অভিমানী এক স্বপ্নবাজের প্রস্থান : শফি আহমেদকে মনে পড়ে

গতকাল ছিল নব্বই দশকের ছাত্রনেতা, কলামিস্ট ও প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ শফি আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকী। দিনটি চলে গেল গভীর বিষণ্ণতায়। অনেকবার ভেবেছি তাকে নিয়ে কিছু লিখবো, কিন্তু মন সায় দেয়নি। কিছু কিছু মানুষের চলে যাওয়া কেবল একজন মানুষের মৃত্যু নয়, বরং একটি সময়, একটি বিশ্বাস, একটি মানবিক রাজনৈতিক চেতনার নিঃশব্দ বিদায়। শফি আহমেদ ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।

শফি আহমেদ ছিলেন শুদ্ধস্বর ডটকম পরিবারের একজন আপনজন। তিনি নিয়মিত লেখা পাঠাতেন। লেখার বিষয়ে তার ভেতরে কোনো অহংকার ছিল না, বরং এক ধরনের নির্মল আন্তরিকতা ছিল। আমাকে বলেছিলেন, “ইচ্ছে মতো সম্পাদনা করবেন।” একজন লেখকের জন্য এই বিশ্বাস খুব বড় বিষয়। সেই বিশ্বাসের জায়গা থেকেই আমাদের সম্পর্কটা ধীরে ধীরে কেবল লেখালেখির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; গড়ে উঠেছিল এক ব্যক্তিগত মানবিক সম্পর্ক।

মাঝে মাঝেই তিনি ফোন করতেন। তবে ফোন করার আগে মেসেঞ্জারে জানিয়ে দিতেন— “কথা বলতে চাই।” এই ছোট্ট ভদ্রতাবোধ আজকাল খুব কম মানুষের মধ্যে দেখা যায়। তার সঙ্গে কথা বললে মনে হতো তিনি এখনও স্বপ্ন দেখেন, এখনও বিশ্বাস করেন এই দেশ একদিন মানুষের হবে, রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জায়গায় ফিরে যাবে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হতো। হতাশার কথাও বলতেন, কিন্তু আশাহীনতার কথা কখনও বলতেন না।

জীবনের এক পর্যায়ে তিনি এমন একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, যেখানে তার অনেক কর্মী ও অনুসারী উচ্চপদে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, শফি আহমেদ নিজেই সেখানে অবহেলিত ছিলেন। রাজনীতির চিরাচরিত ক্ষমতার হিসাব তাকে মূল্যায়ন করেনি। অথচ তিনি ছিলেন আদর্শ, সততা ও রাজনৈতিক সৌন্দর্যের একজন ধারক। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অবহেলা তাকে কখনও তিক্ত করেনি। তার মধ্যে কোনো প্রতিহিংসা ছিল না, কোনো হতাশার বিষাক্ত প্রকাশও ছিল না। তিনি মানুষ হিসেবেই সব মহলে ভালোবাসা পেয়েছিলেন। রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করতো।

এটাই ছিল শফি আহমেদের সবচেয়ে বড় পরিচয়— তিনি আগে মানুষ ছিলেন, পরে রাজনীতিক।

তার মৃত্যু সংবাদ আমার কাছে ছিল একেবারেই ইন্দ্রপতনের মতো। কারণ তিনি অসুস্থ ছিলেন না। এমন হঠাৎ চলে যাবেন, তা কখনও ভাবিনি।  ঘুমের মধ্যেই তিনি ইহজগৎ ত্যাগ করেছেন। আমার বারবার মনে হয়েছে, তিনি যেন অনেক অভিমান নিয়েই চলে গেলেন। এই দেশ তাকে তার প্রাপ্য সম্মান দেয়নি, রাজনীতি তাকে তার যোগ্য অবস্থান দেয়নি, সময় তাকে বুঝতে পারেনি।

তিনি যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন, সেই বাংলাদেশ দেখে যেতে পারেননি। যে রাজনীতিকে মানবিক, প্রগতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক দেখতে চেয়েছিলেন, তার বাস্তব প্রতিফলন তিনি পাননি। হয়তো এই না পাওয়ার বেদনাই তাকে নীরবে ভেতর থেকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল। কিন্তু কখনও প্রকাশ্যে অভিযোগ করেননি। নিঃশব্দে নিজের বিশ্বাস আঁকড়ে ছিলেন।

আজ যখন তার কথা মনে পড়ে, তখন ভেতরে এক ধরনের শূন্যতা কাজ করে। মনে হয়, আমরা ধীরে ধীরে এমন মানুষদের হারিয়ে ফেলছি, যারা রাজনীতিকে ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের জন্য ভাবতেন। যারা লেখালেখিকে আত্মপ্রচার নয়, সমাজ বদলের হাতিয়ার মনে করতেন। যারা সম্পর্ককে স্বার্থ দিয়ে মাপতেন না।

শফি আহমেদ ছিলেন সেসব বিরল মানুষদের একজন।

তার সঙ্গে শেষ দিকের কথোপকথনগুলো আজও কানে বাজে। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, মানুষের প্রতি তার মমতা, সমাজ নিয়ে তার দুশ্চিন্তা— সবকিছুই এখন স্মৃতির অংশ। কখনও কখনও মনে হয়, কিছু মানুষ চলে গেলেও পুরোপুরি হারিয়ে যান না। তারা থেকে যান কথার মধ্যে, স্মৃতির মধ্যে, কিছু অপূর্ণ স্বপ্নের মধ্যে।

শফি আহমেদও তেমনভাবেই থেকে গেছেন।

তার মৃত্যুদিন এলেই মন ভার হয়ে আসে। বিষণ্ণতা যেন নীরবে মনকে অবশ করে দেয়। তখন মনে হয়, এই সমাজ সত্যিকারের সৎ ও স্বপ্নবান মানুষদের খুব কমই মূল্যায়ন করতে পারে। অথচ ইতিহাসের গভীরে তারাই থেকে যান সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে।

আমি সবসময় প্রার্থনা করি— পরপারে শফি আহমেদ ভালো থাকুন। যে শান্তি, যে সম্মান, যে স্বপ্ন তিনি এ পৃথিবীতে পুরোপুরি পাননি, স্রষ্টা যেন তাকে তার চেয়ে অনেক বেশি দিয়ে রাখেন।

মানুষ হিসেবে, লেখক হিসেবে এবং রাজনৈতিক চেতনার একজন সৎ বাহক হিসেবে শফি আহমেদ আমাদের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবেন দীর্ঘদিন।

— হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.