মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আবারও অস্থিরতার ছায়া ঘনিয়ে উঠেছে। বহু প্রতীক্ষিত ওয়াশিংটন–তেহরান সংলাপ, যা আন্তর্জাতিক মহলে “ইসলামাবাদ বৈঠক” নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিল, শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যাওয়ায় নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক পর এমন উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বসা সত্ত্বেও ফলপ্রসূ কোনও সমাধান না আসায় প্রশ্ন উঠছে—এই ব্যর্থতা কি কেবল কূটনৈতিক অচলাবস্থার ফল, নাকি বৃহত্তর কৌশলগত দ্বন্দ্বেরই প্রতিফলন?
ইরানের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে অভিযোগ করা হয়েছে যে, তারা শান্তিচুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের “অযৌক্তিক শর্ত” এবং অবস্থান পরিবর্তনের কারণে আলোচনা ভেস্তে যায়। ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা শুধু ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের প্রতিধ্বনি। তাঁর মতে, “সদিচ্ছা থাকলে আমরাও এগোতাম”—এই মন্তব্যটি ইঙ্গিত দেয় যে, আলোচনার ব্যর্থতা শুধুমাত্র একটি বৈঠকের ব্যর্থতা নয়, বরং পারস্পরিক বিশ্বাসের সংকট।
অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আরও একধাপ এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘স্বৈরাচারী মনোভাব’ ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, ইরান নিজেকে সমমর্যাদার রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং কোনও চাপের মুখে সিদ্ধান্ত নিতে রাজি নয়। এটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং একটি কৌশলগত অবস্থান, যা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আরও বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রশাসনের নীতির ধারাবাহিকতায় এবারও চাপ প্রয়োগের কৌশল দেখা যাচ্ছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের পক্ষ থেকে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার হুঁশিয়ারি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে। উল্লেখযোগ্য যে, বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পড়বে।
ইরানের প্রতিক্রিয়াও কম তীব্র নয়। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মহম্মদ বাকের কালিবাফ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না। তাঁর বক্তব্যে যুদ্ধের প্রস্তুতির ইঙ্গিত যেমন রয়েছে, তেমনি আলোচনার দরজাও পুরোপুরি বন্ধ নয়—“যুক্তিতে এলে যুক্তির কথা হবে।” এই দ্বৈত বার্তা ইঙ্গিত করে যে, ইরান একদিকে শক্ত অবস্থান বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সমর্থনও হারাতে চায় না।
এই ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অবিশ্বাসের ইতিহাস অত্যন্ত দীর্ঘ। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক প্রায় শত্রুতার পর্যায়ে। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে নানা পর্যায়ে আলোচনা হলেও স্থায়ী কোনও সমাধান আসেনি। ফলে প্রতিটি আলোচনার পেছনে সন্দেহ ও সংশয়ের ছায়া থেকেই যায়।
দ্বিতীয়ত, এই সংঘাত শুধুমাত্র দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে বৃহত্তর আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক স্বার্থ। মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য—সবকিছুই এই দ্বন্দ্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী নিয়ে উত্তেজনা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে, যা ইতোমধ্যেই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তৃতীয়ত, এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতির সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরে। বহু দেশের মধ্যস্থতায় এই বৈঠক আয়োজন করা হলেও শেষ পর্যন্ত কোনও সমাধান না হওয়া দেখায় যে, যখন মূল পক্ষগুলোর মধ্যে আস্থার ঘাটতি থাকে, তখন বাহ্যিক প্রচেষ্টা খুব বেশি কার্যকর হয় না।
চতুর্থত, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং ইরানে নতুন নেতৃত্বের আগমন—দুই ক্ষেত্রেই নীতিগত অবস্থানের পরিবর্তন বা কঠোরতা আলোচনার ওপর প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী আবেগ এবং শক্তির প্রদর্শন অনেক সময় কূটনৈতিক সমঝোতাকে দুর্বল করে দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই পরিস্থিতি কি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে? যদিও উভয় পক্ষই সরাসরি যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন, তবুও ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং সামরিক প্রস্তুতি একটি ‘মিসক্যালকুলেশন’-এর ঝুঁকি তৈরি করে। ছোট একটি সংঘর্ষও বড় আকার ধারণ করতে পারে, যা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে দিতে পারে।
তবে আশার কথা হলো, এখনও কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্ত করে উপস্থাপন করলেও আলোচনার সম্ভাবনা অস্বীকার করেনি। আন্তর্জাতিক মহলের উচিত এই সুযোগকে কাজে লাগানো এবং একটি মধ্যপন্থা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা।
সবশেষে বলা যায়, ওয়াশিংটন–তেহরান উত্তেজনা কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক বিরোধ নয়; এটি বর্তমান বিশ্বের ক্ষমতার রাজনীতি, কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি। শান্তির পথ যতই কঠিন হোক না কেন, আলোচনার বিকল্প নেই—এই উপলব্ধিই হয়তো শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পারে ।
লেখক: হাবিব বাবুল, প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম ।

