ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হতে পারে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন।
সম্প্রচারিত সাক্ষাৎকারের একটি অংশে ট্রাম্পকে বলতে শোনা যায়, ‘আমার মনে হয়, এটি (যুদ্ধ) শেষের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে, হ্যাঁ।’ নিজের বক্তব্যের ওপর জোর দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, এটি শেষ হওয়ার একদম দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।’
এদিকে ইরানের বন্দরগুলো দিয়ে সমুদ্রপথে সব ধরনের অর্থনৈতিক লেনদেন ও বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়ার দাবি করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেছেন, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ ‘পুরোপুরি কার্যকর’ করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে অ্যাডমিরাল কুপার বলেন, ‘ইরানের অর্থনীতির প্রায় ৯০ শতাংশ সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। অবরোধ আরোপের মাত্র ৩৬ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে মার্কিন বাহিনী সমুদ্রপথে ইরানের ভেতরে ও বাইরে সব ধরনের অর্থনৈতিক বাণিজ্য সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিতে সক্ষম হয়েছে।’ সেন্টকমের প্রধান আরও দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রসীমায় বর্তমানে মার্কিন বাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রয়েছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, ইরানের উপকূলীয় এলাকা বা বন্দরগুলোতে যেকোনো দেশের জাহাজ প্রবেশ বা বের হওয়ার ক্ষেত্রে এ অবরোধ কঠোরভাবে ও নিরপেক্ষভাবে কার্যকর করা হবে। ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করতে এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অন্যান্য ইস্যুতে সমঝোতায় বাধ্য করতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
অন্যদিকে ইরানের বন্দরগুলোতে আরোপিত মার্কিন নৌ-অবরোধ সব দেশের জাহাজের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোগ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সেন্টকম। সংস্থাটি বলেছে, ইরানের উপকূলীয় এলাকা বা বন্দরে প্রবেশকারী কিংবা সেখান থেকে বের হওয়া যেকোনো দেশের জাহাজের বিরুদ্ধে এ অবরোধ ‘নিরপেক্ষভাবে কার্যকর’ করা হচ্ছে।
সেন্টকম জানায়, অবরোধ কার্যকর করতে মার্কিন নৌবাহিনীর গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন করা হয়েছে। বিবৃতিতে সেন্টকম বলেছে, ‘একটি সাধারণ ডেস্ট্রয়ারে ৩০০-এরও বেশি নৌসেনা থাকেন, যারা আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনায় উচ্চ প্রশিক্ষিত।’
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তেহরানের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের কৌশলের অংশ হিসেবে ‘সমুদ্রে আটকা পড়ে থাকা ইরানি তেল বিক্রির যে স্বল্পমেয়াদী অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তার মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না।
আশার কথা, মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে সরাসরি আলোচনার পর ইসরায়েল ও লেবানন ‘উভয় পক্ষের সম্মতিতে নির্ধারিত সময়ে ও স্থানে’ পরবর্তী দফার বৈঠকে বসতে সম্মত হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের উপ-মুখপাত্রের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, কয়েক দশকের মধ্যে দুই দেশের মধ্যকার প্রথম এই সরাসরি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র আশা প্রকাশ করেছে যে এই সংলাপ ২০২৪ সালের চুক্তির পরিধি ছাড়িয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তিতে রূপ নেবে। যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করেছে যে শত্রুতা অবসানের যেকোনো চুক্তি অবশ্যই দুই দেশের সরকারের মধ্যে হতে হবে এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে থাকতে হবে; অন্য কোনো পথে পৃথকভাবে আলোচনা করা যাবে না।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র জোর দিয়ে বলেছে যে, এই আলোচনার মাধ্যমে লেবাননের জন্য বড় ধরনের পুনর্গঠন সহায়তা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথ খুলে যেতে পারে এবং উভয় দেশের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারিত হতে পারে। ইসরায়েল পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা সব অমীমাংসিত ইস্যু সমাধান করতে এবং অঞ্চলে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে টেকসই শান্তি অর্জনে সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অন্যদিকে লেবানন ২০২৪ সালের নভেম্বরে ঘোষিত শত্রুতা অবসানের চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। তারা দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের নীতিগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং চলমান সংঘাতের ফলে সৃষ্ট চরম মানবিক সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে আগামী সপ্তাহে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যদি দ্বিতীয় দফায় সরাসরি আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়, তবে সেখানেও মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। আলোচনার বিষয়ে অবগত একাধিক সূত্র সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছে। সূত্রগুলো আরও জানায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনারও এই সম্ভাব্য বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারেন। যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই কুশনার কূটনৈতিক আলোচনার নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ইরান যুদ্ধ থেকে উত্তরণে একটি কূটনৈতিক পথ খুঁজে বের করার দায়িত্ব নিজের শীর্ষ এই তিন উপদেষ্টাকেই দিয়েছেন ট্রাম্প এবং তাদের ওপর তার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। গত শনিবারের সেই ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠকের পর থেকেই একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে জেডি ভ্যান্স, স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইরানি পক্ষ এবং মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখছেন।

