প্রবাসে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশিদের জন্য এনআইডি প্রাপ্তি সহজীকরণ : সময়ের জরুরি দাবি

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে বাংলাদেশ শুধুমাত্র একটি ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি বৈশ্বিক সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি তাদের শ্রম, মেধা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। এই প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশের সন্তান বিদেশেই জন্মগ্রহণ করছে এবং বেড়ে উঠছে , এদের অনেকেই সেইসব দেশের নাগরিকত্ব গ্রহন করেছে    । এদের অনেকেই দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশি হিসেবে পরিচিত, কিন্তু  এদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট নেই । কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই প্রজন্মের একটি বড় অংশ এখনো বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা, বিশেষ করে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা জটিলতার সম্মুখীন।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় সব ধরনের নাগরিক সেবা গ্রহণের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র একটি অপরিহার্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ব্যাংক হিসাব খোলা, সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় বা হস্তান্তর, ট্যাক্স প্রদান, সিম নিবন্ধন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা ও চাকরির জন্যও এনআইডি অপরিহার্য। ফলে প্রবাসে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য এই পরিচয়পত্র না থাকা একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক ও আইনি বাধা সৃষ্টি করছে।

প্রথমত, সম্পত্তি সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক প্রবাসী পরিবার তাদের পূর্বপুরুষের সম্পত্তির উত্তরাধিকার হিসেবে বাংলাদেশে জমি বা বাড়ির মালিকানা রাখেন। কিন্তু তাদের সন্তানরা, যারা বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছে, তাদের  এনআইডি না থাকায় এই সম্পত্তি হস্তান্তর বা রক্ষণাবেক্ষণে গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হয়। ফলে দীর্ঘসূত্রতা, আইনি জটিলতা এবং কখনো কখনো প্রতারণার ঝুঁকিও তৈরি হয়।

দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও এনআইডির অভাব একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য এনআইডি বাধ্যতামূলক। প্রবাসে জন্ম নেওয়া কোনো বাংলাদেশি যদি দেশে বিনিয়োগ করতে চান বা সঞ্চয় রাখতে চান, তবে এনআইডি না থাকায় তা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এতে একদিকে যেমন দেশের সম্ভাব্য বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে প্রবাসীদের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, প্রবাসে জন্ম নেওয়া অনেক সন্তান পরবর্তীতে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে আগ্রহী হয়। তারা তাদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে চায়, দেশের সংস্কৃতি ও সমাজে সম্পৃক্ত হতে চায়। কিন্তু এনআইডি না থাকায় তারা নাগরিক হিসেবে পূর্ণাঙ্গ অধিকার ভোগ করতে পারে না। এতে তাদের মধ্যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় ঐক্য ও পরিচয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে, প্রবাসে জন্মগ্রহণকারী বাংলাদেশিদের জন্য এনআইডি প্রদান প্রক্রিয়াকে সহজ, দ্রুত এবং কার্যকর করার বিষয়টি এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার এবং জাতীয় সংসদের সক্রিয় উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।

প্রথমত, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোকে এনআইডি নিবন্ধন ও বিতরণের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে হবে। বর্তমানে অনেক দূতাবাসে পাসপোর্ট সেবা প্রদান করা হলেও এনআইডি সেবা সীমিত বা অনুপস্থিত। প্রযুক্তির উন্নয়নের এই যুগে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ, যাচাইকরণ এবং কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা খুব কঠিন কাজ নয়। দূতাবাসগুলোকে এই সেবার আওতায় আনলে প্রবাসীরা সহজেই তাদের অবস্থানরত দেশ থেকেই এনআইডি সংগ্রহ করতে পারবেন।

দ্বিতীয়ত, একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো প্রণয়ন করা প্রয়োজন। জাতীয় সংসদে একটি আইন পাশ করে প্রবাসে জন্মগ্রহণকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য এনআইডি প্রাপ্তির যোগ্যতা, প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় দলিলাদি নির্ধারণ করা উচিত। এই আইনে জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, পিতামাতার নাগরিকত্ব ইত্যাদি বিষয়গুলোকে বিবেচনায় রেখে একটি স্বচ্ছ ও সহজ প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়াতে হবে। একটি অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে প্রাথমিক আবেদন গ্রহণ, তথ্য যাচাই এবং অ্যাপয়েন্টমেন্ট নির্ধারণের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এতে সময় ও খরচ উভয়ই কমবে এবং প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে।

চতুর্থত, প্রবাসী কমিউনিটির সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কমিউনিটি সংগঠনগুলো এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তারা সচেতনতা বৃদ্ধি, তথ্য প্রদান এবং প্রাথমিক সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে সরকারের উদ্যোগকে সফল করতে পারে।

সবশেষে, বিষয়টি শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সেবা নয়; এটি জাতীয় পরিচয়, অধিকার এবং অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন। প্রবাসে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশিরাও এই দেশেরই নাগরিক, তাদের শিকড় এই মাটিতেই প্রোথিত। তাদের জন্য এনআইডি প্রাপ্তি সহজ করা মানে তাদেরকে দেশের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা, তাদের সঙ্গে দেশের সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করা।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক নতুন দিগন্তে প্রবেশ করেছে। এই অগ্রযাত্রায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান অনস্বীকার্য। তাই তাদের এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। জাতীয় সংসদে দ্রুত আইন পাশ করে এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি।

এখনই সময়—প্রবাসে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশিদের জন্য এনআইডি প্রাপ্তিকে সহজ, সুলভ এবং বাস্তবসম্মত করে তোলার। এতে উপকৃত হবে ব্যক্তি, পরিবার এবং সর্বোপরি বাংলাদেশ রাষ্ট্র নিজেই।

লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.