জার্মানির হাইডেলবার্গে অবস্থিত ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর কম্পারেটিভ পাবলিক ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ল–এর পরিচালক অ্যান পিটার্সও এমন মত দিয়েছেন। তিনি জার্মান সরকারের আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।
ইরানে চলমান একতরফা হামলার পর আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে; যেসব রাষ্ট্রে স্বৈরাচারী শাসন চলছে এবং যেখানে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে, সেখানে কি সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সেই শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করা ন্যায্য হতে পারে? ইরানের ক্ষেত্রে কি মানবিক হস্তক্ষেপের যুক্তি দেওয়া সম্ভব?
মানবিক হস্তক্ষেপের অতীতের ঘটনা
মানবিক হস্তক্ষেপের ধারণা আন্তর্জাতিক আইনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। ১৯৯৯ সালে বলকান অঞ্চলের দেশ কসোভোয় ন্যাটোর সামরিক অভিযানের সময় এই যুক্তি সামনে আনা হয়েছিল। তখন সার্বিয়ার বাহিনীর বিরুদ্ধে আলবেনীয় বেসামরিক জনগণের ওপর গণহত্যাসদৃশ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে।
তবে অ্যান পিটার্সের মতে, মানবিক হস্তক্ষেপের ধারণা সহজেই অপব্যবহারের ঝুঁকিতে থাকে। কসোভো হামলা ও গণহত্যার ইস্যু নিয়ে তীব্র বিতর্কের পরও আন্তর্জাতিক আইনে এই ধারণা শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা পায়নি।
পিটার্সের মতে, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা চালানোর কারণে এই হামলা করা হয়েছে; এমন যুক্তি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল সামনে আনেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, তিনি ইরানি জনগণকে সহায়তা করবেন। কিন্তু হামলা শুরু হওয়ার পর মানবিক হস্তক্ষেপের যুক্তি আর সামনে আনা হচ্ছে না। বরং এখন বলা হচ্ছে, লক্ষ্য হলো শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন।
নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থা
অ্যান পিটার্স মনে করেন, বড় কোনো সংকটের পর আন্তর্জাতিক আইন প্রায়ই নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা হয় কিংবা বিকশিত হয়। যেমন ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যার পর ‘রেসপনসিবিলিটি টু প্রটেক্ট’ বা ‘সুরক্ষার দায়িত্ব’ ধারণাটি সামনে আসে। এই নীতির অধীনে গণহত্যা, জাতিগত নিধন বা মানবতাবিরোধী অপরাধের আশঙ্কা দেখা দিলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ করার নৈতিক দায়িত্ব থাকে।
কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে তেমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ফলে যাই বলা হোক না কেন, সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন প্রয়োজন। বাস্তবে অবশ্য এই পরিষদ অনেক সময় অচল হয়ে পড়ে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো ভেটো ক্ষমতাধর দেশগুলোর স্বার্থ প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। পিটার্সের মতে, ইরানের ক্ষেত্রেও এই অচলাবস্থা সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক পদক্ষেপকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বৈত মানদণ্ড
আন্তর্জাতিক আইনে শক্তি প্রয়োগ নিষিদ্ধ। এই নীতি মূলত সামরিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্যই গড়ে তোলা হয়েছিল। যদিও গত কয়েক দশকে বড় শক্তিগুলো একাধিকবার এই নিয়ম অমান্য করেছে, তবুও অনেক ক্ষেত্রে তাদের আইনের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের হামলার পর যুক্তরাজ্যে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক ও তদন্ত হয়েছে। পিটার্স এই ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, এসব ঘটনা দেখায় যে আন্তর্জাতিক আইন পুরোপুরি অকার্যকর নয়। বরং এটি অনেকটা বাস্তবসম্মত এক আদর্শের মতো, যা বিশ্ব রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে।
তবে আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে অন্যতম বড় অভিযোগ হলো দ্বৈত মানদণ্ড। বিশ্বের অনেক দেশ মনে করে, আন্তর্জাতিক আইন মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। সম্প্রতি জাতিসংঘের একটি কমিশন সুদানে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। কিন্তু সেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
পিটার্সের মতে, পশ্চিমা দেশগুলো কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়, আবার অন্য ক্ষেত্রে নীরব থাকে। ফলে অনেক দেশ নিজেদের অবহেলিত বলে মনে করে।
সংকটের পরই বদলায় আইন
তবে আন্তর্জাতিক আইনের ভবিষ্যৎ নিয়ে পুরোপুরি হতাশ নন অ্যান পিটার্স। ইতিহাসে দেখা গেছে, বড় বড় বিপর্যয়ের পরই আন্তর্জাতিক আইন নতুনভাবে বিকশিত হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকাস্টের পর আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। একইভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং বার্লিন প্রাচীর ভেঙে পড়ার পরও নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ১৯৯৪ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) এবং ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়।
পিটার্সের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা দেখায়; বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের সংকট তৈরি হলেই আন্তর্জাতিক আইন নতুন দিক খুঁজে পায়। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনেক সময় সেই পরিবর্তন বড় কোনো বিপর্যয়ের পরেই আসে।

