বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন অনেক দৃশ্য আমরা প্রায়ই দেখি, যা একদিকে ক্ষমতার অতিরঞ্জিত প্রদর্শন, অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার গাম্ভীর্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সম্প্রতি ঢাকায় একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চাঁদপুর সফরে যাওয়ার সময় তাঁর গাড়িবহরের সামনে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে রাস্তায় দৌড়ে দৌড়ে যানবাহন সরাতে এবং পথ খালি করতে দেখা গেছে। দৃশ্যটি ছিল অস্বাভাবিক, বিস্ময়কর এবং অনেকের কাছে বিব্রতকরও। কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রধানমন্ত্রীর সফর নির্বিঘ্ন করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর, কোনো প্রতিমন্ত্রীর নয়।

ঘটনাটি নিছক একটি বিচ্ছিন্ন আচরণ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত এক ধরনের তোষণপ্রবণ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। যেখানে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের চেয়ে ব্যক্তি আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানে এমন দৃশ্য তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এ ধরনের আচরণ কি একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য মানানসই?
প্রধানমন্ত্রী একটি রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান। তাঁর পদ মর্যাদা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাঁর চারপাশের পরিবেশও হতে হয় সংযত, পরিমিত এবং রাষ্ট্রীয় গাম্ভীর্যের প্রতীক। কোনো প্রতিমন্ত্রী যদি প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির সামনে দৌড়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তাহলে সেটি কেবল ব্যক্তিগত অতি-উৎসাহের প্রকাশ নয়, বরং পুরো মন্ত্রিসভার মর্যাদাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। একজন প্রতিমন্ত্রী রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ। তাঁর কাজ নীতি নির্ধারণে অংশ নেওয়া, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করা এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করা। তাঁকে যদি রাস্তায় নেমে ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়, তাহলে জনগণের কাছে সেটি কৌতুকের বিষয় হয়ে ওঠে—এটাই স্বাভাবিক।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে কোনো ঘটনা গোপন থাকে না। জনগণ সবকিছু দেখছে, বিশ্লেষণ করছে এবং মতামত দিচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিটি আচরণ এখন সরাসরি জনমানসে প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত আনুগত্য প্রদর্শনের এসব দৃশ্য সাধারণ মানুষকে বিরক্ত করে এবং শাসকগোষ্ঠী সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। মানুষ তখন মনে করে, বাস্তব সমস্যার সমাধানের চেয়ে নেতাদের সন্তুষ্ট রাখাই যেন বড় কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে আরেকটি পুরোনো সমস্যাও সামনে আসে—রাস্তাজুড়ে নেতাকর্মীদের মিছিল, স্লোগান এবং জনভোগান্তি। কোনো প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী কোনো এলাকায় সফরে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তা বন্ধ থাকে। দুই ধারে দাঁড়িয়ে থাকে দলীয় নেতাকর্মীদের লম্বা সারি। মিছিল, ব্যানার, স্লোগান—সব মিলিয়ে পুরো শহর বা অঞ্চল এক ধরনের অঘোষিত অবরোধের মধ্যে পড়ে যায়। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে ওঠে। অফিসগামী মানুষ দেরি করে, রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স আটকে যায়, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় পৌঁছাতে হিমশিম খায়। অথচ এসব দুর্ভোগের বিষয়টি খুব কম ক্ষেত্রেই গুরুত্ব পায়।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি জনগণ। জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে কোনো রাজনৈতিক প্রদর্শন শেষ পর্যন্ত নেতাদের জনপ্রিয়তা বাড়ায় না, বরং ক্ষয় করে। আজকের পৃথিবীতে নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে আচরণের ওপর। জনগণ দেখতে চায় তাঁদের নেতা কতটা সাধারণ মানুষের জীবন ও কষ্টের প্রতি সংবেদনশীল। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে তাই রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের চলাচলে অযথা জাঁকজমক বা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয় না।
তারেক রহমান দীর্ঘ সময় ব্রিটেনে অবস্থান করেছেন। তিনি নিশ্চয়ই সেখানে দেখেছেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিংবা মন্ত্রীরা কিভাবে চলাফেরা করেন। লন্ডনের ব্যস্ত সড়কেও অনেক সময় প্রধানমন্ত্রীকে সীমিত নিরাপত্তা বহর নিয়ে চলতে দেখা যায়। কোথাও বিশাল মিছিল নেই, নেতাকর্মীদের স্লোগান নেই, কোনো মন্ত্রী রাস্তায় নেমে গাড়ির জন্য পথ পরিষ্কার করছেন না। কারণ সেখানে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের দায়িত্ব পালন করে, আর রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের মর্যাদা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকেন।
বাংলাদেশেও সেই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আচরণ হতে হবে পরিমিত ও দায়িত্বশীল। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রের উদ্দেশ্য জনগণের সেবা করা, কোনো ব্যক্তিকে রাজকীয় মর্যাদায় উপস্থাপন করা নয়। একজন প্রধানমন্ত্রী যত বড় নেতা হোন না কেন, তিনি শেষ পর্যন্ত জনগণের প্রতিনিধি। তাঁর সফর যেন জনগণের দুর্ভোগের কারণ না হয়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যখন কোনো প্রতিমন্ত্রী বা নেতা অতিরিক্ত আনুগত্য দেখাতে গিয়ে এমন কাজ করেন, তখন আশপাশের অন্যরাও সেই সংস্কৃতিকে অনুসরণ করতে শুরু করেন। ফলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়—কে কত বেশি তোষামোদ করতে পারে। এর ফলে যোগ্যতা, দক্ষতা এবং নীতিনিষ্ঠার চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্য বেশি মূল্য পেতে শুরু করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। কারণ তখন নীতি ও প্রতিষ্ঠানের জায়গা দখল করে নেয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংস্কৃতি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতেও ব্যক্তিপূজার প্রবণতা ছিল। কিন্তু নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশ ভিন্ন কিছু প্রত্যাশা করে। তারা চায় দক্ষ প্রশাসন, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং আধুনিক রাজনৈতিক আচরণ। তারা দেখতে চায় এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে একজন মন্ত্রী তাঁর কাজের মাধ্যমে সম্মান অর্জন করবেন, রাস্তায় দৌড়ে নয়। জনগণ এখন নেতাদের কাছ থেকে নাটকীয়তা নয়, কার্যকর নেতৃত্ব চায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এখন একটি বড় সুযোগ রয়েছে। তিনি চাইলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারেন। তিনি তাঁর দল ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের স্পষ্টভাবে বলতে পারেন যে, অতিরিক্ত শোডাউন, অপ্রয়োজনীয় মিছিল এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক আনুগত্য প্রদর্শনের প্রয়োজন নেই। বরং জনগণের ভোগান্তি কমানো, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের মর্যাদা রক্ষা করাই হবে সরকারের অগ্রাধিকার।
এমন পদক্ষেপ শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকেই শক্তিশালী করবে না, বরং দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও ইতিবাচক পথে এগিয়ে নেবে। কারণ একজন নেতার প্রকৃত শক্তি তাঁর সামনে কত মানুষ স্লোগান দিল, তাতে নয়; বরং জনগণ তাঁকে কতটা শ্রদ্ধা করে, সেটাই আসল বিষয়।
বাংলাদেশ এখন পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা—সব মিলিয়ে দেশের সামনে বড় বড় দায়িত্ব রয়েছে। এই সময়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিটি আচরণ জনগণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তাই নেতাদেরও বুঝতে হবে, রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো নাট্যমঞ্চ নয়। এখানে শালীনতা, সংযম এবং দায়িত্ববোধই সবচেয়ে বড় গুণ।
প্রধানমন্ত্রীর সফর অবশ্যই নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল হতে হবে। কিন্তু সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর, কোনো প্রতিমন্ত্রীর নয়। আর জনগণের চলাচল ব্যাহত করে, রাস্তাজুড়ে মিছিল করে কিংবা অতিরঞ্জিত আনুগত্য প্রদর্শন করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বরং এতে নেতৃত্বের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিকে যদি সত্যিই আধুনিক ও গণমুখী করতে হয়, তাহলে এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। ক্ষমতার জৌলুস নয়, জনগণের আস্থা—সেটিই হতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি।
হাবিব বাবুল
জার্মানিভিত্তিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং শুদ্ধস্বর ডটকমের প্রধান সম্পাদক ।

