ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চলমান বিরোধের মধ্যেই এক নতুন মন্তব্য করে আলোচনা সৃষ্টি করেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস । বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি নিজের সন্তানদেরও পড়ালেখা বা কাজের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরামর্শ দেবেন না বলে জানিয়েছেন।
ভুর্ৎসবুর্গে তরুণ ক্যাথলিকদের এক সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় রক্ষণশীল এই জার্মান নেতা বলেন, ‘আমি আমেরিকার একজন বড় প্রশংসক। তবে এই মুহূর্তে আমার সেই প্রশংসা আর বাড়ছে না।’
তিনি বলেন, ‘আজকের দিনে আমি আমার সন্তানদের শিক্ষা বা কাজের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুপারিশ করব না। সেখানে এখন ভিন্নধর্মী এক সামাজিক আবহ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরাও চাকরি পেতে চরম হিমশিম খাচ্ছেন।’
নিজের দেশ সম্পর্কে মের্ৎস জার্মানদের বিশ্বের পরিস্থিতি নিয়ে ‘হতাশাগ্রস্ত’ না হওয়ার আহ্বান জানান এবং দেশের সম্ভাবনা নিয়ে আরো আশাবাদী হতে উৎসাহিত করেন। তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বিশ্বের খুব কম দেশই আছে, যা জার্মানির মতো বিশেষ করে তরুণদের জন্য এত বড় সুযোগ তৈরি করে।’
যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে মের্ৎসের এই মন্তব্যের পর ট্রাম্পের শিবির থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে জার্মানিতে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা রিচার্ড গ্রেনেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ফ্রিডরিখ মের্ৎস এখন তথাকথিত ‘টিডিএস’ (ট্রাম্প ডেরাঞ্জমেন্ট সিনড্রোম) সোসাইটির ইউরোপীয় প্রেসিডেন্টে পরিণত হয়েছেন।’
গ্রেনেল দাবি করেন, গত মার্চ মাসে হোয়াইট হাউসে যখন মের্ৎস ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, তখন তিনি ‘সম্পূর্ণ নরম ও প্রশংসাসূচক’ আচরণ করেছিলেন।
শুক্রবারের মন্তব্য সেই সমঝোতামূলক অবস্থানের সম্পূর্ণ বিরোধী। তিনি আরো বলেন, ‘জার্মানরা এমন একজন নেতা পেয়েছে, যার কোনো কৌশল নেই এবং তিনি পুরোপুরি জার্মানির ওক মিডিয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।’
জার্মানির উগ্র-ডানপন্থি দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) নেতা আলিস ভাইডেলও চ্যান্সেলরের এই মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন। এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘মের্ৎস ‘রাজনৈতিক পরিবেশ’-এর কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের বিরুদ্ধে পরামর্শ দিচ্ছেন। বিদ্রুপের বিষয় হলো, চ্যান্সেলর নিজেই নিজের দেশকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন, তিনি এখন সতর্কতার আঙুল তুলছেন। এটি জার্মানির স্বার্থের অনুকূলে নয়।’
বাণিজ্য এবং ইউক্রেনের জন্য সামরিক সহায়তা নিয়ে বিরোধের জেরে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, যা ন্যাটো জোটকেও পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
ফ্রিডরিখ মের্ৎস বর্তমানে জার্মানির দুর্বল অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে লড়াই করছেন। তিনি এর আগে বলেছিলেন, ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি সামরিক পদক্ষেপ এবং এর ফলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ইউরোপের স্বার্থের মারাত্মক ক্ষতি করেছে।
গত মাসের শেষের দিকে মের্ৎস এই সংঘাত নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করে বলেছিলেন, বর্তমান সংকটে ইরানের নেতৃত্বের কাছে আমেরিকানরা ‘অপমানিত’ হচ্ছে। তার এই মন্তব্যে ট্রাম্প অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। এর দিন কয়েকের মাথায় ওয়াশিংটন জার্মানি থেকে আংশিক সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়, যেখানে তাদের প্রায় ৩৬ হাজার সামরিক সদস্য রয়েছে। পাশাপাশি ইইউ থেকে আমদানিকৃত গাড়ির ওপর শুল্ক বাড়ানোরও ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র, যা জার্মানির অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত।
জার্মানির জনমত জরিপগুলোতে মের্ৎসের জনপ্রিয়তা বর্তমানে রেকর্ড তলানিতে রয়েছে। তবে ট্রাম্পের সমালোচনা প্রত্যাহারের সুযোগ বারবার প্রত্যাখ্যান করলেও মের্ৎস বলেছেন, তিনি ‘ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা ছেড়ে দিচ্ছেন না’।
গত শুক্রবার এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে মের্ৎস জানান, ট্রাম্প যখন চীন সফর শেষে দেশে ফিরছিলেন, তখন তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। তারা ইরান, ইউক্রেন এবং আঙ্কারায় অনুষ্ঠিতব্য আগামী ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন নিয়ে আলোচনা করেছেন।
মের্ৎস বলেন, ‘একটি শক্তিশালী ন্যাটোর অধীনে যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানি শক্তিশালী অংশীদার।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

