২৬ কোটি ডলার বকেয়া রেখেই  ডব্লিউএইচও ছাড়লো যুক্তরাষ্ট্র

 

এক বছরের নোটিশকাল শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে সদস্যপদ প্রত্যাহার সম্পন্ন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই প্রস্থানের সময় ওয়াশিংটন প্রায় ২৬ কোটি মার্কিন ডলার বকেয়া রেখেই সংস্থাটি ছাড়ায়, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও জনসেবা বিভাগ (এইচএইচএস) বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেছে, ডব্লিউএইচওর সঙ্গে সব ধরনের অর্থায়ন বন্ধ করা হয়েছে এবং সংস্থাটির জেনেভা সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে মার্কিন কর্মীদের প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে এতদিন সংস্থাটির সবচেয়ে বড় দাতা দেশ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে ডব্লিউএইচওর কোনো নির্বাহী বোর্ড, নীতিনির্ধারণী পর্ষদ বা কারিগরি আলোচনায় অংশ নিতে পারবে না।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি আধুনিক বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কূটনীতির ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা, যার প্রভাব শুধু সংস্থাটির আর্থিক কাঠামোতেই নয়, বরং ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলার সক্ষমতার ওপরও পড়বে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনেই ডব্লিউএইচও থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন। সে সময় তিনি অভিযোগ করেন, কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় সংস্থাটি চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে ব্যর্থ হয়েছে এবং “অনুপযুক্ত রাজনৈতিক প্রভাবের” কারণে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি।

১৯৪৮ সালের একটি সংসদীয় প্রস্তাব অনুযায়ী, ডব্লিউএইচও ছাড়তে হলে এক বছরের আগাম নোটিশ দেওয়ার পাশাপাশি সব বকেয়া পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের দাবি, আইনগতভাবে তাদের ওপর ওই বকেয়া পরিশোধের কোনো বাধ্যতামূলক দায় নেই। ডব্লিউএইচওর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ কোটি ডলারে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য আইন কেন্দ্রের পরিচালক লরেন্স গোস্টিন এই প্রস্থানকে “অত্যন্ত বিশৃঙ্খল একটি বিবাহবিচ্ছেদ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এটি শুধু একটি সংস্থা ত্যাগ নয়, বরং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সহযোগিতার দীর্ঘদিনের কাঠামোকে ভেঙে দেওয়ার শামিল।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের ফলে এইচআইভি, পোলিও ও ইবোলার মতো প্রাণঘাতী রোগ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত বৈশ্বিক কর্মসূচিগুলো বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একাই ডব্লিউএইচওকে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছিল, যা সংস্থাটির বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুগিয়েছে।

ইনফেকশাস ডিজিজ সোসাইটি অব আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড নাহাস এক বিবৃতিতে বলেছেন, ডব্লিউএইচও থেকে বেরিয়ে যাওয়া “একটি বৈজ্ঞানিক হঠকারিতা”, যার পরিণতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভোগ করতে হতে পারে।

বিশেষ করে সংস্থাটির ইনফ্লুয়েঞ্জা রেসপন্স নেটওয়ার্ক ও বৈশ্বিক ডেটা ট্র্যাকিং ব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়ায়, ভবিষ্যতে নতুন কোনো মহামারির জন্য টিকা উন্নয়ন ও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় ডব্লিউএইচওর বার্ষিক ফ্লু ভ্যাকসিন বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ এখন অনিশ্চিত।

এই প্রস্থান শুধু ডব্লিউএইচওতেই সীমাবদ্ধ নেই। এলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ ইতোমধ্যে ইউএসএআইডির মানবিক ও স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে ব্যাপক ছাঁটাই করেছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচিব রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনাকারী ‘গ্লোবাল ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স’ থেকে মার্কিন সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

এর বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট প্রায় ৬০টি দেশের সঙ্গে নিজস্ব রোগ নজরদারি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে, যা ডব্লিউএইচওর প্রস্তাবিত ‘প্যান্ডেমিক এগ্রিমেন্ট’-এর একটি সমান্তরাল কাঠামো হিসেবে কাজ করবে।

এদিকে ডব্লিউএইচওর ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র আগামী মে মাসে অনুষ্ঠেয় বার্ষিক সভায় যুক্তরাষ্ট্রের বকেয়া আদায়ের সম্ভাব্য আইনি পথ নিয়ে আলোচনা করবে বলে সংস্থার একাধিক সূত্র জানিয়েছে। সূত্র: ব্লুমবার্গ, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.