রাজধানী ঢাকা বাংলাদেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র। কিন্তু রাজধানীর ঠিক পাশেই অবস্থিত ঢাকা জেলার বাস্তবতা ভিন্ন এক গল্প বলে। দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যার চাপ এবং অপরিকল্পিত সম্প্রসারণের ফলে জেলার অনেক অংশ আজও মৌলিক নাগরিক অবকাঠামো থেকে বঞ্চিত। রাজধানীর সুবিধা চোখের সামনে থাকলেও সেই সুবিধার বড় অংশ পৌঁছায়নি জেলার সাধারণ মানুষের কাছে।
সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর রায়ের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় উঠে আসে ঢাকা জেলার উন্নয়ন নিয়ে তাঁর বিস্তৃত চিন্তাভাবনা। আলোচনার বিষয়টি তিনিই উত্থাপন করেন। তিনি মনে করেন, দেশের উন্নয়ন নিয়ে যখন জাতীয় পরিকল্পনা করা হয়, তখন ঢাকা জেলা একটি পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে যথাযথ গুরুত্ব পায় না। অথচ এই জেলার কৌশলগত গুরুত্ব দেশের অন্য অনেক জেলার তুলনায় বেশি।
আমি দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকায় ঢাকা জেলার পরিবর্তন খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়নি। তবে দূর থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—রাজধানী ঢাকা যত বেড়েছে, ঢাকা জেলার পরিকল্পিত উন্নয়ন সেই গতিতে এগোয়নি।
গয়েশ্বর রায়ের বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো—ঢাকা জেলা এখনও একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জেলা নয়।
একটি জেলার জন্য যেসব মৌলিক অবকাঠামো অপরিহার্য, তার অনেকগুলোরই অভাব রয়েছে। আধুনিক জেলা হাসপাতাল নেই, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নেই, আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া কমপ্লেক্স নেই, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নেই, পর্যাপ্ত উন্মুক্ত খেলার মাঠ নেই। দ্রুত গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নাগরিক সেবা সম্প্রসারিত হয়নি।
গয়েশ্বর রায় জানান, তিনি নিয়মিত নাগরিক সভার আয়োজন করছেন। সেখানে সাধারণ মানুষ সরাসরি তাদের সমস্যার কথা বলছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, উন্নয়নের প্রকৃত পরিকল্পনা জনগণের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব চাহিদা থেকেই তৈরি হওয়া উচিত। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
ঢাকা জেলার প্রধান সংকট
বর্তমানে ঢাকা জেলার সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—
- অপরিকল্পিত নগরায়ণ।
- তীব্র যানজট ও দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা।
- উন্নত সরকারি স্বাস্থ্যসেবার অভাব।
- উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা।
- খেলাধুলা ও সংস্কৃতির জন্য অবকাঠামোর ঘাটতি।
- নদী দখল ও পরিবেশ দূষণ।
- জলাবদ্ধতা ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা।
- কর্মসংস্থানের পরিকল্পিত বিস্তারের অভাব।
এসব সমস্যা শুধু নাগরিক জীবনকেই দুর্বিষহ করছে না; ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ঢাকা জেলার জন্য কী প্রয়োজন?
যদি সত্যিই ঢাকা জেলাকে একটি আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জেলায় রূপান্তর করতে হয়, তাহলে সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই।
প্রথমত, একটি এক হাজার শয্যার আধুনিক জেলা হাসপাতাল এবং হৃদরোগ, ক্যানসার, কিডনি ও ট্রমা চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত মেডিকেল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও ব্যবসা শিক্ষার সুযোগ থাকবে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানের জেলা স্টেডিয়াম, ইনডোর স্পোর্টস কমপ্লেক্স এবং যুব উন্নয়ন কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে, যাতে নতুন প্রজন্মের বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
চতুর্থত, কেরানীগঞ্জ, নবাবগঞ্জ ও দোহারকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল, তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।
পঞ্চমত, বুড়িগঙ্গা নদীকে পুনরুজ্জীবিত করে নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি, পর্যটন, জলপথ পরিবহন এবং পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
ষষ্ঠত, জেলা পর্যায়ে একটি আধুনিক সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স, পাবলিক লাইব্রেরি, জাদুঘর ও গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা উচিত, যাতে সাংস্কৃতিক বিকাশও উন্নয়নের অংশ হয়।
ঢাকা জেলা মাস্টারপ্ল্যান–২০৫০
গয়েশ্বর রায়ের চিন্তাভাবনা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
সরকার চাইলে “ঢাকা জেলা মাস্টারপ্ল্যান–২০৫০” প্রণয়ন করতে পারে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হতে পারে—
- পরিকল্পিত নগরায়ণ।
- আধুনিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অবকাঠামো।
- পরিবেশ সংরক্ষণ।
- নদী পুনরুদ্ধার।
- শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান।
- স্মার্ট প্রশাসন।
- ডিজিটাল নাগরিক সেবা।
- জলবায়ু সহনশীল নগর পরিকল্পনা।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে রাজধানীর আশপাশের জেলাগুলোকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে রাজধানীর ওপর চাপ কমেছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশেও সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
কেরানীগঞ্জ: সম্ভাবনার নতুন কেন্দ্র
কেরানীগঞ্জ আজ আর শুধুমাত্র রাজধানীর পাশের একটি উপজেলা নয়। এটি ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক অঞ্চল।
সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এখানে গড়ে উঠতে পারে—
- আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টার।
- নদীকেন্দ্রিক পর্যটন।
- তথ্যপ্রযুক্তি ও স্টার্টআপ হাব।
- আধুনিক লজিস্টিকস সিটি।
- রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চল।
- পরিবেশবান্ধব আবাসন প্রকল্প।
এসব বাস্তবায়িত হলে শুধু কেরানীগঞ্জ নয়, পুরো ঢাকা জেলার অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।
রাজনৈতিক সদিচ্ছাই সবচেয়ে বড় শক্তি
উন্নয়ন কোনো রাজনৈতিক দলের একার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং জনগণের অধিকার।
যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, ঢাকা জেলার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দল, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ এবং নাগরিক সমাজ—সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
গয়েশ্বর রায়ের সঙ্গে আলাপচারিতায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—তিনি ঢাকা জেলাকে একটি আধুনিক, পরিকল্পিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জেলায় রূপান্তরিত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং নাগরিকদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সেই ভাবনাকে এগিয়ে নিতে চান।
রাজধানীর পাশের জেলা হয়েও যদি মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা না যায়, তবে সেটি শুধু একটি জেলার ব্যর্থতা নয়; জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনারও সীমাবদ্ধতা।
আজ সময় এসেছে ঢাকা জেলাকে নতুনভাবে ভাবার। এমন একটি জেলা গড়ে তোলার, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, পরিবেশ ও কর্মসংস্থান—সবকিছুই একটি সমন্বিত উন্নয়ন কাঠামোর অংশ হবে।
ঢাকা জেলা কেবল রাজধানীর ছায়া হয়ে থাকবে না; বরং নিজস্ব শক্তি, সক্ষমতা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি আধুনিক, স্মার্ট এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ জেলার মডেল হয়ে উঠবে—এটাই হোক আগামী দিনের অঙ্গীকার।
লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম ।

