বিচারহীনতার বৃত্ত ভাঙতে বিচার ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার জরুরি

বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের হতাশা এখন আর কেবল আদালতের দীর্ঘসূত্রতা বা মামলার জটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকটে রূপ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে রামিসার বাবার সেই হৃদয়বিদারক বক্তব্য—“সরকার বিচার করতে পারবে না, আমি বিচার চাই না”—আসলে কোটি মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ ও অসহায়তার প্রতিধ্বনি। পরে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রামিসার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিচার তো শেষ পর্যন্ত আদালতই করবে। আর সেই আদালত পরিচালিত হচ্ছে মূলত ঔপনিবেশিক আমলের কাঠামো, জটিল প্রক্রিয়া ও দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ আইনি সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে। ফলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেও কাঙ্ক্ষিত বিচার কতটা দ্রুত ও কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

বাংলাদেশের অধিকাংশ ফৌজদারি আইন ব্রিটিশ শাসনামলে প্রণীত। দণ্ডবিধি ১৮৬০, সাক্ষ্য আইন ১৮৭২, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮—এসব আইন তৈরি হয়েছিল উপনিবেশ শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য, জনগণকে দ্রুত ন্যায়বিচার দেওয়ার জন্য নয়। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও সেই একই কাঠামো কার্যত বহাল রয়েছে। সমাজ বদলেছে, অপরাধের ধরন বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে; কিন্তু বিচার ব্যবস্থার মৌলিক দর্শন ও প্রক্রিয়া খুব বেশি বদলায়নি।

ফলাফল হচ্ছে, একটি হত্যা বা ধর্ষণের মামলা বছরের পর বছর নিম্ন আদালত, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে ঘুরতে থাকে। একজন বিচারপ্রার্থী কখনও সাক্ষীর অভাবে, কখনও তদন্তের দুর্বলতায়, কখনও রাজনৈতিক প্রভাব বা আইনি জটিলতায় ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। অপরদিকে অর্থশালী বা প্রভাবশালী অপরাধীরা দক্ষ আইনজীবী, বারবার সময় নেওয়া, জামিন ও আপিলের সুযোগ ব্যবহার করে বিচারকে দীর্ঘায়িত করতে সক্ষম হয়। এতে সাধারণ মানুষের মনে ধারণা জন্মায়—আইন সবার জন্য সমান নয়।

বাংলাদেশে বিচার বিলম্বের অন্যতম কারণ হলো তদন্ত ব্যবস্থার দুর্বলতা। অনেক মামলায় পুলিশি তদন্ত মানসম্পন্ন হয় না। অপরাধস্থল সংরক্ষণ, ফরেনসিক বিশ্লেষণ, ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ—এসব ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে। ফলে আদালতে গিয়ে মামলার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার সাক্ষীদের নিরাপত্তা না থাকায় অনেকে আদালতে সাক্ষ্য দিতে ভয় পান বা পরে বক্তব্য বদলে ফেলেন। এতে বিচার আরও জটিল হয়ে ওঠে।

উন্নত দেশগুলোতে বিশেষ করে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় দ্রুত ও বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্তকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি বা জাপানের মতো দেশে অপরাধ তদন্তে আধুনিক ফরেনসিক প্রযুক্তি, ডিএনএ বিশ্লেষণ, ডিজিটাল নজরদারি ও বিশেষ প্রশিক্ষিত তদন্তকারী দল ব্যবহৃত হয়। অনেক দেশে “ভিকটিম সাপোর্ট সিস্টেম” রয়েছে, যেখানে ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি ও মানসিক সহায়তা দেওয়া হয়। সাক্ষী সুরক্ষা কর্মসূচিও অত্যন্ত শক্তিশালী। ফলে সাক্ষীরা ভয় না পেয়ে আদালতে সত্য বলার সুযোগ পান।

ধর্ষণের মামলায় উন্নত বিশ্বে ভুক্তভোগীকে বারবার সামাজিক অপমান বা অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা হয় না। অনেক দেশে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা “ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট” রয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিচার শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকে। উদাহরণ হিসেবে ভারত দিল্লির নির্ভয়া ঘটনার পর ধর্ষণ মামলার জন্য বিশেষ আদালত ও দ্রুত বিচার কাঠামো জোরদার করে। ইউরোপের অনেক দেশে শিশু ও নারী নির্যাতনের মামলায় ভিডিও সাক্ষ্য গ্রহণের ব্যবস্থাও রয়েছে, যাতে ভুক্তভোগী মানসিক চাপ কম অনুভব করেন।

বাংলাদেশেও কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে, কিন্তু এগুলো স্থায়ী ও কাঠামোগত সমাধান হয়ে উঠতে পারেনি। বরং অনেক সময় রাজনৈতিক বা জনমতের চাপের মুখে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, পরে আবার পুরোনো ধীরগতির ব্যবস্থায় সব আটকে যায়। বিচার ব্যবস্থাকে ব্যক্তি বা সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল না রেখে একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও আধুনিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

এক্ষেত্রে প্রথম প্রয়োজন আইন সংস্কার। ঔপনিবেশিক যুগের জটিল ও দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ আইনের পরিবর্তে সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন করতে হবে। মামলার অযৌক্তিক দীর্ঘসূত্রতা বন্ধে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ জরুরি। একই সঙ্গে বিচারকদের সংখ্যা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের তুলনায় উন্নত দেশগুলোতে প্রতি লাখ মানুষের বিপরীতে বিচারকের সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে মামলার চাপ তুলনামূলকভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়।

দ্বিতীয়ত, তদন্ত ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার করতে হবে। পুলিশের পাশাপাশি স্বাধীন তদন্ত সংস্থা বা বিশেষ অপরাধ তদন্ত ইউনিট গঠন করা যেতে পারে। ফরেনসিক ল্যাব আধুনিকায়ন, ডিএনএ ব্যাংক তৈরি এবং ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা জরুরি।

তৃতীয়ত, সাক্ষী সুরক্ষা আইন কার্যকর করতে হবে। বাংলাদেশে সাক্ষীরা প্রায়ই হুমকি, ভয়ভীতি বা সামাজিক চাপে সাক্ষ্য দিতে চান না। উন্নত বিশ্বে সাক্ষীদের পরিচয় গোপন রাখা, নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর কিংবা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা প্রয়োজন।

চতুর্থত, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় চাপ কিংবা ক্ষমতাবানদের হস্তক্ষেপ বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ধ্বংস করে। একজন বিচারক যেন কেবল আইন ও বিবেক অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দিতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, প্রযুক্তিনির্ভর আদালত ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। অনেক উন্নত দেশে ই-ফাইলিং, অনলাইন শুনানি, ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনা চালু হয়েছে। এতে সময় ও দুর্নীতি দুই-ই কমে। বাংলাদেশেও করোনাকালে ভার্চুয়াল আদালতের কিছু ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছিল। সেটিকে আরও বিস্তৃত ও স্থায়ী রূপ দেওয়া যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিচারকে কেবল শাস্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। একজন মানুষ যখন বিশ্বাস হারিয়ে বলে “আমি বিচার চাই না”, তখন সেটি কেবল একটি পরিবারের হতাশা নয়; সেটি রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক সংকেত। কারণ বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারালে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতার দিকে যেতে পারে, যা সমাজকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে।

প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের পক্ষ থেকে বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হয় না। বিচার যদি নির্ভর করে কে ক্ষমতায় আছে বা কোন ঘটনায় জনমত কতটা উত্তাল—তাহলে ন্যায়বিচার কখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে না।

বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন বিচার ব্যবস্থার আমূল সংস্কার নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য। রাজনৈতিক দল, আইনজীবী, বিচারক, মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে বসে একটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার রূপরেখা তৈরি করতে হবে। কারণ বিচারহীনতা শুধু আদালতের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।

রামিসার বাবার কান্না তাই কেবল একজন পিতার কান্না নয়; এটি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া আস্থার প্রতীক। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন কার্যকর ও দৃশ্যমান সংস্কার। আর সেই সংস্কার যত বিলম্বিত হবে, বিচারহীনতার অন্ধকার ততই গভীর হবে।

লেখক : হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.