উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি বিষয় বারবার প্রমাণিত হয়েছে—দলকে দুর্বল করে সরকারকে শক্তিশালী রাখা যায় না। ক্ষমতার শীর্ষে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি যদি সংগঠনের ভেতর প্রোথিত না থাকে, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ইতিহাস সাক্ষী, ইন্দিরা গান্ধির দলের কাণ্ডারি হিসেবে যখন তারই পুত্র রাজিব গান্ধী আবির্ভূত হন, তখন তাঁর সামনে ছিল বিপুল জনসমর্থন ও সহানুভূতির ঢেউ। কিন্তু ক্ষমতায় এসেই তিনি কংগ্রেসের বহু অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত নেতাকে পাশ কাটিয়ে নতুন ও অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ মুখদের নিয়ে দল ও সরকার সাজাতে শুরু করেন। যারা দীর্ঘদিন ইন্দিরা গান্ধির সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, সংকটের সময়ে দলকে ধরে রেখেছেন, তাঁদের অনেকেই মন্ত্রিসভা ও নেতৃত্বের কেন্দ্র থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। অবহেলা ও অপমানের সেই রাজনীতি কংগ্রেসের ভেতরে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। ইতিহাস বলছে, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কখনও শুভ ফল বয়ে আনে না।
বাংলাদেশেও একই প্রবণতার প্রতিফলন আমরা দেখেছি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। ২০০১ সালে ক্ষমতা হারানোর পর দলকে পুনর্গঠনে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে ছিলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় তাঁদের অনেকেই মনোনয়ন বঞ্চিত হন। মোজাফফর হোসেন পল্টু, সুলতান মুহাম্মদ মনসুর, অধ্যাপক আবু সাইয়ীদ, মাহমুদুর রহমান মান্না, আখতার, শফি আহমেদসহ একদল পরিচিত নেতা দলীয় মনোনয়ন থেকে বাদ পড়েন। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদেরও অনেকেই সুযোগ পাননি। এতে তৃণমূল পর্যায়ে প্রশ্ন জাগে—ত্যাগের মূল্যায়ন কোথায় ?
সরকার গঠনের সময় আরও বিস্ময় সৃষ্টি হয়। আবদুর রাজ্জাক, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আবদুল জলিল, মোহাম্মদ নাসিমের মতো সিনিয়র নেতারা মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। অভিযোগ ছিল, তাঁরা দলে কথা বলতে চান, সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেন। একই সময়ে মাঠ কাঁপানো নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজমও উপেক্ষিত হন। তাঁদের পরিবর্তে উঠে আসেন রেজাউল করিম হীরা, আবুল কালাম আজাদ, ডা. দীপু মনি, সাহারা খাতুন, প্রমোদ মানখিন; পরবর্তীতে ফরহাদ, বিপু, পলকের মতো প্রভাবশালী মুখও গুরুত্ব পান। এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ে আসেন বেয়াই মোশাররফ হোসেন ও তাজুল ইসলাম।
দলের সাধারণ সম্পাদকের পছন্দ ছিল যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, কিন্তু বাস্তবে এলজিআরডি বণ্টনসহ নানা সিদ্ধান্তে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সরকার পরিচালনায় উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ও ড. তারেক সিদ্দিকীর প্রভাব, ব্যাংকিং খাতে মশিউর রহমান, পররাষ্ট্রনীতিতে গওহর রিজভীর সক্রিয় ভূমিকা—এসব মিলিয়ে দলীয় নেতাদের একাংশ মনে করেন, নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেয়ে উপদেষ্টা বলয় বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে এই ধারণা জন্ম নেয় যে দল নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট বলয় রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনীতির বাস্তবতায় এমন প্রবণতা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ দলীয় ঐক্য ও অংশগ্রহণ ছাড়া সরকার দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে কেবল অনুগত বা সুবিধাজনক মুখদের সামনে আনা হলে দল ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়ে। শেখ হাসিনার বর্তমান রাজনৈতিক পরিণতির জন্য তৃণমূলের একাংশ আজ দায়ী করছেন সেই সময়ের সিদ্ধান্তগুলোকে—যখন অভিজ্ঞ নেতাদের উপেক্ষা করে নতুন বলয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে একই প্রশ্ন উঠছে বিএনপির ভেতরেও। দীর্ঘ প্রতিকূলতা, কারাবরণ, মামলা, নির্বাসিত জীবন—সবকিছুর মধ্য দিয়ে যারা দলকে টিকিয়ে রেখেছেন, তাঁদের প্রত্যাশা ছিল সরকার গঠনের সময় পরামর্শ ও মূল্যায়ন পাবেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, তারেক রহমান মন্ত্রী পরিষদ গঠনের সময় বহু সিনিয়র নেতার মতামত নেননি। বছরের পর বছর জেল খাটা, মামলা মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়ানো, পারিবারিকভাবে নিপীড়নের শিকার হওয়া অসংখ্য নেতাকর্মী নির্বাচনে বিজয়ের পরও নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পাননি। এমনকি যাঁরা মন্ত্রী হয়েছেন, তাঁরাও অনেক ক্ষেত্রে দলীয় কর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় বের করতে পারেননি—এমন ক্ষোভ তৃণমূল থেকে শোনা যাচ্ছে।
২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানো হলেও দলীয়ভাবে না জানানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভাষা আন্দোলনের স্মারক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার কেবল আনুষ্ঠানিকতার স্থান নয়; এটি রাজনৈতিক আদর্শের প্রতীক। সেখানে দলীয় অনুপস্থিতি অনেকের কাছে সাংগঠনিক শৈথিল্যের প্রতিচ্ছবি হয়ে ধরা দিয়েছে। মধ্যম সারির লড়াকু ও দাপুটে নেতারা, যারা একসময় রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, তাঁদের এখন অনুপস্থিতি দলীয় কর্মীদের হতাশ করছে।
রাজনীতিতে সরকারের সাফল্য শেষ পর্যন্ত দলের ওপরই নির্ভর করে। সরকার প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে চলে, কিন্তু দল চলে বিশ্বাস, অংশগ্রহণ ও ত্যাগের ভিত্তিতে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যদি সীমিত বলয়ে আবদ্ধ থাকে, তবে তা ধীরে ধীরে অসন্তোষের জন্ম দেয়। আর সেই অসন্তোষ প্রকাশ্য না হলেও সংগঠনের শক্তিকে ক্ষয় করে।
নতুন মুখকে সামনে আনা অবশ্যই প্রয়োজন। প্রজন্ম পরিবর্তন অনিবার্য। কিন্তু তা যদি হয় অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের ধারাবাহিকতা অস্বীকার করে, তবে সংগঠনের শিকড় দুর্বল হয়ে যায়। রাজনীতিতে অভিজ্ঞ নেতারা কেবল ব্যক্তি নন; তাঁরা একটি ইতিহাস, একটি স্মৃতি, একটি আস্থার কেন্দ্র। তাঁদের অবমূল্যায়ন মানে সেই ইতিহাস ও আস্থাকে আঘাত করা।
একই সঙ্গে ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে দেখা রাজনৈতিক পরিপক্বতার লক্ষণ নয়। যারা দলে কথা বলতে চান, সংস্কারের প্রস্তাব দেন, তাঁরা অনেক সময় আগাম বিপদের সংকেত দেন। তাঁদের কণ্ঠ রোধ করলে দল আত্মসমালোচনার সুযোগ হারায়।
আজকের বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সরকার কি দলের সঙ্গে সমান্তরালভাবে চলছে, নাকি দল ক্রমেই প্রান্তিক হয়ে পড়ছে? যদি দল কেবল নির্বাচনের যন্ত্রে পরিণত হয়, আর সরকার হয়ে ওঠে একটি সীমিত বলয়ের নিয়ন্ত্রিত কাঠামো, তবে দীর্ঘমেয়াদে সেই রাজনীতি টেকসই হবে না।
সরকার থাকবে কিন্তু দল থাকবে না—এমন পরিস্থিতি কোনো রাজনৈতিক শক্তির জন্যই কাম্য নয়। দলই সরকারের পিলার। পিলারবিহীন দালান যেমন দমকা বাতাসে ধসে পড়ে, তেমনি সংগঠনহীন সরকারও অচিরেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—ত্যাগী, পরীক্ষিত ও সংগ্রামী নেতৃত্বকে সম্মান না দিলে ক্ষমতার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়।
এখনই সময় আত্মসমালোচনার, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তোলার, এবং দলকে সরকারের সমান শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে পুনর্গঠনের। অন্যথায় ইতিহাস আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্ত করবে—আর সেই পুনরাবৃত্তি হবে বেদনাদায়ক ও অনিবার্য।
লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম ।

