স্বাধীনতার ইশতেহারের প্রেক্ষাপট এবং রচনার ইতিহাস

একাত্তরের মার্চ ছিল বাঙালির ইতিহাসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মাস। দীর্ঘ রাজনৈতিক বঞ্চনা, নির্বাচন-পরবর্তী অচলাবস্থা এবং পাকিস্তানি সামরিক জান্তার ষড়যন্ত্রে তখন ক্ষুব্ধ সমগ্র পূর্ববাংলা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরও ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা পরিস্থিতিকে ক্রমশ বিস্ফোরণমুখী করে তোলে। এরই প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ-এর আহ্বানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর ঐতিহাসিক বটতলায় যে ছাত্রসমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, তা দ্রুতই রূপ নেয় এক বিশাল জনসমুদ্রে।

সেদিনের পরিবেশ ছিল একই সঙ্গে আবেগময় ও দৃপ্ত প্রত্যয়ের। চারদিকে গগনবিদারী ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি, শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত ক্যাম্পাস, আর লাখো তরুণের চোখে স্বাধীনতার অদম্য স্বপ্ন। এই সমাবেশেই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত স্বাধীন বাংলার পতাকা উন্মোচিত হয়। পতাকা উত্তোলনের সেই মুহূর্তে জনতার উচ্ছ্বাস ছিল ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। বহু মানুষের কাছে এটি ছিল স্বাধীন রাষ্ট্রের মানসিক ঘোষণা—একটি জাতির আত্মপরিচয়ের দৃশ্যমান প্রতীক।

দিনের কর্মসূচি শেষ হলেও রাজনৈতিক তৎপরতা থেমে থাকেনি। বিকেলে বসে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। ছাত্রলীগ ও সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রূপরেখা, জাতীয় প্রতীক এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন। এই আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন সিরাজুল আলম খান। তিনি ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মীকে নিয়ে বসেন সিদ্ধান্তমূলক বৈঠকে। আলোচনায় উঠে আসে স্বাধীন রাষ্ট্রের কাঠামো, জাতীয় পতাকার স্বীকৃতি, জাতীয় সংগীত নির্ধারণ এবং নেতৃত্বের প্রশ্ন। কয়েকজন সংগঠক পয়েন্ট আকারে নোট নিতে থাকেন—যা পরবর্তীতে স্বাধীনতার ইশতেহার রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

এ সময় ইকবাল হলে এসে উপস্থিত হন শেখ ফজলুল হক মনি। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি ও সিরাজুল আলম খান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংগঠক রায়হান ফিরদাউস মধু-কে সঙ্গে নিয়ে ইকবাল হলের তিন তলার ৩১৩ নম্বর কক্ষে যান। কক্ষটি ছিল তৎকালীন ছাত্রনেতা আ স ম আবদুর রব-এর। ইতিহাসের এক গোপন অথচ তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয় এই ছোট্ট কক্ষেই।

সেই কক্ষে বসেই স্বাধীনতার খসড়া ইশতেহার প্রস্তুত করা হয়। সিরাজুল আলম খান ও শেখ ফজলুল হক মনির উপস্থিতিতে রায়হান ফিরদাউস মধু খসড়া লিখতে শুরু করেন। আলোচনার সারাংশকে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ভাষায় রূপ দেওয়া হয়। এটি ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক বিবৃতি নয়; ছিল এক স্বাধীন জাতির ঘোষণাপত্রের প্রাথমিক রূপ।

খসড়া প্রণয়নের সময় কয়েকটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রথমত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর গান আমার সোনার বাংলা-কে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। এই সিদ্ধান্ত ছিল সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের স্পষ্ট ঘোষণা। পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালি সংস্কৃতিকে দমিয়ে রাখার যে প্রচেষ্টা চলছিল, তার বিরুদ্ধে এটি ছিল সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রতীকী জবাব।

দ্বিতীয়ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-কে। ইতোমধ্যেই তিনি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর নেতৃত্বেই স্বাধিকার আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগোচ্ছিল। ইশতেহারে তাঁর নেতৃত্বের স্বীকৃতি ছিল রাজনৈতিক ঐক্যের সুস্পষ্ট প্রকাশ।

সেদিন রাতেই খসড়া ইশতেহারটি লিফলেট আকারে ছাপিয়ে ফেলা হয়। সময় ছিল অল্প, পরিস্থিতি ছিল টানটান। কিন্তু দৃঢ় সংকল্প ছিল অটুট। ‘জয় বাংলা—ইশতেহার নং ১ (স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ঘোষণা ও কর্মসূচী)’ শিরোনামে প্রস্তুত এই ঐতিহাসিক দলিল ছিল মূলত একটি দিকনির্দেশনা। এতে স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা, সংগ্রামের রূপরেখা এবং জনগণকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান ছিল সুস্পষ্ট।

৩ মার্চ ১৯৭১। স্থান—পল্টন ময়দান। ছাত্রলীগের ডাকে আয়োজিত বিশাল ছাত্রজনসভা। সমগ্র ঢাকা তখন উত্তেজনায় টগবগ করছে। হাজার হাজার ছাত্র-জনতা ভিড় জমায় পল্টনে। সভা শুরুর কিছুক্ষণ আগে সেখানে উপস্থিত হন বাঙালির প্রাণের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর আগমন জনতার আবেগকে আরও তীব্র করে তোলে।

এই জনসভায় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহারটি পাঠ করেন। উচ্চকণ্ঠে ঘোষিত হয় স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের কথা। পল্টনের আকাশে ধ্বনিত হয় স্বাধীনতার শপথ। জনতা করতালিতে, শ্লোগানে, উচ্ছ্বাসে ইশতেহারকে স্বাগত জানায়। এটি ছিল জনগণের সম্মুখে স্বাধীনতার প্রথম সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্য।

এই ইশতেহার পাঠের গুরুত্ব ছিল বহুমাত্রিক। প্রথমত, এটি পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে সরাসরি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, এটি বাঙালি জাতিকে স্পষ্ট বার্তা দেয়—স্বাধীনতার লড়াই এখন আর কেবল দাবির পর্যায়ে নেই; এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পথে। তৃতীয়ত, এটি আন্তর্জাতিক মহলের কাছেও একটি রাজনৈতিক সংকেত বহন করে যে পূর্ববাংলায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা সুসংগঠিত ও নেতৃত্বনির্ভর।

মার্চের প্রতিটি দিন তখন ইতিহাস রচনার দিন। ৩ মার্চের এই ইশতেহার পাঠ ছিল ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পূর্বভূমিকা। পরবর্তীতে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে। আর ২৫ মার্চের কালরাত্রির পর ২৬ মার্চ স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধকে সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ দেয়। কিন্তু এসবের বীজ নিহিত ছিল মার্চের শুরুতেই—ছাত্রসমাজের দৃপ্ত উচ্চারণে, পল্টনের ইশতেহারে।

পল্টনের সেই জনসভা প্রমাণ করেছিল যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের নয়; এটি ছিল জনতার হৃদয়ের দাবি। ছাত্রসমাজ ছিল সেই দাবির অগ্রদূত। তাদের সংগঠিত উদ্যোগ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতা স্বাধীনতার সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে।

আজ ইতিহাসের দূরত্ব থেকে ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয়—৩ মার্চ ১৯৭১ ছিল এক প্রতীকী দিন। এটি ছিল আত্মপরিচয়ের ঘোষণা, সাংস্কৃতিক মুক্তির উচ্চারণ এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার অঙ্গীকার। পল্টনের সেই মঞ্চে উচ্চারিত শব্দগুলোই পরবর্তীকালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণায় পরিণত হয়।

একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চ আমাদের শিখিয়েছে—স্বাধীনতা আকস্মিকভাবে আসে না; তা আসে দীর্ঘ সংগ্রাম, সুসংগঠিত প্রস্তুতি এবং সাহসী সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। পল্টনে পাঠ করা স্বাধীনতার ইশতেহার সেই সাহসী সিদ্ধান্তের এক ঐতিহাসিক দলিল, যা আজও বাঙালির জাতীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।

লেখক: হাবিব বাবুল, প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম  । 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.