মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আবারও উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালী ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে নতুন করে অস্থির করে তুলেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—যদি ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাঁর আহ্বানে সাড়া না দেয়, তাহলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন এই সামরিক জোটের ভবিষ্যৎ ভালো হবে না। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীর অবরোধ সরাতে সামরিক অভিযানও চালানো হতে পারে। তাঁর আহ্বান ছিল—চীন, ফ্রান্স ও ব্রিটেনসহ শক্তিধর দেশগুলো যেন যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে এই অভিযানে অংশ নেয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দেয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এই পরিস্থিতিতে কি ন্যাটো জোট ভেঙে যেতে পারে? নাকি যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষ করে ট্রাম্প, আন্তর্জাতিক মঞ্চে ক্রমশ একা হয়ে পড়ছেন?
প্রথমত, ন্যাটো একটি বহুপাক্ষিক সামরিক জোট, যার ভিত্তি পারস্পরিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের ওপর দাঁড়িয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব মোকাবিলার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত এই জোট আজও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক কাঠামো হিসেবে টিকে আছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে ন্যাটোর ভেতরে মতপার্থক্যও কম দেখা যায়নি। প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ, বহুপাক্ষিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা এবং “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির কারণে ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে বর্তমান উত্তেজনা সেই আস্থার সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে আন্তর্জাতিক জোট গড়ে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে। কিন্তু ইউরোপীয় দেশগুলো এই সংঘাতকে সামরিকভাবে না বাড়িয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে আগ্রহী। তারা আশঙ্কা করছে, একটি সামরিক অভিযান পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে এবং তার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও মারাত্মকভাবে পড়বে।
এখানে আরেকটি বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। ন্যাটো মূলত উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গঠিত। হরমুজ প্রণালী বা ইরানকে ঘিরে যে সংঘাত তৈরি হয়েছে, তা সরাসরি ন্যাটোর চুক্তির আওতায় পড়ে না। ফলে ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রগুলো স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছে—এটি কি সত্যিই ন্যাটোর সম্মিলিত যুদ্ধ হওয়া উচিত, নাকি এটি যুক্তরাষ্ট্রের একক কৌশলগত উদ্যোগ?
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই পরিস্থিতি ন্যাটোর ভাঙনের ইঙ্গিত দেয় না। বরং এটি জোটের ভেতরে নীতিগত পার্থক্যের প্রতিফলন মাত্র। ইতিহাসে এর আগেও ন্যাটোর সদস্যদের মধ্যে বড় মতবিরোধ দেখা গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময়ও ফ্রান্স ও জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু সেই মতবিরোধ সত্ত্বেও ন্যাটো ভেঙে যায়নি।
তবে এটিও সত্য যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একক নেতৃত্ব আগের মতো অটুট নেই। গত এক দশকে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। চীন দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে, রাশিয়া আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পুনরায় সক্রিয় হয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ নিয়ে বেশি সচেতন হয়ে উঠেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি উদ্যোগে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিত্রদের সমর্থন পাওয়া এখন আর সহজ নয়।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনার পেছনে মূল কারণ হলো বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। যদি এই পথ বন্ধ হয়ে যায় বা সামরিক সংঘাত শুরু হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন সংকটে পড়তে পারে। তাই অনেক দেশই এই অঞ্চলে যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
ট্রাম্পের কঠোর বক্তব্যকে অনেকেই কৌশলগত চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবে দেখছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়, কোনো দেশ সামরিক শক্তির ইঙ্গিত দিয়ে কূটনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে। ট্রাম্পের বক্তব্যও হয়তো সেই কৌশলেরই অংশ—যার মাধ্যমে তিনি মিত্রদের ওপর চাপ তৈরি করতে চাইছেন।
তবে এই কৌশল কতটা সফল হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে সামরিক অভিযান শুরু করে, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। ইরান একটি আঞ্চলিক শক্তি, যার সামরিক সক্ষমতা এবং মিত্র নেটওয়ার্ককে অবহেলা করা যায় না। পারস্য উপসাগর অঞ্চলে তাদের প্রভাবও যথেষ্ট শক্তিশালী। ফলে যুদ্ধ শুরু হলে তা দ্রুতই বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
এই সংঘাতের সম্ভাব্য ফলাফল বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি দৃশ্যপট সামনে আসে। প্রথমত, সীমিত সামরিক সংঘাত হতে পারে—যেখানে যুক্তরাষ্ট্র কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাবে এবং পরে কূটনৈতিক আলোচনার পথ খুলে যাবে। দ্বিতীয়ত, সংঘাত বড় আকার ধারণ করতে পারে, যেখানে পারস্য উপসাগর অঞ্চলের বিভিন্ন শক্তি জড়িয়ে পড়বে এবং বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। তৃতীয়ত, সামরিক সংঘাতের বদলে কূটনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পথেই উত্তেজনা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিশ্ব রাজনীতিতে এখন বহুমেরুকেন্দ্রিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে এককভাবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোকে পরিচালনা করত, এখন সেই অবস্থান অনেকটাই বদলে গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো সামরিক উদ্যোগে মিত্রদের সমর্থন নিশ্চিত করা আগের চেয়ে কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে এটাকে যুক্তরাষ্ট্রের নিঃসঙ্গ হয়ে পড়া হিসেবে সরলভাবে ব্যাখ্যা করাও ঠিক হবে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সবসময়ই স্বার্থের সমীকরণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো দেশ তখনই অন্য দেশের সঙ্গে সামরিক অভিযানে যুক্ত হয়, যখন তাদের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ এতে জড়িত থাকে। হরমুজ সংকটের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতাই কাজ করছে।
অতএব বলা যায়, ন্যাটো ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা আপাতত খুব কম। তবে এই সংকট জোটের ভেতরে যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিভাজন রয়েছে, তা নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। ভবিষ্যতে ন্যাটোর ভূমিকা কী হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব কতটা গ্রহণযোগ্য থাকবে—সেই প্রশ্নগুলো আরও জোরালোভাবে আলোচনায় আসতে পারে।
শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুদ্ধ কখনোই সহজ সমাধান নয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মতো জটিল অঞ্চলে সামরিক সংঘাত প্রায়ই অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে দেয়। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে প্রয়োজন কূটনৈতিক সংলাপ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে সমস্যার সমাধান খোঁজা।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে বর্তমান উত্তেজনা হয়তো সাময়িক একটি রাজনৈতিক মুহূর্ত। কিন্তু এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বিশ্ব রাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আন্তর্জাতিক জোট ও কৌশলগুলোকেও নতুন করে ভাবতে হবে।
লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

