নির্বাসনের ছায়ায় তসলিমা নাসরিন : ফ্রাঙ্কফুর্টের এক স্মরণীয় রাত

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের সাহিত্যকে ঘিরে যত না আলোচনা, তার চেয়ে অনেক বেশি আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে তাদের জীবনকে ঘিরে। তসলিমা নাসরিন সেই বিরল কয়েকজনের একজন। তিনি কেবল একজন লেখক নন; তিনি এক সময়ের সামাজিক বিস্ফোরণ, রাজনৈতিক বিতর্ক, ধর্মীয় ক্রোধ এবং নারী স্বাধীনতার এক উচ্চকণ্ঠ প্রতীক। তার কলম ছিল নির্ভীক, কখনো নির্মম সত্যভাষী, কখনো বিদ্রোহী, আবার কখনো নিঃসঙ্গ আর্তনাদ। নব্বই দশকের বাংলাদেশে যখন নারীর অধিকার, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং রাষ্ট্রের ভণ্ডামি নিয়ে উচ্চস্বরে কথা বলার সাহস খুব কম মানুষের ছিল, তখন তসলিমা নাসরিন সেই নিষিদ্ধ ভাষাগুলো উচ্চারণ করেছিলেন। তার “নির্বাচিত কলাম” কেবল একটি বই ছিল না; ছিল এক সময়ের সামাজিক প্রতিবাদের দলিল।

আমি ব্যক্তিগতভাবে তসলিমা নাসরিনকে প্রথমে চিনেছিলাম তার লেখার মাধ্যমে। তার কলামে ছিল এক অদ্ভুত স্পষ্টবাদিতা। তিনি আপস করতেন না। বাংলাদেশের সমাজে নারীকে যে দীর্ঘকাল ধরে অবদমিত করে রাখা হয়েছে, ধর্ম ও সামাজিক রীতির নামে যে বৈষম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেসব নিয়ে তার লেখনী ছিল ধারালো অস্ত্রের মতো। তিনি যে সময়ে লিখছিলেন, তখন বাংলাদেশে নারীমুক্তি নিয়ে কথা বলা মানেই ছিল ধর্মীয় গোষ্ঠীর রোষানলে পড়া। অথচ তসলিমা নির্ভয়ে লিখে গেছেন।

১৯৮৮ সালে প্রখ্যাত লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাদের বাড়িতে এক সাহিত্য আড্ডায় এসেছিলেন। সেদিনের সেই সন্ধ্যা আজও আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল। বাংলা সাহিত্য, রাজনীতি, সমাজ, কবিতা—বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলছিল। এক পর্যায়ে সুনীলদা তসলিমা নাসরিনের কথা তুললেন। তার চোখে আমি এক ধরনের মুগ্ধতা দেখেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, “এই মহিলার সাহসী লেখাগুলো বাংলাদেশে নারীমুক্তি আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করবে।” কথাটা তিনি অত্যন্ত বিশ্বাস নিয়ে বলেছিলেন। তখনও হয়তো আমরা কেউ কল্পনা করতে পারিনি, এই নারী লেখক একদিন পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বিতর্কিত ও আলোচিত লেখকদের একজন হয়ে উঠবেন।

১৯৯৪ সালের পর থেকে তসলিমা নাসরিনের জীবন যেন এক দীর্ঘ নির্বাসনের উপাখ্যান। বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর তীব্র আন্দোলন, ফতোয়া, হত্যার হুমকি এবং রাষ্ট্রের মামলা—সব মিলিয়ে তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। তিনি সুইডেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রে ছিন্নমূলের মতো জীবন কাটিয়েছেন। কোথাও তিনি পুরোপুরি নিরাপদ ছিলেন না। পশ্চিমা বিশ্ব তাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছিল, কিন্তু সেই সম্মানের আড়ালে ছিল এক গভীর নিঃসঙ্গতা। তিনি ছিলেন বহুল আলোচিত, কিন্তু একই সঙ্গে ভীষণ একা।

নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে Frankfurt Book Fair-এ তসলিমা নাসরিন আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশ নেন। সেই সময় পুরো পশ্চিমা মিডিয়ায় তাকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছিল। ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যমে তিনি ছিলেন শিরোনামের মানুষ। ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে তার অবস্থান পশ্চিমা বুদ্ধিজীবী সমাজে তাকে এক বিশেষ মর্যাদা এনে দিয়েছিল। কিন্তু সেই মর্যাদার সঙ্গে ছিল চরম নিরাপত্তা আতঙ্ক। আমি নিজ চোখে দেখেছি—তাকে ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দর থেকে কঠোর পুলিশ প্রহরায় হেলিকপ্টারে করে মেলা প্রাঙ্গণে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। দৃশ্যটি ছিল সিনেমার মতো। একজন লেখককে এভাবে নিরাপত্তার বলয়ে আবদ্ধ হয়ে চলতে হচ্ছে—এটা একই সঙ্গে গৌরবের এবং বেদনাদায়ক।

ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় তিনি অসংখ্য সেমিনারে অংশ নিয়েছিলেন। আমিও সেইসব সেমিনারের কয়েকটিতে উপস্থিত ছিলাম। হলভর্তি দর্শক, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ভিড়, ক্যামেরার ঝলকানি—সবকিছুর কেন্দ্রে ছিলেন তসলিমা। তিনি কথা বলছিলেন নারী স্বাধীনতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ, নির্বাসনের কষ্ট এবং লেখকের স্বাধীনতা নিয়ে। তার কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, কিন্তু চোখে কখনো কখনো আমি এক অদ্ভুত ক্লান্তি দেখেছি। যেন দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ করতে করতে মানুষটি অবসন্ন হয়ে পড়েছেন।

সেই সময় কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স-এর কর্ণধার বাদল বসু আমার বাসায় অতিথি হিসেবে অবস্থান করছিলেন। ঢাকা থেকে এসেছিলেন অঙ্কুর প্রকাশনীর নির্বাহী প্রধান মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ। বইমেলার ব্যস্ততার মাঝেই একদিন তসলিমা নাসরিন আমাদের কাছে কই মাছ দিয়ে ভাত খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কথাটি শুনে আমার স্ত্রী বিলকিস সুলতানা বকুল  অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তাকে আমাদের বাসায় আমন্ত্রণ জানান। তিনি বিনা দ্বিধায় সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন।

সন্ধ্যার পর তিনি বাদল বসু এবং মেসবাহ উদ্দিন আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের বাসায় এলেন। আজও সেই রাতের দৃশ্য আমার চোখে ভাসে। বিশ্বজুড়ে আলোচিত এক লেখক, যাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার উন্মাদনা, তিনি আমাদের সাধারণ ডাইনিং টেবিলে বসে কই মাছ দিয়ে ভাত খাচ্ছেন একেবারে ঘরোয়া মানুষের মতো। তার খাওয়ার ভঙ্গি দেখে আমার মনে হয়েছিল, বহুদিন তিনি বোধহয় এমন তৃপ্তি নিয়ে ভাত খাননি। নির্বাসিত মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় অভাব সম্ভবত দেশের খাবারের স্বাদ। সেই রাতে কই মাছের ঝোল আর ভাত যেন তাকে কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও নিজের শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়েছিল।

মজার বিষয় হচ্ছে, সেদিনই জার্মানির বিখ্যাত টেলিভিশন চ্যানেল ARD-এ তার একটি সাক্ষাৎকার প্রচারিত হচ্ছিল। তিনি তখন আমাদের বসার ঘরে বসে নিজেই নিজের সাক্ষাৎকার টেলিভিশনে দেখছিলেন, আর আমরা সবাই একসঙ্গে তা উপভোগ করছিলাম। দৃশ্যটি ছিল অদ্ভুত রকমের প্রতীকী। টেলিভিশনের পর্দায় তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিতর্কিত লেখক; আর বাস্তবে আমাদের ঘরে বসে থাকা মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত সহজ, ক্লান্ত, খানিকটা নিঃসঙ্গ একজন নারী।

ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা কর্তৃপক্ষ তাকে Holiday Inn Frankfurt-এ থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। পরের দিন সন্ধ্যায় তিনি আমাকে এবং বাদল বসুকে হোটেলে আমন্ত্রণ জানান। আমরা সেখানে গেলে জমে ওঠে দীর্ঘ আড্ডা। সেই আড্ডা ছিল সাহিত্য, রাজনীতি, নির্বাসন, প্রকাশনা, অনুবাদ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার এক অসাধারণ মিশ্রণ।

আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত তার বইগুলোর জনপ্রিয়তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। ভারতের বিভিন্ন ভাষায় তার বই অনূদিত হওয়ার বিষয়েও তিনি বলছিলেন। আমি লক্ষ্য করেছিলাম, নির্বাসনের জীবনে থেকেও তার লেখালেখির পরিকল্পনা থেমে নেই। তিনি নতুন বিষয় নিয়ে ভাবছিলেন, নতুন উপন্যাস, নতুন আত্মজীবনী, নতুন রাজনৈতিক লেখা। তার মধ্যে ছিল এক ধরনের অবিচল সৃজনশক্তি। যেন পৃথিবী তাকে যেখানেই ঠেলে দিক, তিনি লেখার মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখবেন।

সেই আড্ডা চলতে চলতে রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে গিয়েছিল। বাইরে তখন ফ্রাঙ্কফুর্টের আকাশ ধীরে ধীরে আলোয় ভরে উঠছে। অথচ আমরা যেন সময় ভুলে গিয়েছিলাম। তসলিমা কখনো হাসছিলেন, কখনো গভীর বিষণ্নতায় ডুবে যাচ্ছিলেন। নির্বাসিত মানুষের জীবনে সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় সম্ভবত এই—আপনি পৃথিবীর বহু শহরে পরিচিত, কিন্তু কোথাও পুরোপুরি নিজের নন।

তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। তার লেখার ভাষা, দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই—তিনি নিজের বিশ্বাসের জন্য বিরাট মূল্য দিয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে নির্বাসন, মৃত্যু হুমকি, গৃহবন্দি জীবন, সামাজিক একঘরে হয়ে পড়া—এসব তিনি ব্যক্তিগতভাবে বহন করেছেন। তিনি হয়তো অনেকের কাছে বিতর্কিত, কিন্তু একই সঙ্গে তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম।

আজ এত বছর পরও যখন সেই ফ্রাঙ্কফুর্টের রাতের কথা মনে পড়ে, তখন আন্তর্জাতিক খ্যাতির তসলিমাকে নয়, বরং আমি মনে করি এক ক্লান্ত নির্বাসিত মানুষকে, যিনি কই মাছ দিয়ে ভাত খেতে খেতে কয়েক মুহূর্তের জন্য নিজের হারিয়ে যাওয়া দেশকে ফিরে পেয়েছিলেন। সেই মুহূর্তে তিনি কোনো বিশ্বখ্যাত বিতর্কিত লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন শুধুই বাংলাভাষার এক নিঃসঙ্গ মানুষ, যিনি নিজের ভাষা, নিজের খাবার, নিজের মানুষদের কাছে সামান্য উষ্ণতা খুঁজছিলেন।

সময়ের বিচারে সেই সন্ধ্যা হয়তো খুব ছোট একটি ঘটনা। কিন্তু আমার কাছে সেটি ইতিহাসের অংশ। কারণ একজন লেখকের প্রকৃত পরিচয় কেবল তার বইয়ের পাতায় নয়, তার ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোতেও লুকিয়ে থাকে। আর আমি সৌভাগ্যবান যে তসলিমা নাসরিনের জীবনের এমন একটি অন্তরঙ্গ সন্ধ্যার সাক্ষী হতে পেরেছিলাম।

লেখন: হাবিব বাবুল, প্রধান সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম  

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.