বাংলা সাহিত্যের বিস্তীর্ণ ভুবনে কিছু মানুষ আছেন, যাদের উপস্থিতি কেবল একজন লেখকের সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না; তারা হয়ে ওঠেন একেকটি প্রতিষ্ঠান, একেকটি সময়ের প্রতীক। সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন তেমনই একজন। তাকে বলা হতো “সব্যসাচী লেখক”— আর এই অভিধা তিনি শুধু অর্জনই করেননি, তার সৃজনশীলতার বহুমাত্রিক বিস্তারে তাকে যেন এ নামেই সবচেয়ে বেশি মানিয়ে যেত। কবিতা, উপন্যাস, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ, গান, চিত্রনাট্য— বাংলা ভাষার এমন খুব কম সাহিত্যিক আছেন, যিনি এত বিচিত্র মাধ্যমে সমান স্বাচ্ছন্দ্যে এবং সমান শক্তিতে কাজ করতে পেরেছেন।
আমার সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় । সেই সময় প্রবাসজীবনের ব্যস্ততার মাঝেও বইমেলা ছিল আমাদের জন্য এক বিশাল সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। বাংলা ভাষার লেখক, কবি, প্রকাশক এবং সংস্কৃতিসেবীদের পদচারণায় মেলার নির্দিষ্ট কিছু অংশ যেন ছোট্ট এক বাংলাদেশে পরিণত হতো। আমি তখনও তার অসংখ্য উপন্যাস ও গল্পের নিবিড় পাঠক। “নীল দংশন”, “খেলারাম খেলে যা”, “দেয়ালের দেশ”, “মার্জিনে মন্তব্য”, “অনুপম দিন”— এমন বহু রচনার মধ্য দিয়ে তিনি আমার সাহিত্যচেতনায় স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন।
তার লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের অন্তর্জগৎকে গভীর অথচ সহজ ভাষায় তুলে ধরার ক্ষমতা। তিনি শহর ও গ্রামের মানুষকে যেমন চিনতেন, তেমনি চিনতেন ক্ষমতা, প্রেম, নিঃসঙ্গতা, রাজনীতি এবং মানুষের ভেতরের অদৃশ্য দ্বন্দ্বকে। তার উপন্যাস পড়লে মনে হতো, তিনি যেন কেবল গল্প লিখছেন না— মানুষের আত্মার ভেতর দিয়ে হাঁটছেন।
কিন্তু সাহিত্যিক হিসেবে তার পরিচয়ই ছিল না একমাত্র পরিচয়। বাংলা চলচ্চিত্রের বহু স্মরণীয় গানের গীতিকার ছিলেন তিনি। আমাদের অতীতের বাংলা সিনেমার যে গানগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে, তার অনেকগুলোর পেছনে ছিল তার কলমের জাদু। একইসঙ্গে বহু চলচ্চিত্রে তিনি চিত্রনাট্য লিখেছেন। ভাষা ও দৃশ্যমানতার মধ্যে কীভাবে এক গভীর সম্পর্ক তৈরি করা যায়, সে বিষয়ে তার ছিল অসাধারণ দক্ষতা।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় প্রথম দেখা হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি এমন এক আচরণ করেছিলেন, যা আজও আমাকে বিস্মিত ও মুগ্ধ করে। তিনি আমাকে তার পছন্দের একটি বই কিনে দিতে বললেন। আমি কিছুটা অবাক হয়েছিলাম। হয়তো আমাদের সামাজিক সংস্কৃতিতে একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের কাছ থেকে এমন অনুরোধ শুনতে আমরা অভ্যস্ত নই। আমার বিস্ময় বুঝতে পেরে তিনি মৃদু হেসে বললেন, “এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমি বিদেশে গেলে আমার কিছু পছন্দ হলে, বিশেষ করে বই, আমি তা চেয়ে নেই।”
এই কথাটির মধ্যে আমি এক বিরল সরলতা খুঁজে পেয়েছিলাম। বড় মানুষদের মধ্যে যে শিশুসুলভ স্বাভাবিকতা থাকে, তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ ছিল এই আচরণ। কোনো অহংকার নেই, কোনো দূরত্ব নেই— বরং জ্ঞানের প্রতি এক অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং মানুষের সঙ্গে সহজ সম্পর্ক গড়ে তোলার এক আশ্চর্য ক্ষমতা।
আমি সানন্দে তাকে বইটি কিনে দিয়েছিলাম। আজ এত বছর পরও সেই মুহূর্তটি আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। কারণ, একজন মানুষকে তার সৃষ্টিকর্ম দিয়ে যেমন চেনা যায়, তেমনি চেনা যায় তার ছোট ছোট আচরণ দিয়েও।
সেই সময় আমি তার সম্পর্কে আরও কিছু বিষয় জানতাম। রংপুরের মানুষ হিসেবে তিনি সম্ভবত হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ এর প্রতি একধরনের সহানুভূতিশীল ছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদ একটি বিতর্কিত নাম হলেও, নগর নান্দনিকতার কিছু উদ্যোগে তিনি আগ্রহী ছিলেন— এবং সে জায়গায় সৈয়দ শামসুল হকের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে শোনা যায়।
ঢাকা শহরের বহু পরিচিত সড়ক ও স্থাপনার নান্দনিক নামকরণে তার ভূমিকার কথা আজও নানা মহলে আলোচিত হয়। “পান্থপথ”, “বিজয় সরণি”, “মুক্তি সরণি”, “দোয়েল চত্বর”— এই নামগুলোর মধ্যে কেবল ভৌগোলিক পরিচয় নেই; আছে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও কাব্যিক আবহ। শহরের রাস্তাঘাটের নামও যে মানুষের মনোজগতে প্রভাব ফেলে, শহরের চরিত্র নির্মাণ করে, সে বিষয়টি তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন।
“পান্থপথ” নামটির মধ্যেই যেন আছে যাত্রার সৌন্দর্য ও পথিকের ক্লান্তিহীন চলা। “বিজয় সরণি” আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে স্মরণ করিয়ে দেয়। “মুক্তি সরণি” নামটি উচ্চারণ করলেই স্বাধীনতার আবেগ জেগে ওঠে। আর “দোয়েল চত্বর”— বাংলাদেশের জাতীয় পাখির নামে এমন একটি স্থাননাম শহরের কঠিন নাগরিক জীবনে এক কোমল সাংস্কৃতিক স্পর্শ এনে দেয়। শহরের নামকরণ নিয়েও একজন সাহিত্যিক যে এত গভীরভাবে ভাবতে পারেন, এটি তারই প্রমাণ।
ফ্রাঙ্কফুর্টে সেই সাক্ষাতের দিনই আমি তাকে আমাদের বাসায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। আশ্চর্যজনকভাবে তিনি সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে গেলেন। তার সঙ্গে ছিলেন বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর । আমাদের ফ্রাঙ্কফুর্টের বাসায় সেদিন এক অসাধারণ আড্ডা বসেছিল।
সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলেছিল সাহিত্য, কবিতা, চলচ্চিত্র, রাজনীতি ও জীবন নিয়ে আলোচনা। সৈয়দ শামসুল হক গল্প বলতেন অনবদ্য ভঙ্গিতে। তার কণ্ঠে ছিল একধরনের নাটকীয়তা, কিন্তু সেটি কখনো কৃত্রিম মনে হতো না। বরং মনে হতো, তিনি যেন তার প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে শিল্পে রূপ দিতে জানেন।
তিনি নিজের লেখালেখির নানা অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। বলছিলেন কীভাবে একটি চরিত্র তার মাথার ভেতর জন্ম নেয়, কীভাবে একটি সংলাপ দীর্ঘদিন তাকে তাড়া করে ফেরে। কখনো তিনি কবিতার পংক্তি আবৃত্তি করছিলেন, কখনো চলচ্চিত্রের দৃশ্য নিয়ে কথা বলছিলেন। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরও ছিলেন সমান প্রাণবন্ত। মিডিয়া ও সংস্কৃতি নিয়ে তার বিশ্লেষণী মন্তব্য আড্ডাকে আরও সমৃদ্ধ করছিল।
আজ এত বছর পর সেই সন্ধ্যার কথা মনে হলে মনে হয়, আমরা যেন একটি সময়কে স্পর্শ করেছিলাম। এমন কিছু মানুষ ছিলেন, যাদের উপস্থিতি একটি ঘরকে আলোকিত করে তুলত। সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তিনি কেবল লেখক ছিলেন না— ছিলেন এক সাংস্কৃতিক শক্তি।
আজ তিনি নেই। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরও নেই। একে একে চলে গেছেন সেই প্রজন্মের বহু আলোকিত মানুষ। কিন্তু স্মৃতি থেকে যায়। কিছু সন্ধ্যা, কিছু কথা, কিছু হাসি মানুষের জীবনে স্থায়ী হয়ে থাকে। ফ্রাঙ্কফুর্টের সেই রাত আমার কাছে তেমনই এক অমূল্য স্মৃতি।
যখন আজকের পৃথিবীতে সাহিত্য ক্রমশ বাজারের প্রতিযোগিতার মধ্যে আটকে যাচ্ছে, তখন সৈয়দ শামসুল হকের মতো লেখকদের কথা আরও বেশি মনে পড়ে। কারণ তারা সাহিত্যকে শুধু পেশা হিসেবে নেননি; তারা একে জীবনবোধে পরিণত করেছিলেন।
তার লেখায় যেমন ছিল গভীর মানবিকতা, তেমনি তার ব্যক্তিজীবনেও ছিল সহজ আন্তরিকতা। একজন বিশ্বমানের সাহিত্যিক হয়েও তিনি মানুষের কাছে যেতে জানতেন, মানুষের সঙ্গে বসে গল্প করতে জানতেন, বই চাইতে জানতেন, হাসতে জানতেন।
সম্ভবত এ কারণেই তিনি আজও আমাদের স্মৃতিতে জীবন্ত। তার বই যেমন রয়ে গেছে, তেমনি রয়ে গেছে তার সঙ্গে কাটানো কিছু অমলিন মুহূর্ত। ফ্রাঙ্কফুর্টের সেই সন্ধ্যা আমার কাছে কেবল একজন লেখকের সঙ্গে সাক্ষাৎ নয়— বরং বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের স্পর্শ।
— হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

