হরমুজ় খুলছে, —পশ্চিম এশিয়ায় কি সত্যিই শান্তির নতুন সূর্যোদয় ?

পশ্চিম এশিয়ার অস্থির রাজনীতির ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলোকে ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি—লেবানন-ইজ়রায়েল সংঘাতের যুদ্ধবিরতি, ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ় প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার ঘোষণা, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় মধ্যস্থতা—এই তিনটি ঘটনা মিলিয়ে এমনই এক সন্ধিক্ষণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি সাময়িক কূটনৈতিক স্বস্তি, নাকি দীর্ঘমেয়াদি শান্তির সম্ভাব্য ভিত্তি?

প্রথমেই হরমুজ় প্রণালীর গুরুত্ব বোঝা জরুরি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এবং গ্যাস বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যায়। পশ্চিম এশিয়ার জ্বালানি নির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি ভারত, চীন, জাপান এবং ইউরোপের বহু দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এই পথের উপর নির্ভরশীল। ফলে, এই প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং তা বিশ্ব অর্থনীতির উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

গত ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানে হামলার পর থেকে হরমুজ় কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি পায়, সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটে, এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের হঠাৎ এই ঘোষণা—যে যুদ্ধবিরতির সময়কালে সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে পারবে—নিশ্চয়ই তাৎপর্যপূর্ণ।

এই ঘোষণার পেছনে কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটটি আরও গভীর। ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রথম দফার শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর, দ্বিতীয় দফার প্রস্তুতি চলছিল। সেই আলোচনার প্রধান অন্তরায় ছিল লেবানন ও ইজ়রায়েলের সংঘাত। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সেই সংঘাতে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় একটি বড় ‘বাধা’ দূর হয়েছে। এর ফলে ইরানও তার অবস্থানে নমনীয়তা দেখিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেননি, বরং দুই পক্ষকে আলোচনায় বসানোর উদ্যোগও নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এমন সক্রিয়তা বিরল নয়, তবে এই ক্ষেত্রে সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে তা কার্যকর হয়েছে। ইরানের প্রতি তার প্রকাশ্য কৃতজ্ঞতাও একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে, যা উত্তেজনা প্রশমনে সহায়ক হতে পারে।

তবে এই পরিস্থিতিকে সরলভাবে ‘শান্তির সূচনা’ হিসেবে দেখা হয়তো তাড়াহুড়ো হবে। কারণ, পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতি বহুস্তরীয় এবং জটিল। ইরান, ইজ়রায়েল, লেবানন, এবং যুক্তরাষ্ট্র—প্রত্যেকের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। ইরানের জন্য হরমুজ় প্রণালী একটি শক্তিশালী চাপের হাতিয়ার। প্রয়োজনে এটি বন্ধ করে দিয়ে তারা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে, এটি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেবল সদিচ্ছার ফল নয়, বরং একটি কৌশলগত পদক্ষেপও হতে পারে।

একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়। পশ্চিম এশিয়ায় তাদের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন যেমন তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই ইজ়রায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তাদের অগ্রাধিকার। ফলে, এই ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ কাজ নয়।

অন্যদিকে, ইজ়রায়েল-লেবানন সংঘাতের মূল কারণগুলো এখনও অমীমাংসিত। সীমান্ত বিরোধ, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর সামরিক উপস্থিতি—এসব সমস্যার কোনও স্থায়ী সমাধান এখনও হয়নি। যুদ্ধবিরতি তাই আপাতত একটি ‘বিরামচিহ্ন’, পূর্ণচ্ছেদ নয়।

তবুও, এই মুহূর্তে আশার জায়গা রয়েছে। ইরানের হরমুজ় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক। বাংলাদেশ  সহ বহু উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের অর্থনীতি জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরশীল।

এই ঘটনাপ্রবাহ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে—কূটনীতির শক্তি। সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব, এই বার্তাটি আবারও সামনে এসেছে। যদিও এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ এবং অনিশ্চিত, তবুও এটি দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতার পথ দেখাতে পারে।

এখন মূল প্রশ্ন—এই পরিস্থিতি কতটা স্থায়ী হবে? যুদ্ধবিরতির সময়সীমা সীমিত। এর মধ্যে যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অর্থবহ অগ্রগতি না হয়, তবে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে, ইজ়রায়েল ও লেবাননের মধ্যে যদি আস্থা গড়ে না ওঠে, তবে সংঘাত পুনরায় শুরু হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

তাই এই মুহূর্তে প্রয়োজন ধৈর্য, সংলাপ, এবং পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এবং অন্যান্য শক্তিধর দেশগুলিকে এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, হরমুজ় প্রণালী খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধবিরতির ঘোষণাগুলি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। এগুলো পশ্চিম এশিয়ায় শান্তির সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, এই অঞ্চলে শান্তি সহজে আসে না—তবে একবার এলে তা বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে।

এই মুহূর্তে তাই সতর্ক আশাবাদই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত অবস্থান। বিশ্ব তাকিয়ে আছে—এই কূটনৈতিক উদ্যোগ কি সত্যিই নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে, নাকি এটি কেবল আরেকটি ক্ষণস্থায়ী বিরতি হয়ে থাকবে।

হাবিব বাবুল, প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডট কম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.