বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এমন কিছু দিন আছে, যেগুলো কেবল একটি তারিখ নয়—একটি জাতির চেতনা, সাহস এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনার প্রতীক। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তেমনই এক দিন। সেই দিন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যে জনসমুদ্রের সৃষ্টি হয়েছিল, তা শুধু একটি রাজনৈতিক সমাবেশ ছিল না; বরং ছিল বাঙালি জাতির দীর্ঘ বঞ্চনা, ক্ষোভ এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার এক বিস্ফোরিত প্রকাশ। আমি তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। বয়সে ছোট হলেও সময়ের উত্তাল রাজনীতি আমাদের মতো তরুণদেরও গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। আমার মামা আমজাদ হোসেন ছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের একজন নেতা এবং সিটি ল কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক। তার হাত ধরেই আমি প্রথম রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হই।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শুরু থেকেই পূর্ব বাংলার বাতাসে অস্থিরতা এবং প্রত্যাশা একসঙ্গে মিশে ছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালির নিরঙ্কুশ বিজয় সত্ত্বেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করছিল। ঢাকার রাস্তাঘাট, অলিগলি, চায়ের দোকান, স্কুল-কলেজ—সব জায়গায় একটাই আলোচনা: কী হতে যাচ্ছে সামনে? সেই প্রেক্ষাপটে ৭ মার্চের জনসভা হয়ে উঠেছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের প্রতীক্ষা।
আমাদের এলাকায় তখন দিন কয়েক আগে থেকেই জনসভার প্রচার শুরু হয়ে গিয়েছিল। মাইকিং করা হতো, লিফলেট বিলি করা হতো, মানুষকে জানানো হতো যে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনসভা হবে। সেই প্রচার কাজেও আমি অংশ নিয়েছিলাম। ছোট হলেও মনে হতো আমি যেন ইতিহাসের কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে যুক্ত হয়েছি। হাতে লিফলেট নিয়ে বাড়ি বাড়ি বা দোকানে গিয়ে দিতাম, মাইকিংয়ের সময় মিছিলের সঙ্গে হাঁটতাম। মানুষের চোখে তখন এক ধরনের অদ্ভুত আলো দেখতাম—উত্তেজনা, আশা আর অজানা ভবিষ্যতের উদ্বেগ।
৭ মার্চের দিন সকাল থেকেই আমাদের এলাকায় মানুষের ঢল নামে। মিছিলের প্রস্তুতি চলছিল। হাতে অনেকের হাতে প্ল্যাকার্ড, কেউ স্লোগান দিচ্ছে, কেউ গান গাইছে। আমি আমার মামার সঙ্গে মিছিলে যোগ দিলাম। আমাদের মিছিলটি পুরান ঢাকার চকবাজার হয়ে নাজিমউদ্দিন রোড দিয়ে এগোতে থাকে। চারপাশে শুধু মানুষ আর মানুষ। মনে হচ্ছিল পুরো ঢাকা শহর যেন এক বিশাল স্রোতের মতো রেসকোর্স ময়দানের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে।
দুপুর আড়াইটার দিকে আমরা পৌঁছে গেলাম তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের সেই বিশাল জনসমুদ্রে। জীবনে এর আগে আমি এত মানুষ একসঙ্গে কখনো দেখিনি। যত দূর চোখ যায়, শুধু মানুষের মাথা। কেউ গাছে উঠে বসেছে, কেউ উঁচু জায়গা খুঁজে দাঁড়িয়েছে, কেউ আবার মাটিতে বসে অপেক্ষা করছে সেই মুহূর্তটির জন্য। জনতার মাঝে এক ধরনের নীরব উত্তেজনা কাজ করছিল—সবাই অপেক্ষা করছে একজন মানুষের কথা শোনার জন্য।
সেই মানুষটি ছিলেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । তার কণ্ঠস্বর তখন পুরো জাতির আশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি সরাসরি রেডিওতে প্রচার করার কথা ছিল। কিন্তু নানা রাজনৈতিক চাপে সেদিন তা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়নি। জনসভা শেষে অনেকেই হতাশ হয়েছিল এই ভেবে যে দেশের দূরদূরান্তের মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে ভাষণটি শুনতে পারেনি। তবে পরদিন সকালে, সম্ভবত সকাল দশটার দিকে, রেডিওতে ভাষণটি প্রচার করা হয়। তখন সারা দেশের মানুষ সেই ভাষণ শুনে নতুন করে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে।
রেসকোর্স ময়দানের সেই বিকেলে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা ছিল ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। তিনি সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলেও তার প্রতিটি বাক্যে ছিল স্বাধীনতার স্পষ্ট ইঙ্গিত। যখন তিনি উচ্চারণ করলেন—“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—তখন জনতার ভেতর যেন এক বৈদ্যুতিক স্রোত বয়ে গেল। চারদিকে স্লোগান, উল্লাস আর আবেগের বিস্ফোরণ ঘটে। আমি তখন ছোট হলেও সেই মুহূর্তের আবেগ আজও স্পষ্টভাবে মনে করতে পারি।
তার ভাষণে তিনি বাঙালি জাতিকে প্রস্তুত হতে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে, যা ছিল আসন্ন সংগ্রামের প্রতীকী আহ্বান। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে তখনও পাকিস্তানি শাসকদের সঙ্গে আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেননি। কারণ তিনি জানতেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় তখন কৌশলগত অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
তবে তার ভাষণের প্রতিটি শব্দ বাঙালি জাতিকে একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছিল। মানুষ বুঝে গিয়েছিল যে স্বাধীনতার পথ আর দূরে নয়। সেই দিন থেকেই মূলত স্বাধীনতার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় সর্বস্তরে। গ্রামেগঞ্জে, শহরে, ছাত্র-যুবকদের মাঝে, এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক নতুন চেতনা জেগে ওঠে।
আমার নিজের জীবনেও সেই দিনটি ছিল এক গভীর অভিজ্ঞতা। একজন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র হিসেবে আমি হয়তো রাজনীতির সব জটিলতা বুঝতাম না, কিন্তু বুঝতে পারতাম যে আমরা ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সাক্ষী। মিছিলের ভেতরে হাঁটা, লিফলেট বিতরণ করা, মানুষের উচ্ছ্বাস দেখা—সব মিলিয়ে মনে হয়েছিল আমিও যেন দেশের জন্য একটি ছোট দায়িত্ব পালন করছি।
পরবর্তী সময়ের ঘটনাবলি আমরা সবাই জানি। মার্চ মাসের শেষ দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস দমন-পীড়ন শুরু হয়, যা পরিণত হয় মুক্তিযুদ্ধে। কিন্তু সেই সংগ্রামের বীজ বপন হয়েছিল ৭ মার্চের সেই ভাষণের মধ্য দিয়েই।
আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়, ৭ মার্চ শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ঘোষণা। এটি ছিল শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখার শক্তি এবং সংগ্রামের অঙ্গীকার।
বাংলাদেশের ইতিহাসে তাই ৭ মার্চ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। সেই দিন রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে যে লাখো মানুষ বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে স্বাধীনতার ইঙ্গিত শুনেছিল, তারা প্রত্যেকে ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। আমিও তাদেরই একজন—একজন কিশোর, যে সেদিন জনসমুদ্রের ভেতর দাঁড়িয়ে বুঝতে শুরু করেছিল স্বাধীনতার মূল্য কত গভীর।
আজ যখন নতুন প্রজন্ম স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে বড় হচ্ছে, তখন তাদের জানা প্রয়োজন সেই সময়ের ইতিহাস, সেই মানুষের সাহস এবং সেই ভাষণের গুরুত্ব। কারণ একটি জাতি তার অতীতের স্মৃতি থেকেই ভবিষ্যতের পথ খুঁজে নেয়।
৭ মার্চের সেই বিকেল তাই শুধু স্মৃতি নয়; এটি আমাদের জাতির চিরন্তন প্রেরণা।
লেখক: হাবিব বাবুল, প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

