রবি সন্ধ্যা পাঠচক্রের আয়োজনে ফ্রাঙ্কফুর্টে বর্ষবরণে মিলনমেলা

ফ্রাঙ্কফুর্টে প্রবাসী বাংলাদেশিদের হৃদয়ে আবারও জেগে উঠল বাংলার চিরচেনা বৈশাখের আবেগ, আনন্দ আর ঐতিহ্যের স্পন্দন। গতকাল কর্মব্যস্ত দিনের ক্লান্তি ভুলে ফ্রাঙ্কফুর্ট ও আশপাশের বিভিন্ন শহর থেকে সমবেত হয়েছিলেন সংস্কৃতিমনা  প্রবাসী বাঙালি—শুধু একটি উপলক্ষ্যে, বাংলা নববর্ষকে হৃদয়ে ধারণ করে একসাথে উদযাপন করার জন্য। “রবি সন্ধ্যা পাঠচক্র”-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠান যেন প্রবাসের মাটিতে এক টুকরো বাংলাদেশকে তুলে ধরেছিল।

সুসজ্জিত হলরুমে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে রঙিন আলপনা, বৈশাখী মোটিফ, পান্তা-ইলিশের প্রতীকী উপস্থাপন, আর লাল-সাদা রঙের আধিক্যে ভরা  ঘুড়ি এক অপূর্ব পরিবেশ। যেন প্রকৃতিই এসে বলছে—“এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।”

অনুষ্ঠানের সূচনা হয় স্থানীয় শিল্পীদের কণ্ঠে “এসো হে বৈশাখ” গান পরিবেশনের মাধ্যমে। সুরের মূর্ছনায় মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে আবেগ আর নস্টালজিয়ার আবরণ। প্রবাসের মাটিতে দাঁড়িয়ে সেই চিরপরিচিত সুর যেন প্রত্যেকের হৃদয়ের গভীরে নাড়া দেয়, ফিরিয়ে নিয়ে যায় শৈশবের বৈশাখী সকাল, গ্রামবাংলার মেলা আর নতুন দিনের স্বপ্নে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন হাবিব বাবুল। তাঁর কণ্ঠে ছিল প্রবাস জীবনের বাস্তবতা, আবার একই সাথে ছিল মাতৃভূমির প্রতি গভীর ভালোবাসা। তিনি বলেন, এই ধরনের আয়োজন শুধু আনন্দের নয়, এটি আমাদের শিকড়ের সাথে সংযোগ রক্ষা করার এক আন্তরিক প্রচেষ্টা। তাঁর বক্তব্যে ছিল ঐক্যের আহ্বান, ছিল সংস্কৃতিকে ধরে রাখার দৃঢ় প্রত্যয়।

সমগ্র অনুষ্ঠানটি দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেন নুরুল আকন্দ খোকন। তাঁর সাবলীল উপস্থাপনা, প্রাণবন্ত উপস্থিতি এবং নিখুঁত সমন্বয় অনুষ্ঠানটিকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত ও গতিশীল।

কবিতা আবৃত্তির পর্ব ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম আবেগঘন অংশ। হ্যাপি উদ্দিন, দিলশাদ জাহান খান, বিলকিস সুলতানা এবং নুরুল আকন্দ খোকনের কণ্ঠে কবিতার পঙ্‌ক্তিমালা যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। প্রতিটি উচ্চারণে ছিল অনুভূতির গভীরতা, প্রতিটি শব্দে ছিল ভালোবাসা, সংগ্রাম এবং বাংলার চিরন্তন চেতনার প্রতিফলন। শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনেছেন, কখনো করতালিতে, কখনো নিঃশব্দ আবেগে সাড়া দিয়েছেন।

সঙ্গীত পরিবেশনা ছিল পুরো অনুষ্ঠানের প্রাণকেন্দ্র। রিয়েল আনোয়ার, নিম্নি কাদের, আতিকুর রহমান সবুজ, বাবুল তালুকদার এবং চৈতি বনোয়ারির  কণ্ঠে গানগুলো যেন একেকটি আবেগের তরঙ্গ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে উপস্থিত সবার মাঝে। কেউ গেয়েছেন লোকগান, কেউ আধুনিক, আবার কেউবা হৃদয়ছোঁয়া দেশাত্মবোধক গান। তাদের কণ্ঠের আবেগ, সুরের মাধুর্য আর পরিবেশনার আন্তরিকতা মিলে তৈরি হয়েছিল এক অনন্য সঙ্গীত সন্ধ্যা। শ্রোতারা কখনো গুনগুন করে সুর মিলিয়েছেন, কখনো হাততালিতে ভরিয়ে দিয়েছেন পুরো হল।

তবে শুধু সাংস্কৃতিক পরিবেশনাই নয়, এই আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় অংশ ছিল খাবারের আয়োজন। প্রবাসে বসে এমন বৈচিত্র্যময় ও সুস্বাদু বাঙালি খাবারের সমাহার সত্যিই বিরল। নিরামিষ পদ থেকে শুরু করে ঐতিহ্যবাহী ইলিশের বিভিন্ন রেসিপি—সবকিছুতেই ছিল ঘরোয়া স্বাদ, মায়ের হাতের রান্নার স্মৃতি, আর এক অদ্ভুত আবেগের ছোঁয়া।

পারভীন জাহাঙ্গীর, চৈতি বনোয়ারি , দিলশাদ জাহান খান,  ডায়মন্ড হীরা , নওরোজ বানু, মিসেস বদরুন্ননেসা রহমান এবং মিসেস আব্দুল মান্নান খান—এই নিবেদিতপ্রাণ নারীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি হয়েছিল এই  আয়োজন। প্রতিটি পদে ছিল যত্ন, ভালোবাসা এবং নিখুঁত স্বাদের সমন্বয়। সুগন্ধে ভরে উঠেছিল পুরো হল, আর প্রতিটি খাবার যেন নিজেই একটি গল্প বলছিল—বাংলার, শিকড়ের, স্মৃতির।

পান্তা-ইলিশের ঝাঁঝালো স্বাদ, ভর্তার সরল অথচ গভীর তৃপ্তি, মিষ্টান্নের মোলায়েম মাধুর্য—সব মিলিয়ে খাবারের এই আয়োজন যেন ছিল এক অপূর্ব রসনাতৃপ্তির উৎসব। অনেকেই বলছিলেন, “প্রবাসে থেকেও আজ যেন ঠিক দেশের স্বাদ পেলাম।”

এই পুরো আয়োজনটি শুধু একটি অনুষ্ঠান ছিল না, এটি ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের আত্মপরিচয়ের এক উজ্জ্বল প্রকাশ। ব্যস্ত জীবনের মাঝেও সবাই একত্রিত হয়েছেন, সময় দিয়েছেন, শ্রম দিয়েছেন—শুধু একটি লক্ষ্য নিয়ে, নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা।

সব মিলিয়ে, ফ্রাঙ্কফুর্টের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠান ছিল এক স্মরণীয়, আবেগঘন এবং প্রাণবন্ত আয়োজন। এটি প্রমাণ করে—বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কোনো ভৌগোলিক সীমারেখায় আটকে থাকে না; এটি বেঁচে থাকে মানুষের হৃদয়ে, ভালোবাসায়, আর এমনই সম্মিলিত প্রয়াসে।

প্রবাসে থেকেও যারা বাংলাকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছেন, তাদের এই ভালোবাসাই আমাদের আশার আলো।

 হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.