ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের কারণ জানালেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী

২০২৬ সালের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ ঘিরে ক্রিকেট বিশ্বে এক নজিরবিহীন ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একদিকে ভারতেরে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করা, অন্যদিকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা পাকিস্তানের—সব মিলিয়ে ২২ গজের লড়াই এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিলে গড়িয়েছে।

এ ব্যাপারে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ বলেন, খেলার মাঠে কোনো রাজনীতি থাকা উচিত নয়। আমরা খুব ভেবেচিন্তে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বাংলাদেশের প্রতি যে অন্যায় হয়েছে, তাতে তাদের পাশে দাঁড়ানোই এখন আমাদের প্রধান কাজ।

২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ভারত ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে পর্দা উঠতে যাচ্ছে আইসিসি টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের। কিন্তু মাঠের লড়াই শুরুর আগেই মাঠের বাইরের রাজনীতি ও নিরাপত্তাশঙ্কা এই টুর্নামেন্টের আবেদনকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সর্বশেষ ঘোষণা ক্রিকেট ইতিহাসে এক নতুন নজির স্থাপন করেছে।

ঘটনার মূলে রয়েছে গত ৩ জানুয়ারি আইপিএলে মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে ঘটে যাওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। ভারতের সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদীদের হুমকির মুখে মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার তাদের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আইসিসি-র কাছে প্রস্তাব দেয় যাতে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে শ্রীলঙ্কায় নেওয়া হয়। তবে আইসিসি এই দাবিকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের ভাষ্যমতে, ভারত সরকার বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই অটল অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দল ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় আইসিসি বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে। আইসিসির এই সিদ্ধান্তকে অনেক বিশেষজ্ঞই ‘একপেশে’ এবং ‘বৈষম্যমূলক’ বলে অভিহিত করেছেন।

সবচেয়ে বড় চমকটি আসে গত রোববার, যখন পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে যে তারা ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোয় ভারতের বিপক্ষে হাই-ভোল্টেজ ম্যাচটিতে অংশ নেবে না। গতকাল বুধবার ইসলামাবাদে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে দুটি প্রধান কারণ তুলে ধরেন:

খেলার মাঠে রাজনীতি বন্ধ করা: ভারত যেভাবে ক্রিকেটকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, তার প্রতিবাদ জানানো।

বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো: পাকিস্তানের মতে, বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান ক্রিকেট শক্তির প্রতি আইসিসি যে আচরণ করেছে, তার বিরুদ্ধে সংহতি জানানো নৈতিক দায়িত্ব।

পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) প্রধান মহসিন নাকভি সরাসরি আইসিসির ‘দ্বিমুখী নীতি’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, অতীতে ভারত বা পাকিস্তানের নিরাপত্তার প্রশ্নে আইসিসি অত্যন্ত নমনীয় ও তৎপর থাকলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কেন তারা অনমনীয়? নাকভি শুরু থেকেই আইসিসি বোর্ড সভায় বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।

পাকিস্তানের এই বয়কটের সিদ্ধান্তের পর আইসিসি ‘দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব’ বা শাস্তির হুমকি দিলেও পাকিস্তান সরকার তাদের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। তারা মনে করে, ক্রিকেটের স্পিরিট রক্ষায় এই প্রতিবাদ জরুরি।

এই অচলাবস্থা কেবল একটি বিশ্বকাপকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং এটি আইসিসি-র ওপর ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং ছোট দলগুলোর অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই যেখানে কোটি কোটি ডলারের বিজ্ঞাপন আর দর্শক, সেখানে পাকিস্তানের সরে দাঁড়ানো আইসিসির জন্য একটি বড় বাণিজ্যিক ধাক্কা।

২০২৬ বিশ্বকাপ এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। বাংলাদেশ নেই, পাকিস্তান খেলবে না ভারতের বিপক্ষে—এমন এক টুর্নামেন্ট কতটা পূর্ণতা পাবে, তা নিয়ে ক্রীড়াপ্রেমীদের মনে সংশয় দেখা দিয়েছে। তবে এই ঘটনাপ্রবাহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নতুন এক রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করেছে, যেখানে খেলাধুলার চেয়ে আত্মসম্মান ও নিরাপত্তা বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.