আজ থেকেই ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু : শুভেন্দু

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আতঙ্ক জাগানিয়া কয়েকটি ‘ডি’ একসঙ্গে নেমে এসেছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁর সরকার তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ ডিটেক্ট বা শনাক্ত, ডিটেইন বা আটক এবং পরে তাদের বিএসএফের হাতে তুলে দিয়ে দেশছাড়া করার প্রক্রিয়া বা ডিপোর্ট শুরু করবে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, নবান্নে এক অনুষ্ঠানে শুভেন্দু বলেন, ‘ভারত সরকার ২০২৫ সালের ১৪ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে একটি নির্দেশ পাঠিয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, (তথাকথিত) বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করে বিএসএফের হাতে তুলে দিতে হবে, যাতে তাদের ফেরত পাঠানো যায়। কিন্তু আগের সরকার এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজ থেকেই আমরা সেই নির্দেশ কার্যকর করব। সব অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে গ্রেপ্তার করে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে…।’ বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য জমি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছিলেন তিনি। শুভেন্দু বলেন, যারা ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে ভারতে প্রবেশ করেছে এবং নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন বা সিএএ–২০১৯ অনুযায়ী নাগরিকত্বের আবেদন করার যোগ্য, তাদের গ্রেপ্তার করা হবে না। তবে মুসলিমরা এই আইনের আওতার বাইরে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অন্য সব অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে আটক করে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এখন থেকে বাংলায় ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ প্রক্রিয়া শুরু হবে।’ তবে তিনি ‘ডিলিট’ বলতে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা স্পষ্ট করেননি। তবে সূত্রগুলো জানিয়েছে, তিনি সম্ভবত ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কথাই ইঙ্গিত করেছেন।

রাজ্যের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পুলিশ বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলিম তথাকথিত অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করবে এবং তাদের বিএসএফের হাতে তুলে দেবে। এরপর বিএসএফ বিষয়টি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা করে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করবে।

ঢাকার অবস্থান হলো, কেবল নথিভুক্ত ও যাচাইকৃত নাগরিকদেরই তারা ফেরত নেবে। এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘অমুসলিম অভিবাসীরা—হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিষ্টান—যদি ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তান থেকে এসে থাকে, তাহলে তারা সিএএ অনুযায়ী নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারবেন।’

রাজ্য প্রশাসনের সূত্রগুলো বলছে, বিজেপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিই ছিল ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট।’ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ডিলিট অংশটি—অর্থাৎ অযোগ্য ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া—ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে।’

এক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বলেন, ‘এখন আটক ও ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে। সমাজে এর কী প্রভাব পড়ে, সেটাই দেখার বিষয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ বহুদিনের সমস্যা। কিন্তু হঠাৎ করে মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করার পদক্ষেপ সামাজিক পরিবেশ অস্থির করে তুলতে পারে।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও ঝাড়খণ্ড বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারণায় বারবার অভিযোগ করেছিলেন, বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের জনমিতিক চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকারের চিঠি পাওয়ার পরই আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সরকার বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করার কাজ শুরু করে। একটি সূত্র জানায়, ‘এ পর্যন্ত আসাম পুলিশ কয়েকশ বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীকে শনাক্ত ও আটক করেছে। তবে কাউকে ফেরত পাঠানোর আগে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।’

সূত্রটি আরও জানায়, ‘যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে রাজ্যের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল এখন পর্যন্ত ৫০ জনের বেশি এমন অভিবাসীকে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে।’

গত ১২ মে আসামের গুয়াহাটিতে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন শুভেন্দু। সেখানে তিনি বলেছিলেন, হিমন্তকে তিনি নিজের বড় ভাই মনে করেন। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, অবৈধ অনুপ্রবেশ মোকাবিলায় পশ্চিমবঙ্গও আসামের পথ অনুসরণ করবে। শপথ অনুষ্ঠানের কিছুক্ষণ পর হিমন্ত তার এক্স হ্যান্ডেলে শুভেন্দুর সঙ্গে তোলা দুটি ছবি পোস্ট করে লেখেন, ‘খারাপ দিন শুরু হলো… (আপনারা জানেন কার জন্য)।’

শুভেন্দু বলেন, ‘বাংলাদেশ সীমান্তে ২৭ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য আমরা জমি হস্তান্তর করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সীমান্ত আরও শক্তিশালী করতে বিএসএফের জন্য কয়েকটি বর্ডার আউটপোস্ট ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জমিও আমরা দিচ্ছি।’ তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটারে বেড়া নির্মাণ করা হবে।

তিনি অভিযোগ করেন, ‘আগের সরকার চাইলে ৫৫৫ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের জন্য জমি দিতে পারত। কিন্তু তারা ভোটব্যাংক রক্ষা ও একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীকে তুষ্ট করার জন্য তা করেনি।’ কেন সীমান্তে বেড়া প্রয়োজন, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, সারা দেশে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মতো অপরাধে জড়িত।’

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.