দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় এমন খুব কম আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সম্পর্কের মতো এত দীর্ঘ, এত গভীর এবং এত বহুমাত্রিক। ১৯৪৮ সালে ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ওয়াশিংটন দেশটির নিরাপত্তাকে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের কৌশলগত স্বার্থের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছে। সামরিক সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জাতিসংঘে কূটনৈতিক সুরক্ষা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র ছিল ইজরায়েলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র। ফলে যখনই শোনা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইজরায়েলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের কথা ভাবছেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—তাহলে কি ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এই জোটে সত্যিই ফাটল ধরছে?
প্রশ্নটি যতটা আবেগের, তার চেয়েও বেশি ভূরাজনীতির। কারণ রাষ্ট্রের বন্ধুত্ব কখনো স্থায়ী নয়; স্থায়ী হয় স্বার্থ। আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই পুরোনো সত্যটি আজ আবারও নতুন করে সামনে এসেছে।
ইজরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সম্ভবত তাঁর চার দশকের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন। দুর্নীতির মামলাগুলো এখনো তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর ঝুলছে। ক্ষমতা হারালে সেই মামলাগুলোর আইনি পরিণতি আরও কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী নির্বাচনে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান আগের মতো শক্তিশালী নাও থাকতে পারে। ফলে তাঁর সামনে দুটি যুদ্ধ—একটি দেশের নিরাপত্তা নিয়ে, অন্যটি নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য।
ইতিহাস বলে, নেতানিয়াহু যখনই অভ্যন্তরীণ চাপে পড়েছেন, তখনই তিনি নিরাপত্তা ইস্যুকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। কারণ ইজরায়েলের রাজনীতিতে জাতীয় নিরাপত্তা এমন একটি বিষয়, যা ভোটারদের মনোভাব দ্রুত বদলে দিতে পারে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইরান, গাজা কিংবা দক্ষিণ লেবাননকে ঘিরে তাঁর কঠোর অবস্থানের পেছনে কেবল নিরাপত্তা নয়, রাজনৈতিক হিসাবও কাজ করছে।
কিন্তু এখানেই এসে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনেকেই ইজরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বন্ধুসুলভ মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখেন। তাঁর প্রথম মেয়াদে জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি, মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর, গোলান মালভূমি নিয়ে অবস্থান এবং একাধিক আরব দেশের সঙ্গে ইজরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ—সবই নেতানিয়াহুর জন্য বড় রাজনৈতিক অর্জন ছিল।
কিন্তু ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি দিকও রয়েছে। তিনি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পছন্দ করেন না। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে “আমেরিকা ফার্স্ট”—অর্থাৎ এমন কোনো সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়ানো যাবে না, যা সরাসরি মার্কিন স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাঁর সমর্থকগোষ্ঠীর একটি বড় অংশও বিদেশে ব্যয়বহুল সামরিক সম্পৃক্ততার বিরোধী।
এখানেই নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের দূরত্ব বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইজরায়েলের সরাসরি সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে এক নতুন অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়। সংঘাত সাময়িকভাবে থেমে গেলেও উত্তেজনা কমেনি। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে ছিলেন। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন একই সময়ে তেহরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার পথ খুঁজছিল। সেই আলোচনায় দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, লেবাননে ইজরায়েলি সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে বৃহত্তর সমঝোতা কঠিন হবে। অর্থাৎ ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক লক্ষ্য এবং তেলআবিবের সামরিক লক্ষ্য একই পথে হাঁটছিল না।
এই পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ হওয়াই স্বাভাবিক।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে একটি কথিত টেলিফোন আলাপের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্প অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ভাষায় নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানান এবং তাঁর রাজনৈতিক আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন। এমনকি তাঁকে “উন্মাদ” বলেও উল্লেখ করেছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। যদিও এ ধরনের ফাঁস হওয়া কথোপকথনের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন, তবু হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে প্রকাশিত তথ্য পুরোপুরি অস্বীকার না করায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
যদি এই প্রতিবেদনগুলোর সারবত্তা সত্য হয়, তাহলে এটি কেবল দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতি নয়; বরং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারে পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত হতে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সম্পর্ক কোনো একক প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে গড়ে ওঠেনি। এটি সামরিক, গোয়েন্দা, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বহুস্তরীয় কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। মার্কিন কংগ্রেসে এখনো ইজরায়েলের প্রতি শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্প, গোয়েন্দা সংস্থা এবং কৌশলগত নিরাপত্তা পরিকল্পনার সঙ্গেও ইজরায়েলের সম্পর্ক গভীরভাবে জড়িত।
অর্থাৎ ট্রাম্প যদি নেতানিয়াহুর ওপর বিরক্তও হন, তার অর্থ এই নয় যে ওয়াশিংটন রাতারাতি ইজরায়েলকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে পরিত্যাগ করবে।
বরং বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন মধ্যপ্রাচ্যে তার অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করছে। দীর্ঘ যুদ্ধ, বিপুল সামরিক ব্যয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের উত্থান—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন এখন প্রতিটি সংঘাতকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে।
আজকের যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি যুদ্ধে নিজেকে জড়াতে আগ্রহী নয়। তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, যাতে তা পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ না নেয়।
এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু ইজরায়েল নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে পড়বে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। দীর্ঘদিন ধরে ইজরায়েলকে সমর্থন করা ছিল প্রায় সর্বদলীয় ঐকমত্যের বিষয়। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশ গাজা ও পশ্চিম তীরের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে আরও উচ্চকণ্ঠ হয়েছে। একই সময়ে রিপাবলিকান পার্টির “আমেরিকা ফার্স্ট” অংশ বিদেশে বিপুল সামরিক ব্যয়ের বিরোধিতা করছে।
দুই ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান হলেও একটি বিষয়ে মিল রয়েছে—মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে সীমাহীনভাবে জড়িয়ে রাখার পক্ষে আগের মতো সর্বসম্মত সমর্থন আর নেই।
এটি ইজরায়েলের জন্য নতুন বাস্তবতা।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সমস্যাও এখানেই। তিনি যদি যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মেনে সামরিক অভিযান সীমিত করেন, তাহলে তাঁর ডানপন্থী জোট ক্ষুব্ধ হতে পারে। আবার যদি তিনি যুদ্ধের পরিধি বাড়ান, তাহলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়বে। অর্থাৎ তিনি এমন এক রাজনৈতিক সমীকরণে আটকে গেছেন, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তই ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের মধ্যে মতবিরোধ নতুন নয়। অতীতে বসতি সম্প্রসারণ, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন সামরিক অভিযানের প্রশ্নে দুই দেশের সরকার বহুবার মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কৌশলগত স্বার্থই সম্পর্ককে টিকিয়ে রেখেছে।
এবারও সম্ভবত তার ব্যতিক্রম হবে না।
তবে একটি পরিবর্তন ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন এখন আগের তুলনায় আরও বেশি শর্তসাপেক্ষ হয়ে উঠছে। ওয়াশিংটন চাইছে, ইজরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক; কিন্তু সেই নিরাপত্তা যেন এমন কোনো বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের জন্ম না দেয়, যা মার্কিন স্বার্থকেই বিপদের মুখে ফেলে।
এ কারণেই আজকের মতবিরোধকে সম্পর্কের সমাপ্তি না বলে সম্পর্কের পুনর্নির্ধারণ বলা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।
সবশেষে বলা যায়, আমেরিকা এখনো ইজরায়েলের হাত ছেড়ে দেয়নি। তবে সেই হাত ধরে চলার ধরন বদলাচ্ছে। নিঃশর্ত সমর্থনের জায়গায় ধীরে ধীরে স্থান নিচ্ছে হিসাব-নিকাশ, কৌশল এবং পারস্পরিক স্বার্থের কঠোর মূল্যায়ন। নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা, লেবাননের পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা—সবকিছু মিলিয়ে আগামী কয়েক মাস এই সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে।
সময়ের দাবি হলো আবেগ নয়, বাস্তবতাকে দেখা। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্র চিরস্থায়ী বন্ধু নয়, আবার চিরস্থায়ী শত্রুও নয়। চিরস্থায়ী থাকে কেবল জাতীয় স্বার্থ। আর সেই স্বার্থের নতুন সমীকরণই আজ যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল সম্পর্ককে এক নতুন মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে।
হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

