বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল যেমন তাৎপর্যপূর্ণ, তেমনি তা দলের ভেতরকার বাস্তবতাকেও নতুন করে উন্মোচিত করে। সম্প্রতি ঘোষিত নতুন মন্ত্রীসভা ঘিরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-সমর্থিত বিভিন্ন মহলে যে “মিশ্র প্রতিক্রিয়া” দেখা যাচ্ছে, তা নিছক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়—বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, ত্যাগ ও প্রত্যাশার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষ করে ২০০৬ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী ২০০৭ সালের ওয়ান ইলেভেন-এর পর যাঁরা দলকে আগলে রেখেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এবারের মন্ত্রীসভায় স্থান না পাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কৌশলগত সিদ্ধান্ত, নাকি ত্যাগীদের উপেক্ষা?
ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী সময়টি ছিল বিএনপির জন্য এক কঠিন অধ্যায়। মামলা-হামলা, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন—সবকিছুর মধ্যেও যাঁরা রাজপথে ছিলেন, দলকে সংগঠিত রেখেছিলেন, তাঁদের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শত শত মামলার ভার কাঁধে নিয়েও যারা মিছিল-মিটিং করেছেন, পুলিশের লাঠিচার্জ ও গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হয়েছেন, তাঁদের রাজনৈতিক আত্মত্যাগই দলকে টিকিয়ে রেখেছে—এমনটাই মনে করেন তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মী।
এ প্রেক্ষাপটে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, জ্যেষ্ঠ নেতা রুহুল কবির রিজভি, সংগঠক হাবিবুন নবী সোহেল—এমন আরও অনেকে মন্ত্রীসভায় স্থান না পাওয়ায় দলের ভেতরে চাপা অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—যারা দুর্দিনে ছিলেন, তারা সুদিনে কেন নেই?
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কোন বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা নিয়ে নানা ব্যাখ্যা ঘুরছে। কেউ বলছেন, এটি প্রজন্মান্তরের রূপান্তর; কেউ বলছেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও প্রশাসনিক দক্ষতার ভিত্তিতে নতুন মুখ আনা হয়েছে; আবার কেউ মনে করছেন, দলীয় ভারসাম্য রক্ষায় সচেতনভাবে কিছু সিনিয়র নেতাকে বাইরে রাখা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতীকী স্বীকৃতি ও আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার পার্থক্য বড় হয়ে ওঠে—বিশেষ করে দীর্ঘদিনের সংগ্রামী নেতাদের ক্ষেত্রে।
শোনা যাচ্ছে, মির্জা আব্বাস এবং রুহুল কবির রিজভিকে উপদেষ্টা পদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেকের মতে, এটি কার্যত “সান্ত্বনা পুরস্কার”। প্রশ্ন হলো—উপদেষ্টা পদ কি তাঁদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি দেয়? নাকি এটি একটি শালীন দূরত্ব বজায় রাখার কৌশল?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, ক্ষমতায় এসে পরীক্ষিত নেতাদের উপেক্ষা করা কোনো দলের জন্যই শুভ ফল বয়ে আনে না। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর শাসনামলে দেখা গেছে, অনেক সময় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে একান্ত অনুগত বা আমলাতান্ত্রিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটে দেখা গেছে, পরীক্ষিত নেতৃত্বের ঘাটতি দলকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করে দেয়। রাজনীতিতে আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সংগ্রামী বিশ্বাসযোগ্যতা তার চেয়েও বেশি মূল্যবান—কারণ দুর্দিনে নেতৃত্বের মূলধন হয় ত্যাগের ইতিহাস।
রাজনীতির চাকা কখন কোন দিকে ঘুরবে, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। আজকের স্থিতিশীলতা আগামীকালের অনিশ্চয়তায় রূপ নিতে পারে। সেই অনিশ্চয়তার সময়ে যারা দলকে আগলে রাখে, তারা সাধারণত মন্ত্রিসভার কক্ষে নয়—রাজপথে, কারাগারের ভেতরে, কিংবা মামলার বোঝা কাঁধে নিয়েই দলকে টিকিয়ে রাখে। সুতরাং সুদিনে তাঁদের স্বীকৃতি না দিলে, দুর্দিনে তাঁদের উদ্দীপনা কতটা থাকবে—এ প্রশ্ন অমূলক নয়।
তবে আরেকটি দিকও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। মন্ত্রীসভা কেবল ত্যাগের পুরস্কার দেওয়ার জায়গা নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি প্রশাসনিক কাঠামো। এখানে দক্ষতা, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, নীতি-নির্ধারণী অভিজ্ঞতা, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বোঝাপড়া—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভবত দলীয় প্রধান এই বিবেচনাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় দক্ষতা ও ত্যাগ—দুইয়ের সমন্বয়ই সবচেয়ে কার্যকর বার্তা দেয়।
দলের ভেতরকার মনস্তত্ত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের সংগ্রামী নেতাদের যদি মনে হয় তাঁদের অবদান উপেক্ষিত, তাহলে তা সাংগঠনিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আবার যদি নেতৃত্ব তাঁদের সঙ্গে সংলাপ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেয় যে এটি কৌশলগত পুনর্বিন্যাস, ব্যক্তিগত অবমূল্যায়ন নয়—তাহলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব।
বিএনপির সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা প্রমাণ করা, অন্যদিকে দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য অটুট রাখা। ঐক্য ভঙ্গুর হলে প্রশাসনিক সাফল্যও রাজনৈতিকভাবে স্থায়ী হয় না। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র এবং বিরোধী শক্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।
এখানে একটি ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রাসঙ্গিক: ক্ষমতার কেন্দ্র যতই দৃঢ় হোক, রাজনৈতিক দল টিকে থাকে তৃণমূলের নিবেদন ও পরীক্ষিত নেতৃত্বের ওপর। ত্যাগীদের প্রতি সম্মান কেবল নৈতিক দায় নয়, এটি কৌশলগত প্রয়োজনও। কারণ রাজনীতির কঠিন মুহূর্তে আনুগত্যের চেয়ে বেশি কাজ করে বিশ্বাস—আর সেই বিশ্বাস জন্ম নেয় দীর্ঘ সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে।
সুতরাং নতুন মন্ত্রীসভা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নেতিবাচক হিসেবেই দেখা উচিত নয়। বরং এটিকে দলের ভেতরে আত্মসমালোচনা ও পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। নেতৃত্ব যদি সময় থাকতে অভিমান ও অসন্তোষের ভাষা বোঝে, তবে সেটি শক্তিতে রূপ নিতে পারে। অন্যথায়, ক্ষোভ নীরবে পুঞ্জীভূত হয়ে ভবিষ্যতের সংকটে বড় আকার ধারণ করতে পারে।
রাজনীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের স্মৃতি ও আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যাঁরা ১৭ বছর ব্যক্তিগত জীবন বিসর্জন দিয়ে দলকে টিকিয়ে রেখেছেন, তাঁদের অবদান ইতিহাসে অম্লান। নতুন মন্ত্রীসভা হয়তো একটি প্রশাসনিক কাঠামো; কিন্তু রাজনৈতিক দল টিকে থাকে ত্যাগের স্বীকৃতি ও পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে।
আজকের সুদিনে যাঁদের উপেক্ষিত মনে হচ্ছে, আগামী দিনের দুর্দিনে তাঁরাই আবার হাল ধরবেন—এ সত্যটি যে কোনো দলীয় প্রধানের মনে রাখা উচিত। সময়ই বলে দেবে, এবারের সিদ্ধান্ত কৌশলগত দূরদর্শিতা ছিল, নাকি রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার সূচনা। তবে ইতিহাসের শিক্ষা একটাই—ত্যাগের মূল্য না দিলে, ক্ষমতার ভিত্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম ।

