স্বাতী বৌদির ফোন, সুনীলদার স্মৃতি এবং ‘সুনীল থেকে সাদাত’ বই লেখার অঙ্গীকার

জীবনের কিছু সম্পর্ক সময়ের সীমা অতিক্রম করে যায়। কিছু মানুষ রক্তের আত্মীয় না হয়েও আপনজন হয়ে ওঠেন। সাহিত্য, সংস্কৃতি, ভালোবাসা আর পারস্পরিক শ্রদ্ধার বন্ধনে গড়ে ওঠা এমন সম্পর্কগুলোই জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং তাঁর সহধর্মিণী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার ও আমাদের পরিবারের সম্পর্কও ঠিক তেমনই এক আন্তরিকতার ইতিহাস।

আজ দুপুরে কলকাতা থেকে স্বাতী বৌদির ফোন পেলাম। প্রায়ই তাঁর সঙ্গে দূরভাষে কথা হয়। সুনীলদার মৃত্যুর পরও সেই যোগাযোগ কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। তিনি অত্যন্ত অমায়িক, স্নেহশীল এবং আন্তরিক একজন মানুষ। মাঝে মাঝেই নিজে ফোন করে আমাদের খোঁজখবর নেন। আমিও সুযোগ পেলেই তাঁর সঙ্গে কথা বলি। এত ব্যস্ততা, এত শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও মানুষের খোঁজ নেওয়ার এই অভ্যাস তাঁকে আরও বড় করে তোলে।

আজকের আলাপচারিতার এক পর্যায়ে হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল একটি বিশেষ দিন। আমি তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলাম—২০১১ সালের ঠিক এই দিন, ১১ জুলাই, তিনি এবং সুনীলদা আমাদের ফ্রাঙ্কফুর্টের বাসায় অতিথি হয়ে এসেছিলেন। আমার কথা শুনে তিনি কিছুটা বিস্মিত হলেন। তারপর হাসতে হাসতে বললেন, “তোমার স্মৃতিশক্তি তো সত্যিই খুব প্রখর! আমি নিজেও তারিখটা মনে করতে পারিনি।”

কথাটি শুনে আমারও ভালো লাগল। সত্যিই, জীবনের কিছু দিন ক্যালেন্ডারের তারিখ হয়ে থাকে না; সেগুলো স্মৃতির অ্যালবামে চিরস্থায়ী হয়ে যায়। সেদিনের দীর্ঘ আড্ডা, সাহিত্য আলোচনা, হাসি-আনন্দ, একসঙ্গে খাওয়া—সবকিছু আজও যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে হয়, ঘটনাটি যেন সেদিনই ঘটেছিল।

ফ্রাঙ্কফুর্টে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসের সুবাদে আমার বাড়িতে দুই বাংলার অসংখ্য লেখক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের আগমন ঘটেছে। কেউ এসেছেন বইমেলায় অংশ নিতে, কেউ সাহিত্যসভায়, কেউ ব্যক্তিগত সফরে। অনেকেই আমাদের বাসায় থেকেছেন, খেয়েছেন, দীর্ঘ সময় আড্ডা দিয়েছেন। সেই সব স্মৃতি শুধু ব্যক্তিগত নয়; বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য সময়ের দলিল বলেও আমি মনে করি।

এই কারণেই অনেক দিন ধরে একটি বই লেখার কথা ভাবছি। আজ সেই প্রসঙ্গই স্বাতী বৌদিকে জানালাম। বইটির নাম ঠিক করেছি—‘সুনীল থেকে সাদাত’

শিরোনামের মধ্যেই যেন বইটির দর্শন লুকিয়ে আছে। এক প্রজন্মের কিংবদন্তি সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সমকালীন জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসাইন—এই দুই প্রজন্মের লেখকদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয়, স্মৃতি, আড্ডা, সম্পর্ক এবং মানবিক মুহূর্তগুলোই বইটির মূল বিষয়বস্তু হবে। এটি কোনো সাহিত্য-সমালোচনার বই নয়; বরং একজন সাংবাদিক, একজন সাহিত্যপ্রেমী এবং একজন আতিথেয় মানুষের চোখে দেখা সাহিত্যজগতের মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ স্মৃতিচিত্র।

বইটির কথা শুনে স্বাতী বৌদি খুবই আনন্দিত হলেন। তিনি আমাকে আন্তরিক আশীর্বাদ জানিয়ে বললেন, “তাড়াতাড়ি শেষ করো। আমি বইটা দেখে যেতে চাই।”

এই একটি বাক্য আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।

স্বাতী বৌদির বয়স এখন পঁচাশি ছুঁইছুঁই। শারীরিক অবস্থা আগের মতো নেই। তবুও তাঁর কণ্ঠে জীবনের প্রতি ভালোবাসা, সাহিত্যকে ঘিরে আবেগ এবং আপনজনদের জন্য মমতা একটুও কমেনি। আমি তাঁকে কথা দিয়েছি, বইটি এ বছরই প্রকাশ করার চেষ্টা করব। প্রকাশিত হলে প্রথম দিকের কপিগুলোর একটি অবশ্যই তাঁর হাতে পৌঁছে দেব।

আসলে এই বই লেখার পেছনে আরেকজন মানুষেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের তুমুল জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসাইন বহুদিন ধরেই আমাকে এই বইটি লেখার জন্য উৎসাহ দিয়ে আসছেন। তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন সময় আলাপচারিতায় তিনি বারবার বলেছেন, এত মানুষের সঙ্গে আপনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক, এত স্মৃতি—এসব লিখে না রাখলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অনেক মূল্যবান তথ্য থেকে বঞ্চিত হবে।

কিছুদিন আগেও তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি বইটির অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। আমি তাঁকে বলেছিলাম, “কাজ চলছে, হয়ে যাবে।”

আজ স্বাতী বৌদির উৎসাহ যেন সেই প্রতিশ্রুতিকে আরও দৃঢ় করে দিল।

আমার স্ত্রী বকুলও স্বাতী বৌদির অত্যন্ত প্রিয়। আজকের ফোনালাপে তাঁদেরও বেশ কিছুক্ষণ কথা হয়েছে। দুই বাংলার দূরত্ব যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে গিয়েছিল। গল্প হয়েছে সংসার, স্বাস্থ্য, পুরোনো স্মৃতি এবং পারিবারিক নানা বিষয় নিয়ে। দীর্ঘদিনের এই আন্তরিক সম্পর্ক আমাদের পরিবারের জন্য এক বড় আশীর্বাদ।

স্বাতী বৌদি আমাদের ছেলে রাহুলের কথাও জানতে চাইলেন। কেমন আছে, কী করছে—সব খবর নিলেন। তারপর একেবারে আপনজনের মতো প্রশ্ন করলেন, “রাহুল বিয়ে করবে কবে?”

আমি হেসে বললাম, “এখনও ঠিক করেনি।”

তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “আমাকে কিন্তু নিমন্ত্রণ করবে। আমি যদি সুস্থ থাকি, অবশ্যই আসব।”

এই কথার মধ্যে ছিল নিখাদ স্নেহ। একজন মায়ের মতো আন্তরিকতা। বয়স, দূরত্ব কিংবা দেশের সীমানা—কোনোটাই যেন এই সম্পর্কের উষ্ণতাকে কমাতে পারেনি।

আলাপচারিতার শেষ দিকে তিনি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও জানতে চাইলেন। কথার ফাঁকে বললেন, “তোমাদের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নাকি খুব ভালো, খুব বিনয়ী মানুষ?”

আমি উত্তর দিলাম, “হ্যাঁ, তাই তো দেখছি।”

এরপর আবার গল্প ফিরে গেল সাহিত্য, মানুষ আর স্মৃতির জগতে।

ফোন রেখে দীর্ঘ সময় ভাবছিলাম—জীবনের প্রকৃত প্রাপ্তি আসলে কী?

অর্থ, বিত্ত, পদ কিংবা প্রতিষ্ঠা—সবই একসময় ফিকে হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা, আন্তরিকতা এবং স্মৃতির ভাণ্ডার কখনো পুরোনো হয় না। একজন কিংবদন্তি লেখকের সহধর্মিণী, যিনি নিজেও বাংলা সাহিত্যজগতের এক সম্মানিত ব্যক্তিত্ব, তিনি আজও স্নেহভরে ফোন করে খোঁজ নেন, পরিবারের সবার কথা মনে রাখেন, ছেলে রাহুলের বিয়ের কথা জিজ্ঞেস করেন, বকুলের সঙ্গে গল্প করেন, নতুন বই লেখার জন্য আশীর্বাদ করেন—এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?

আমি বিশ্বাস করি, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সাহিত্য। বইয়ের পাতায় লেখা শব্দের চেয়েও অনেক সময় জীবনের বাস্তব স্মৃতিগুলো বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সেই স্মৃতিগুলোই সময়ের সঙ্গে ইতিহাসে রূপ নেয়।

‘সুনীল থেকে সাদাত’ বইটি লিখতে বসলে শুধু নামকরা লেখকদের কথা থাকবে না; থাকবে তাঁদের মানবিক মুখ, সহজ জীবন, হাসি-কান্না, আড্ডা, অতিথিপরায়ণতা, বন্ধুত্ব এবং প্রবাসের এক টুকরো বাংলা। থাকবে ফ্রাঙ্কফুর্টের সেই বাড়ির গল্প, যেখানে বছরের পর বছর ধরে দুই বাংলার সাহিত্যিকদের পদচারণায় এক অনন্য সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরি হয়েছে।

আজ স্বাতী বৌদির ফোন যেন আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিল—অসমাপ্ত কাজ দ্রুত শেষ করার সময় এসেছে। স্মৃতিগুলো যতদিন জীবন্ত, ততদিনই সেগুলোকে শব্দে ধরে রাখা জরুরি। কারণ মানুষ একদিন চলে যায়, কিন্তু স্মৃতি থেকে যায়; আর সেই স্মৃতিকে যদি যত্ন করে লেখা যায়, তবে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান ইতিহাস হয়ে ওঠে।

স্বাতী বৌদির আশীর্বাদ, সাদাত হোসাইনের উৎসাহ এবং দীর্ঘ সাহিত্য-সাংস্কৃতিক পথচলার অসংখ্য স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে আমি নতুন উদ্যমে ‘সুনীল থেকে সাদাত’ বইটির কাজ এগিয়ে নিতে চাই। আমার বিশ্বাস, এই বই কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা হবে না; বরং দুই বাংলার সাহিত্যিক সম্পর্ক, প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির বিকাশ এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের গভীর আত্মিক বন্ধনের এক আন্তরিক দলিল হয়ে থাকবে।

হাবিব বাবুল , প্রধান সম্পাদক , শুদ্ধস্বর ডটকম ।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.