ভারতীয় রাজনীতিতে বহু বিচিত্র দল এসেছে, বহু প্রতিবাদী আন্দোলনের জন্ম হয়েছে। কিন্তু “ককরোচ জনতা পার্টি” বা সিজেপি-র মতো একটি ব্যঙ্গভিত্তিক ডিজিটাল আন্দোলন এত অল্প সময়ে যে পরিমাণ আলোড়ন তুলেছে, তা নিঃসন্দেহে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত। এটি আপাতদৃষ্টিতে একটি “মিম পার্টি”, কিন্তু এর জনপ্রিয়তার গভীরে রয়েছে রাষ্ট্র, ক্ষমতা, তরুণ সমাজ এবং ডিজিটাল সংস্কৃতির মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্বের এক জটিল গল্প।
সিজেপি-র উত্থানকে শুধুমাত্র কৌতুক বা ইন্টারনেটের ক্ষণস্থায়ী উন্মাদনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব বোঝার একটি জানালা। কারণ আজকের তরুণ ভোটাররা পুরনো রাজনৈতিক ভাষা, প্রচলিত জাতীয়তাবাদী আবেগ কিংবা দলীয় আনুগত্যের বাইরে নিজেদের প্রকাশের নতুন পদ্ধতি খুঁজছে। তারা আদর্শের চেয়ে অভিজ্ঞতাকে, বক্তৃতার চেয়ে ব্যঙ্গকে এবং দলীয় শৃঙ্খলার চেয়ে ডিজিটাল অংশগ্রহণকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সিজেপি-র জন্মের পেছনে যে ঘটনাটি কাজ করেছে, সেটিও তাৎপর্যপূর্ণ। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির মন্তব্যে তরুণদের একাংশকে “আরশোলা” বা “পরজীবী” হিসেবে আখ্যা দেওয়ার পরই “ককরোচ” পরিচয়কে প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করা হয়। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, ক্ষমতাবানরা যখন কোনো জনগোষ্ঠীকে অবজ্ঞাসূচক ভাষায় চিহ্নিত করে, তখন সেই পরিচয়ই একসময় প্রতিরোধের শক্তিতে রূপ নেয়। কৃষ্ণাঙ্গ আন্দোলনে “ব্ল্যাক”, নারীবাদে “উইচ”, কিংবা এলজিবিটিকিউ আন্দোলনে “কুইয়ার” শব্দের পুনর্দখল তার উদাহরণ। ভারতে “আরশোলা” শব্দটিকে রাজনৈতিক প্রতীকে রূপান্তর করাও সেই ধারারই অংশ।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আন্দোলনের প্রধান অস্ত্র রাজনৈতিক তত্ত্ব নয়, বরং মিম, ব্যঙ্গ, রিল এবং ভাইরাল সংস্কৃতি। অর্থাৎ এটি এমন এক রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করছে, যা জেন-জি এবং তরুণ মিলেনিয়ালদের দৈনন্দিন ডিজিটাল অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়। প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো এখনও যেখানে দীর্ঘ বক্তৃতা, টিভি বিতর্ক বা বিশাল জনসভায় আটকে আছে, সেখানে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক যোগাযোগ হচ্ছে ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও, ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট এবং অ্যালগরিদমের গতিতে।
এই বাস্তবতা শুধু ভারতের নয়; পুরো উপমহাদেশেই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ছাত্র ও তরুণ আন্দোলনগুলো মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক। প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনাস্থা এবং রাষ্ট্রের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দ্রুত সংগঠিত হচ্ছে। নেপালেও পুরনো দলগুলোর প্রতি বিরক্তি থেকে নতুন প্রজন্ম বিকল্প রাজনৈতিক ভাষা খুঁজছে। পাকিস্তানেও ইমরান খানের জনপ্রিয়তার বড় অংশ তৈরি হয়েছে ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী আবেগকে তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা থেকে।
এর পেছনে মূল কারণ একটাই— প্রজন্মগত গ্যাপ। বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় অংশ এমন এক সময়ে বেড়ে উঠেছেন, যখন রাজনীতি মানে ছিল দলীয় কাঠামো, মতাদর্শ, সংগঠন এবং মাঠের কর্মসূচি। কিন্তু আজকের তরুণরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছে, যেখানে পরিচয়, কাজ, সম্পর্ক, তথ্য এবং প্রতিবাদ— সবকিছুই ডিজিটাল। তারা দ্রুত পরিবর্তন চায়, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া চায় এবং কর্তৃত্বকে স্বাভাবিকভাবে সন্দেহ করে।
এই তরুণ সমাজের বড় অংশই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাস করছে। উচ্চশিক্ষা থাকা সত্ত্বেও কর্মসংস্থানের সংকট, বাড়তে থাকা বৈষম্য, মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ তাদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করেছে। কিন্তু তারা পুরনো ধরনের বিপ্লবী ভাষায় কথা বলে না। তারা ব্যঙ্গ করে, মিম বানায়, ট্রল করে এবং ভাইরাল কনটেন্টের মাধ্যমে ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। সিজেপি এই মনস্তত্ত্বকে সফলভাবে ধরতে পেরেছে।
তবে প্রশ্ন হলো, এই ধরনের “মিম পার্টি” কি বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে? ইতিহাস বলছে, সব সময় নয়। ইন্টারনেট জনপ্রিয়তা এবং বাস্তব ভোট রাজনীতির মধ্যে বিশাল পার্থক্য আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক মিলিয়ন ফলোয়ার থাকা মানেই সাংগঠনিক শক্তি নয়। ভারতের মতো বিশাল ও বহুমাত্রিক গণতন্ত্রে নির্বাচনী রাজনীতি এখনও অর্থ, সংগঠন, জোট এবং মাঠপর্যায়ের প্রভাবের উপর নির্ভরশীল।
কিন্তু এটাও সত্য যে, ডিজিটাল আন্দোলনকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারণ তারা সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে না পারলেও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র বদলে দিতে পারে। তারা জনমত তৈরি করতে পারে, প্রচলিত দলগুলোকে চাপে ফেলতে পারে এবং নতুন রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে পারে। আজকের মিমই আগামী দিনের রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হতে পারে।
আর এখানেই ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রগুলোর অস্বস্তি। কারণ ব্যঙ্গ এমন এক অস্ত্র, যা দমন করা কঠিন। প্রচলিত বিরোধী দলকে রাষ্ট্র আইনি, প্রশাসনিক বা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে পারে। কিন্তু ইন্টারনেট-ভিত্তিক বিকেন্দ্রীভূত ব্যঙ্গ আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বেশি জটিল। একটি অ্যাকাউন্ট বন্ধ হলে আরেকটি খুলে যায়; একটি মিম মুছে দিলে শত শত নতুন সংস্করণ তৈরি হয়। ফলে রাষ্ট্রের সেন্সরশিপ প্রায়ই উল্টো কৌতূহল এবং জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়।
সিজেপি-র ক্ষেত্রেও সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। হ্যান্ডল ব্লক করার ঘটনা তাদের অনুসারীদের কাছে “রাষ্ট্র বনাম তরুণ সমাজ” বয়ানকে আরও শক্তিশালী করেছে। এর ফলে আন্দোলনটি নিছক কৌতুকের সীমা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
তবে এই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ঝুঁকিও আছে। মিম-নির্ভর রাজনীতি অনেক সময় জটিল বিষয়কে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে। গভীর নীতিগত বিতর্কের বদলে তা আবেগ, বিদ্রুপ এবং ভাইরালতার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এতে রাজনৈতিক সচেতনতা যেমন বাড়তে পারে, তেমনি বিভ্রান্তি এবং জনতুষ্টিবাদও বাড়তে পারে।
উপমহাদেশের আগামী রাজনীতি সম্ভবত দুই বাস্তবতার সংঘাতে নির্ধারিত হবে। একদিকে থাকবে কেন্দ্রীভূত, জাতীয়তাবাদী, শক্তিশালী নেতৃত্বভিত্তিক পুরনো রাজনৈতিক কাঠামো; অন্যদিকে থাকবে ডিজিটাল, বিকেন্দ্রীভূত, ব্যঙ্গাত্মক এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল তরুণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এই সংঘাত কেবল নির্বাচনে নয়, ভাষা, সংস্কৃতি, মতপ্রকাশ এবং নাগরিক পরিচয়ের প্রশ্নেও গভীর প্রভাব ফেলবে।
“তেলেপোকা পার্টি” হয়তো আগামীকাল ভারতের ক্ষমতায় যাবে না। হয়তো এটি কয়েক মাস পর হারিয়েও যেতে পারে। কিন্তু এর উত্থান যে বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে, সেটি দীর্ঘস্থায়ী। দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ সমাজ আর পুরনো রাজনৈতিক ভাষায় নিজেদের খুঁজে পাচ্ছে না। তারা নতুন প্রতীক, নতুন ব্যঙ্গ এবং নতুন ডিজিটাল পরিচয়ের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করছে।
এই বাস্তবতাকে যারা বুঝতে পারবে, ভবিষ্যতের রাজনীতিতে তারাই এগিয়ে থাকবে। আর যারা এটিকে শুধুই “মিম” ভেবে উড়িয়ে দেবে, তারা হয়তো একদিন দেখবে— ব্যঙ্গই হয়ে উঠেছে নতুন যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ভাষা।
হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

