মানির অতীতের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। নাৎসি আমলে জার্মানি থেকে যারা নির্বাসিত হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই অন্য দেশে গিয়ে শুধু নিজের জীবন রক্ষা করেননি; তাঁরা লেখালেখি, গবেষণা, শিল্প ও সংস্কৃতির মাধ্যমে নতুন সমাজেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
অর্থাৎ নির্বাসন শুধু ক্ষতির গল্প নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এটি নতুন সমাজে নতুন চিন্তা, নতুন সংস্কৃতি ও নতুন সৃষ্টিরও জন্ম দিয়েছে।
ফ্রাঙ্কফুর্টের ‘নির্বাসনের দিনগুলি’ এই বহুমাত্রিক বাস্তবতাকেই সামনে আনতে চায়।
এখানে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি সংলাপ তৈরি হবে। ইতিহাসের নির্বাসিত মানুষের জীবন ও বর্তমান সময়ের বাস্তুচ্যুত মানুষের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা হবে। শিল্প, চলচ্চিত্র, থিয়েটার, প্রদর্শনী ও বিভিন্ন আলোচনার মাধ্যমে নির্বাসনের নানা দিক তুলে ধরা হবে।
এই আয়োজনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে স্মৃতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও। একটি সমাজ তার অতীতকে কীভাবে স্মরণ করে, তার ওপর সেই সমাজের বর্তমান ও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনাও অনেকাংশে নির্ভর করে।
জার্মানির নাৎসি অতীত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে স্মৃতিচর্চা চলছে, তার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন করা এবং একই ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো।
‘নির্বাসনের দিনগুলি’ সেই স্মৃতিচর্চারই একটি অংশ।
এই আয়োজনের মাধ্যমে ফ্রাঙ্কফুর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দিচ্ছে—নির্বাসনের ইতিহাস শুধু অতীতের নয়, এটি বর্তমান পৃথিবীরও বাস্তবতা।
আজকের পৃথিবীতে যখন বিভিন্ন দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার ও মানবাধিকারের প্রশ্নে নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে, তখন নির্বাসনের ইতিহাসকে জানা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কারণ একজন মানুষ কেন দেশ ছাড়তে বাধ্য হন—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের দিকে তাকালেই হয় না; দেখতে হয় সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিও।
কোন পরিবেশে একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকের জন্য অনিরাপদ হয়ে ওঠে? কীভাবে রাজনৈতিক বিরোধিতা দমন করা হয়? কীভাবে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সমাজের বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়? কীভাবে ঘৃণা ও বৈষম্য ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে?
ইতিহাসের এসব প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক।
ফ্রাঙ্কফুর্টের ২৬টি স্থানে ৫০টি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘নির্বাসনের দিনগুলি’ তাই শুধু সাংস্কৃতিক কর্মসূচি নয়; এটি ইতিহাস, মানবাধিকার ও সমকালীন বিশ্বের বাস্তবতা নিয়ে চিন্তা করার একটি সুযোগ।
জার্মানিতে বসবাসকারী প্রবাসীদের কাছেও এই আয়োজন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। রাজনৈতিক নির্বাসন, শরণার্থীজীবন ও স্বেচ্ছায় অভিবাসনের অভিজ্ঞতা এক নয়—এটি অবশ্যই মনে রাখতে হবে। তবে নিজের দেশ থেকে দূরে বসবাসের কারণে ভাষা, সংস্কৃতি, পরিচয় ও স্মৃতির গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরি হয়।
দেশ থেকে দূরে গেলে ‘দেশ’ অনেক সময় শুধু একটি মানচিত্রের নাম থাকে না। এটি হয়ে ওঠে ভাষা, সংস্কৃতি, পরিবার, শৈশব, বন্ধুত্ব, উৎসব ও স্মৃতির সমষ্টি।
এই কারণেই নির্বাসনের ইতিহাস শুধু ইতিহাসবিদদের বিষয় নয়। এটি মানুষের জীবন ও পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
২০ আগস্ট থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফ্রাঙ্কফুর্টের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিতব্য কর্মসূচি সেই ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতার দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
জার্মান নির্বাসন আর্কাইভ অতীতের দলিল সংরক্ষণ করছে। শিল্পী নাজানিন হাফেজ স্মৃতি ও বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতাকে শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরছেন। ইরিনা শেরবাকোভা নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নির্বাসনের বাস্তবতাকে সামনে আনছেন। আর ফ্রাঙ্কফুর্ট শহর এই সবকিছুকে একটি বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনার মধ্যে নিয়ে আসছে।
সব মিলিয়ে ‘নির্বাসনের দিনগুলি’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নির্বাসন কোনো দূরের ইতিহাস নয়। আজও পৃথিবীর বহু মানুষ দেশ হারাচ্ছেন, ঘর হারাচ্ছেন, পরিচিত জীবন হারাচ্ছেন।
তাঁদের গল্প সংরক্ষণ করা, তাঁদের অভিজ্ঞতা বোঝা এবং তাঁদের মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ইতিহাসের ভুলকে শুধু স্মরণ করলেই হবে না; সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াও জরুরি।
ফ্রাঙ্কফুর্টের ‘নির্বাসনের দিনগুলি’ সেই শিক্ষা ও স্মৃতিচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। ২০ আগস্ট থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শহরের ২৬টি স্থানে ৫০টি আয়োজনের মধ্য দিয়ে নির্বাসনের ইতিহাস, স্মৃতি ও বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে যে আলোচনা শুরু হবে, তা নিঃসন্দেহে শুধু জার্মান সমাজের জন্য নয়, বর্তমান বিশ্ববাসীর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ মানুষ যখন নিজের দেশ হারায়, তখন শুধু একজন মানুষই দেশহারা হন না—একটি পরিবার, একটি স্মৃতি, একটি ভাষা এবং একটি জীবনের ইতিহাসও তার সঙ্গে স্থানান্তরিত হয়।
আর সেই ইতিহাস সংরক্ষণ করা মানে মানুষের অস্তিত্ব ও মর্যাদার ইতিহাস সংরক্ষণ করা।
হাবিব বাবুল
বহুমাত্রিক লেখক ও জার্মান প্রবাসী সাংবাদিক

