মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ নতুন কিছু নয়। কিন্তু যখন কোনো সংঘাত সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুকে স্পর্শ করে, তখন তা শুধু আঞ্চলিক সংঘাত থাকে না—এটি পরিণত হয় বিশ্ব অর্থনীতির সংকটে। সাম্প্রতিক ইরান-মার্কিন উত্তেজনা এবং পারস্য উপসাগরে সংঘাতের বিস্তার সেই বাস্তবতারই একটি নতুন অধ্যায়। বিশেষ করে ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে মার্কিন হামলার খবর আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
খার্গ দ্বীপ আকারে ছোট হলেও এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিশাল। ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপ থেকেই পরিচালিত হয়। ফলে এটি শুধু একটি তেল টার্মিনাল নয়, বরং ইরানের অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ধমনী। এই দ্বীপের কার্যক্রম ব্যাহত হলে ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে—এ কথা বলাই বাহুল্য। তবে বিষয়টি শুধু ইরানের অর্থনীতি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এবং বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ওপর।
বিশ্ব অর্থনীতিতে তেলের গুরুত্ব এখনও অপরিসীম। নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন এবং কৃষি ব্যবস্থার বড় অংশ এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যারেল তেল বিশ্ববাজারে প্রবেশ করে। এই প্রবাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে।
যদি খার্গ দ্বীপে হামলার ফলে ইরানের তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, তাহলে বিশ্ববাজারে সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের যে কোনো বড় সংঘাতের সময় তেলের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে।
তেলের দাম বৃদ্ধি শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, উৎপাদন খরচ বাড়ে, খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে একটি আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির ঢেউ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক হতে পারে। এসব দেশের অধিকাংশই তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তাদের বৈদেশিক মুদ্রার বড় অংশ ব্যয় হয় জ্বালানি আমদানিতে। যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ে, তখন এসব দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকে।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল বা আফ্রিকার অনেক দেশ ইতিমধ্যেই বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে ভুগছে। তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে তাদের অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে। সরকারকে হয় ভর্তুকি বাড়াতে হবে, নয়তো জ্বালানির দাম বাড়াতে হবে—দুই ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের ওপর বোঝা পড়বে।
তেলের দাম বৃদ্ধির আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে খাদ্য নিরাপত্তায়। কৃষি উৎপাদনের অনেক ধাপই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল—সেচ, পরিবহন, সার উৎপাদন সবকিছুতেই জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে খাদ্যের দামও বাড়ে। উন্নয়নশীল দেশে যেখানে জনগণের বড় অংশ আয়ের অধিকাংশই খাদ্যে ব্যয় করে, সেখানে এটি সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।
ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে খাদ্য ও জ্বালানি সংকট রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। আরব বসন্তের সময়ও খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে রূপ নেয়, তবে তার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও বিস্তৃত হতে পারে।
এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথের নিরাপত্তা। পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান যদি এই রুটের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা বা বাধা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে শুধু তেলের দামই নয়, জাহাজ চলাচলের বীমা খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং সামগ্রিক বাণিজ্য ব্যয় বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে শিল্প উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, ইরানের তেল রপ্তানি কাঠামো দুর্বল করে দেওয়া হলে দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমে যাবে। এর ফলে ইরানের সামরিক ও আঞ্চলিক প্রভাব কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এমন পদক্ষেপ আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি বরাবরই জটিল। এখানে জ্বালানি সম্পদ, সামরিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ফলে একটি সামরিক পদক্ষেপের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা অর্থনীতি, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটও অত্যন্ত সংবেদনশীল। মহামারির পরবর্তী পুনরুদ্ধার, মুদ্রাস্ফীতি, ঋণ সংকট এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা—সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এখনও স্থিতিশীল নয়। এই সময়ে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট দেখা দিলে তা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকে আরও ধীর করে দিতে পারে।
তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ ইতিমধ্যে ঋণ সংকটে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা অন্যান্য ঋণদাতাদের ওপর তাদের নির্ভরতা বেড়েছে। তেলের দাম বাড়লে এসব দেশের বাজেট ঘাটতি বাড়বে এবং নতুন ঋণের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। ফলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আরও সীমিত হয়ে পড়বে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ব রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—জ্বালানি নিরাপত্তা কি আবারও বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে? যদি তাই হয়, তবে এর প্রভাব আগামী কয়েক দশক পর্যন্ত বৈশ্বিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
অন্যদিকে এই সংকট নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্বও নতুনভাবে সামনে আনতে পারে। অনেক দেশ ইতিমধ্যেই সৌর, বায়ু ও অন্যান্য বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। জ্বালানি সরবরাহে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি যত বাড়বে, বিকল্প জ্বালানির দিকে বিশ্ব তত দ্রুত অগ্রসর হতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, এই পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ। আগামী কয়েক দশক পর্যন্ত তেল ও গ্যাস বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়েই থাকবে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যে কোনো বড় সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে।
খার্গ দ্বীপকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি সামরিক ঘটনার বিষয় নয়। এটি বিশ্ব জ্বালানি রাজনীতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
যদি সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হতে পারে সেই দেশগুলোকে, যাদের এই সংঘাতে সরাসরি কোনো ভূমিকা নেই—তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ মানুষ। তাদের জন্য তেলের দাম বৃদ্ধি মানে শুধু জ্বালানি সংকট নয়; এটি খাদ্য, পরিবহন এবং জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন চাপের সূচনা।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—যুদ্ধের ময়দান যত দূরেই হোক, তার অর্থনৈতিক ঢেউ পৌঁছে যায় বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। খার্গ দ্বীপকে ঘিরে বর্তমান উত্তেজনাও সেই বাস্তবতারই আরেকটি সম্ভাব্য উদাহরণ।
অতএব প্রশ্নটি শুধু একটি দ্বীপ বা একটি তেল টার্মিনালকে ঘিরে নয়। প্রশ্নটি হলো—বিশ্ব অর্থনীতি কতটা প্রস্তুত এমন একটি সংঘাতের অভিঘাত সামলানোর জন্য, এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো কি সেই ঝড় মোকাবিলা করার মতো শক্তি অর্জন করেছে?
সম্ভবত এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে বর্তমান সংকট ভবিষ্যতে কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত হিসেবেই থাকবে, নাকি তা বিশ্ব অর্থনীতির নতুন অস্থিরতার সূচনা করবে।
হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক , শুদ্ধস্বর ডটকম ।

