নির্মলেন্দু গুণ বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার অন্যতম শক্তিমান ও প্রভাবশালী কবি। তার কবিতায় একদিকে যেমন প্রেম, মানবিক অনুভূতি ও ব্যক্তিগত আবেগ গভীরভাবে প্রকাশ পায়, অন্যদিকে তেমনি সমাজের বৈষম্য, শ্রেণীসংগ্রাম এবং স্বৈরাচারবিরোধী প্রতিবাদ স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। তিনি বাংলা সাহিত্যে এমন এক কণ্ঠস্বর, যিনি সময় ও সমাজের সঙ্গে সরাসরি সংলাপ করেছেন তার লেখার মাধ্যমে।
কবি নির্মলেন্দু গুণ ১৯৪৫ সালের ২১ জুন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল অঞ্চলের নেত্রকোণার বারহাট্টার কাশবন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্ণ নাম নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণ চৌধুরী। ডাকনাম ছিল রতন। পিতার নাম সুখেন্দু প্রকাশ গুণ এবং মাতার নাম বীণাপাণি। শৈশবে মায়ের মৃ*ত্যু তার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে, যা পরবর্তীতে তার কবিতায় মানবিক বেদনা ও আবেগের ছাপ রেখে যায়।
প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় বারহাট্টার করোনেশন কৃষ্ণপ্রসাদ ইন্সটিটিউটে। তিনি ১৯৬২ সালে মেট্রিক এবং ১৯৬৪ সালে আই.এস.সি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তার শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হয়।
নির্মলেন্দু গুণের সাহিত্যজীবন শুরু হয় তরুণ বয়সেই। ১৯৭০ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ প্রকাশিত হলে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত বিখ্যাত কবিতা ‘হু*লিয়া’ তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। কবিতাটি পরবর্তীতে চলচ্চিত্রেও রূপান্তরিত হয়।
তার কবিতায় ব্যক্তিগত প্রেম ও রাজনৈতিক চেতনা একসঙ্গে প্রবাহিত হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, কবিতা শুধু সৌন্দর্যের প্রকাশ নয়; বরং সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম।
নির্মলেন্দু গুণের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সরল ভাষা, তীব্র আবেগ এবং রাজনৈতিক সচেতনতা।
স্বাধীনতার পূর্বে নির্মলেন্দু গুণ সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় তার কবিতা ও লেখা জনমানুষের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানসহ সমকালীন রাজনৈতিক ঘটনাবলিকে সাহিত্যে সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
নির্মলেন্দু গুণের অসংখ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—প্রেমাংশুর রক্ত চাই (১৯৭০), না প্রেমিক না বিপ্লবী, চাষাভুষার কাব্য, নিরঞ্জনের পৃথিবী, ধাবমান হরিণের দ্যুতি ও আমি সময়কে জন্মাতে দেখেছি।
এছাড়া তিনি আত্মজীবনী, ভ্রমণকাহিনী এবং গদ্য রচনাতেও দক্ষতা দেখিয়েছেন।
তার সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বহু পুরস্কার অর্জন করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮২), একুশে পদক (২০০১) ও স্বাধীনতা পুরস্কার (২০১৬)।
তার জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধা।

