আপনি কি জানেন, যখন আপনি হাঁচি দেন, তখন নাক দিয়ে প্রায় ১ লাখ জীবাণু ঘণ্টায় আনুমানিক ১০০ মাইল বেগে বাইরে বেরিয়ে আসে? তাই জনসমক্ষে মানুষ কেন এই বিরক্তিকর ‘আ…চ্ছো’ শব্দটিকে চেপে রাখার চেষ্টা করে, তা সহজেই বোঝা যায়। তবে আপনি নাক চেপে ধরে কিংবা মুখ বন্ধ করে—যেভাবেই হাঁচি আটকে রাখার চেষ্টা করুন না কেন—তা মোটেও ভালো বুদ্ধি নয় বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব আরকানসাস ফর মেডিকেল সায়েন্সেস (ইউএএমএস)-এর অডিওলজিস্ট ডা. অ্যালিসন ক্যাটলেট উডাল।
বিজ্ঞানীরা বলেন, হাঁচি মূলত আমাদের নাকের ভেতরের পরিবেশকে আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে (রিসেট করতে) সাহায্য করে।
নাকের ভেতরে ব্যাকটেরিয়া, ময়লা, ধূলিকণা, পরাগরেণু কিংবা ধোঁয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো উপাদানের উপস্থিতি টের পেলে আমাদের মস্তিষ্ক হাঁচি তৈরি করে। এর ফলে প্রথমে নাকের ভেতর একটু সুরসুরি বা অস্বস্তি বোধ হয় এবং এর পরপরই হাঁচি চলে আসে।
জনাকীর্ণ কোনো জায়গায়, অন্য কারও সঙ্গে কথা বলার সময় কিংবা অসময়ে হাঁচি এলে তা আটকে রাখার একটা প্রবণতা অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। কিন্তু গবেষণা বলছে, হাঁচি চেপে রাখা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এবং কখনো কখনো এর ফলে গুরুতর জটিলতা তৈরি হয়।
হাঁচি আটকে রাখার ক্ষতি
যখন আপনি নাকের ভেতর এক ধরনের সুরসুরি অনুভব করেন, তখন বুঝে নেবেন যে ফিরে যাওয়ার আর কোনো পথ নেই। মিটিংয়ে থাকা অবস্থায়, ধর্মীয় উপাসনালয়ে কিংবা হাতে কোনো জিনিস থাকার কারণে মুখ ঢাকতে না পারার মতো সবচেয়ে অস্বস্তিকর মুহূর্তেও হঠাৎ হাঁচি চলে আসতে পারে। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, হাঁচিকে বাইরে আসতে দেওয়াই শ্রেয়।
২০১৬ সালের একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা হাঁচি দেওয়ার সময় একজন নারীর শ্বাসনালীতে প্রতি বর্গইঞ্চিতে ১ পাউন্ড-বল (1 psi) চাপ পরিমাপ করেছিলেন। অথচ কঠোর পরিশ্রম বা ব্যায়ামের সময় মানুষ যখন খুব জোরে শ্বাস ছাড়ে, তখন শ্বাসনালীর চাপ এর চেয়ে অনেক কম (মাত্র ০.০৩ psi) থাকে।
এ ছাড়া হাঁচি আটকে রাখলে শ্বসনতন্ত্রের ভেতরের চাপ স্বাভাবিক হাঁচির চেয়ে প্রায় ৫ থেকে ২৪ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অতিরিক্ত চাপ শরীরের ভেতরে আটকে রাখলে গুরুতর ইনজুরি হতে পারে।
ডা. উডাল বলেন , ‘হাঁচি দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ফুসফুসে প্রচুর বায়ুচাপ তৈরি হয়, যা নাকের ভেতরে থাকা অস্বস্তিকর উপাদানগুলোকে পরিষ্কার করতে নাক দিয়ে তীব্র বেগে বেরিয়ে আসার প্রস্তুতি নেয়। এখন আপনি যদি নাক চেপে ধরে বা মুখ বন্ধ করে সেই হাঁচি আটকে রাখেন, তবে এই উচ্চচাপের বাতাস উল্টো দিকে ধাক্কা দিয়ে ইউস্টেশিয়ান টিউব হয়ে কানের মধ্যবর্তী অংশে প্রবেশ করতে পারে।’
জীবাণু ছড়ানো বন্ধ করার জন্য হাঁচি আটকে রাখার চেষ্টা করাটা স্বাভাবিক। কিন্তু আপনার এই ‘আ…চ্ছো’ শব্দটিকে চেপে রাখা উপকারের চেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারে। অ্যালার্জি এবং ক্লিনিক্যাল ইমিউনোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. ডিভন প্রেস্টন বলেন, ‘হাঁচি সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখলেও, এটি আপনার সাইনাস থেকে অস্বস্তিকর উপাদান, অ্যালার্জেন এবং অন্যান্য বাহ্যিক ময়লা দূর করার জন্যও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আমরা যদি হাঁচি না দিতাম, তবে আমাদের শরীর ক্ষতিকারক পদার্থগুলোকে সাইনাস বা ফুসফুসে প্রবেশ করার সুযোগ দিত।’
হাঁচি আটকে রাখলে যেসব সমস্যা দেখা দেয়
কানের পর্দার ক্ষতি: হাঁচি আটকে রাখলে যে চাপের সৃষ্টি হয়, তা বাতাস এবং শ্লেষ্মাকে (মিউকাস) জোর করে আপনার ইউস্টেশিয়ান টিউবে পাঠিয়ে দিতে পারে—এই টিউব নাকের পেছনের অংশের সঙ্গে কানের মাঝখানের সংযোগ রক্ষা করে। সাধারণত খাবার গেলার বা হাঁচি দেওয়ার সময় এই টিউবগুলো খুলে যায়, যাতে কানে বায়ুচাপ বা তরল জমতে না পারে। কিন্তু হাঁচি আটকে রাখলে তৈরি হওয়া বাড়তি চাপ কানের পর্দার ক্ষতি করতে পারে বা কানে ইনফেকশন (সংক্রমণ) তৈরি করতে পারে। ডা. প্রেস্টন সতর্ক করে বলেন, ‘জীবাণুযুক্ত মিউকাস ইউস্টেশিয়ান টিউবে ফেরত পাঠালে কানের মধ্যবর্তী অংশে সংক্রমণ হতে পারে।’ আর এই সংক্রমণ থেকে কানের পর্দায় ছিদ্র পর্যন্ত হতে পারে, যা পরবর্তীতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ঠিক করতে হয়।
সাইনাসের সমস্যা: হাঁচি হলো শরীর থেকে অবাঞ্ছিত উপাদান দূর করার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। হাঁচি চেপে রাখলে শ্লেষ্মা এবং ক্ষতিকারক কণাগুলো উল্টো সাইনাসে ফিরে যেতে পারে, যার ফলে সাইনাসে ব্যথা, নাক বন্ধ হওয়া এবং এমনকি সাইনাস ইনফেকশনও হতে পারে।
চোখের ভেতরের চাপ বৃদ্ধি: হাঁচি আটকে রাখলে সাময়িকভাবে ‘ইন্ট্রাওকুলার প্রেশার’ (চোখের ভেতরের চাপ) বেড়ে যেতে পারে। সাধারণ মানুষের জন্য এটি ক্ষতিকারক না হলেও, গ্লুকোমার মতো চোখের সমস্যা যাদের রয়েছে, তাদের জন্য এটি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
রক্তনালী ছিঁড়ে যাওয়া: চরম কিছু ক্ষেত্রে, জোর করে হাঁচি আটকে রাখলে মাথা বা ঘাড়ের রক্তনালী ছিঁড়ে যেতে পারে। কারণ হাঁচি আটকে রাখলে যে চাপটি নাক ও মুখ দিয়ে বের হওয়ার কথা ছিল, তা আপনার শ্বসনতন্ত্রের ভেতরেই আটকে পড়ে।
পাঁজর ভেঙে যাওয়া: হাঁচি দেওয়ার কারণে পাঁজর ভেঙে যাওয়ার ঘটনা (বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে) মাঝেমধ্যে শোনা যায়। তবে হাঁচি আটকে রাখলেও ফুসফুসে উচ্চচাপের বাতাস তীব্র শক্তিতে আঘাত করায় পাঁজর ভেঙে যেতে পারে।
হাঁচি আটকে রাখলে কি হার্ট অ্যাটাক কিংবা মৃত্যু হতে পারে ?
হাঁচি দেওয়া বা আটকে রাখা—কোনোটির কারণেই হার্ট ব্লক বা বন্ধ হয়ে যায় না। এটি সাময়িকভাবে আপনার হৃদস্পন্দনকে প্রভাবিত করতে পারে, তবে হার্ট অ্যাটাক ঘটায় না। আবার হাঁচি আটকে রাখার কারণে সরাসরি মৃত্যুর কোনো সুনির্দিষ্ট রেকর্ড সচরাচর দেখা না গেলেও, তাত্ত্বিকভাবে এর কারণে মৃত্যু হওয়া অসম্ভব নয়। কারণ, হাঁচি আটকে রাখার ফলে মস্তিষ্কের অ্যানিউরিজম ফেটে যাওয়া, গলার ভেতরের অংশের ঝিল্লি ছিঁড়ে যাওয়া বা ফুসফুস অকেজো হয়ে যাওয়ার মতো যে সমস্ত গুরুতর সমস্যা হয়। এর মধ্যে ব্রেন অ্যানিউরিজম ফেটে যাওয়ার ঘটনায় প্রায় ৪০ শতাংশান্তিক ক্ষেত্রেই রোগীর মৃত্যুঝুঁকি থাকে।
হাঁচি কমানোর কি কোনো উপায় আছে?
ধূলিকণা, পরাগরেণু বা পোষা প্রাণীর লোমের কারণে হাঁচি এলে তা থামানো বেশ কঠিন হতে পারে। তবে হাঁচি কমানোর জন্য নিচের কাজগুলো করলে ভালো ফল পাওয়া যায়:
উৎস থেকে দূরে থাকুন: যেসব কারণে আপনার অ্যালার্জি বা হাঁচি হয় (যেমন: কড়া গন্ধ বা ধূলিকণা), সেগুলো চিহ্নিত করুন এবং এড়িয়ে চলুন।
পরিবেশ পরিবর্তন করুন: কোনো ঘরে থাকা অবস্থায় হাঁচির উদ্রেক হলে রুম পরিবর্তন করুন বা তাজা বাতাসের জন্য বাইরে যান।
নেজাল স্প্রে ব্যবহার করুন: চিকিৎসকের পরামর্শে স্যালাইন স্প্রে-র মতো ওভার-দ্য-কাউন্টার নেজাল স্প্রে ব্যবহার করতে পারেন। এটি নাকের ভেতরটা আর্দ্র রাখে এবং অস্বস্তি কমিয়ে হাঁচির ফ্রিকোয়েন্সি কমায়।
অ্যান্টিহিস্টামিন গ্রহণ: অ্যালার্জির কারণে হাঁচি হলে অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ সাহায্য করতে পারে। এগুলো হিস্টামিন নামক রাসায়নিকের নিঃসরণ বন্ধ করে, যা অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন: প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার বা পানি পান করুন, যা নাকের পথকে শুষ্ক হতে দেয় না এবং হাঁচি কমায়।
হিউমিডিফায়ার ব্যবহার: ঘরে হিউমিডিফায়ার (বৈদ্যুতিক যন্ত্র, যা বাতাসে জলীয় বাষ্প ছড়িয়ে ঘরের আর্দ্রতা বাড়ায়) ব্যবহার করে বাতাসের আর্দ্রতা বাড়ালে নাকের শুষ্কতা দূর হয় এবং হাঁচির সম্ভাবনা কমে।
শ্বাসের কৌশল: গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নেওয়া, কিংবা গুনগুন করে গান গাওয়ার মাধ্যমেও শরীরকে শান্ত করে হাঁচির বেগ কিছুটা কমানো সম্ভব।
নিয়মে মেনে হাঁচি দেওয়া: যেহেতু আমরা সবাই শ্বাসকষ্টজনিত রোগ বা জীবাণু ছড়ানো বন্ধ করতে সচেতন, তাই জোরেশোরে হাঁচি দিতে ভয় লাগতে পারে। কিন্তু শরীরকে তার কাজ করা থেকে বিরত রাখবেন না। শুধু নিশ্চিত করুন যে হাঁচি দেওয়ার সময় একটি টিস্যু দিয়ে অথবা কনুইয়ের ভাঁজে মুখ ও নাক ঢেকে রাখছেন। এ ছাড়া, হাঁচি শেষ হওয়ার পর হাত ভালোমতো ধুয়ে নিন এবং আশেপাশের কোনো টেবিলে বা সারফেসে ড্রপলেট (থু থু) পড়লে তা মুছে পরিষ্কার করে ফেলুন।
চিকিৎসা বিজ্ঞান ও বিশেষজ্ঞদের মতে, লোকলজ্জার ভয়ে বা জীবাণু ছড়ানো বন্ধ করার জন্য হাঁচি আটকে রাখার চেষ্টা উপকারের চেয়ে শরীরের ক্ষতিই বেশি করে। অধিকাংশ সময় হাঁচি আটকে রাখলে বড়জোর মাথা ব্যথা বা কানে অস্বস্তি হতে পারে, তবে অতিরিক্ত চাপের কারণে এটি ফুসফুস, কানের পর্দা কিংবা রক্তনালীর মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। তাই হাঁচি চেপে না রেখে সঠিক নিয়মে হাঁচি দেওয়া এবং যেসব কারণে হাঁচি আসে তা এড়িয়ে চলাই স্বাস্থ্যসম্মত।

