সংস্কারের শাস্তি : জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে আফসানা বেগমকে অপসারণ 

২০২৪ সালের ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগমের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা বইকে পরিচিত করার প্রশ্নে তাঁর নিষ্ঠা, দূরদৃষ্টি ও নিরলস পরিশ্রম আমাকে মুগ্ধ করেছিল। ২০২৫ সালেও তিনি ফ্রাঙ্কফুর্টে এসেছিলেন একই প্রত্যয় নিয়ে—বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতকে আন্তর্জাতিক প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত করার বাস্তব পরিকল্পনা হাতে নিয়ে। শুধু পরিকল্পনা নয়, অগ্রগতিও হচ্ছিল। এমন একজন মেধাবী ও উদ্যমী মানুষের হঠাৎ অব্যাহতি তাই বিস্ময়করই নয়, গভীরভাবে হতাশাজনক।

২০২৪–এর গণঅভ্যুত্থানের পর ৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সংস্কারের প্রত্যাশা থেকেই। তিনি দায়িত্বটিকে ব্যক্তিগত ক্ষমতা বা সুবিধা হিসেবে নেননি; নিয়েছিলেন নৈতিক দায় হিসেবে। মানহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বই কেনার বিরুদ্ধে অবস্থান, কোটার অপব্যবহার বন্ধ করা, ভালো বই যেন লাইব্রেরিতে পৌঁছায় তা নিশ্চিত করা—এসবই ছিল তাঁর কাজের কেন্দ্রবিন্দু। জুলাইয়ের যে স্পিরিট—স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা, জবাবদিহি—তা যেন নিম্নমানের বই–ব্যবসায় নষ্ট না হয়, সেই চেষ্টাই তিনি করেছিলেন।

এই প্রেক্ষাপটে বই নির্বাচন নীতিমালায় সচিব–মন্ত্রী কোটা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব ছিল সময়োপযোগী ও সাহসী। কারণ এই কোটাই বছরের পর বছর দুর্নীতি, তোষামোদ আর অপাঠ্য বই ঢোকানোর প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে—এ কথা প্রকাশনা জগতের সবাই জানে। কিন্তু জানলেও মুখ খোলে না অনেকেই। আফসানা বেগম সেই নীরবতা ভাঙতে চেয়েছিলেন। সংস্কারের কথা বলাই যদি অপরাধ হয়, তবে আমাদের সাংস্কৃতিক প্রশাসনের ভিত যে কতটা দুর্বল, সেটাই প্রমাণিত হয়।

৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সংস্কার, সম্ভাবনা ও পরবর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা নিয়ে একটি সেমিনার হওয়ার কথা ছিল। সিরডাপ মিলনায়তন বুক করা হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই রাতের অন্ধকারে পরপর দুটি প্রজ্ঞাপন—কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো জবাবদিহি নেই। অব্যাহতি। সঙ্গে সঙ্গে সেমিনার বাতিল। প্রশ্ন জাগে—সংস্কারের আলোচনা কি এতটাই ভয়ের, যে আলো জ্বালানোর আগেই সুইচ বন্ধ করে দিতে হয়?

এই পুরো ঘটনায় সংস্কৃতিমন্ত্রনালয়ের ভূমিকা বিশেষ করে মন্ত্রী ফারুকির অবস্থান গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। একজন সংস্কৃতিমন্ত্রীর কাছ থেকে আমরা আশা করি নীতিগত সততা, সংস্কারের সাহস এবং মেধাবীদের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা। কিন্তু এখানে দেখা গেল উল্টো চিত্র—সংস্কারের প্রস্তাবকে শাস্তি দিয়ে দমন করা হলো। নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা নয়; নীরবতা এখানে পক্ষ নেওয়া। আর সেই পক্ষটি দুর্নীতির সুবিধাভোগীদের।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র কোনো রুটিন দপ্তর নয়। এটি একটি নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান, যেখানে সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে প্রজন্মের পাঠাভ্যাসে, জ্ঞানের মানে, সাংস্কৃতিক স্বাস্থ্যে। সেখানে যদি কোটা ও তোষামোদই নিয়ামক হয়, তবে ভালো বই হারিয়ে যায়, লাইব্রেরি ভরে ওঠে অপাঠ্য আবর্জনায়। এই বাস্তবতা বদলানোর উদ্যোগকে যদি মন্ত্রী পর্যায়ের সমর্থন না মেলে, তবে প্রশ্ন উঠবেই—মন্ত্রী কি সংস্কার চান, নাকি পুরোনো সুবিধাভোগী ব্যবস্থাকেই আগলে রাখতে চান?

অব্যাহতির পর আফসানা বেগম দায়িত্ব আঁকড়ে ধরেননি। কারণ আত্মসম্মান দিয়ে দায়িত্ব শুরু হয়েছিল, আত্মসম্মান দিয়েই তা শেষ হয়েছে। পরিচয় বা সম্মান তাঁকে নতুন করে বানাতে হয়নি—এই পরিচয় নিয়েই তাঁকে ডাকা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো পেশাগত ব্যর্থতার অভিযোগ নেই, আছে কেবল নীতিগত দৃঢ়তার ‘অপরাধ’। এটি ব্যক্তির নয়, একটি ব্যবস্থার ব্যর্থতা।

ফারুকি সাহেবের কাছে প্রশ্ন—সংস্কারের কথা বললেই যদি দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আসলে কী বার্তা দিচ্ছে? গণঅভ্যুত্থানের পর যে নতুন বাংলাদেশ, নৈতিকতার যে নতুন দাবি—তা কি কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ? মেধাবীদের দমন করে, দুর্নীতির কোটাকে রক্ষা করে কি সংস্কৃতির উন্নয়ন সম্ভব?

এই ঘটনা একটি সতর্ক সংকেত। আজ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, কাল অন্য প্রতিষ্ঠান। যদি নীতিগত সততা শাস্তিযোগ্য হয়, তবে যোগ্য মানুষরা সরে যাবে, আর জায়গা নেবে তোষামোদকারীরা। এর দায় শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের নয়, রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ভবিষ্যতের।

আমি এখনো বিশ্বাস করি—জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র সংস্কারযোগ্য, এবং হওয়া দরকার। সত্য বলার দরজা বন্ধ হলে, সেই সত্য আরও জোরে বলতে হয়। ফারুকি সাহেব, ইতিহাস নীরবতা মনে রাখে না—কাজ মনে রাখে। আপনি কোন পাশে দাঁড়ালেন, সেটাই একদিন বিচার হবে।

লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক: শুদ্ধস্বর ডটকম
ফ্রাঙ্কফুর্ট, জার্মানি ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.